প্রকাশকাল: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫
কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটেছে সত্য, কিন্তু দেশের গণমাধ্যম কি সেই শিকল থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পেরেছে? এই জিজ্ঞাসা আর আগামীর চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে রেখেই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ‘কর্তৃত্ববাদের পতন পরবর্তী গণমাধ্যম পরিস্থিতি’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে মাধ্যমে দিয়ে আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস ২০২৫ পালন করেছে। ধানমন্ডিস্থ টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সাংবাদিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সংস্কারের চলমান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের উপ-সমন্বয়ক জাফর সাদিক। তার প্রবন্ধে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ঐতিহাসিক বিবর্তন, আইনি কাঠামো, সংবাদ প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জসমূহ, নিবন্ধন ও মালিকানা পদ্ধতি এবং কর্তৃত্ববাদ পতনের পর বর্তমান পরিস্থিতির এক বিস্তারিত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান তার বক্তব্যে বলেন গণমাধ্যম জনস্বার্থ রক্ষাকারী অপরিহার্য উপাদান হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিগত সরকারগুলো সাংবাদিকদের অংশীদারের পরিবর্তে সবসময় প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করেছে। তিনি এই কর্তৃত্ববাদী প্রবণতাকে কয়েক দশকের “জিরো-সাম” রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে অভিহিত করেন। এই চর্চার কারণেই গত ১৫ বছরে প্রাতিষ্ঠানিক লুটতরাজ চৌর্যতন্ত্রে রূপ নিয়েছে বলে তিনি জানান।
গণমাধ্যমের এই নাজুক চিত্র নিয়ে এএফপির বাংলাদেশ ব্যুরো চিফ শেখ সাবিহা আলম কিছুটা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন যে, অপ-সাংবাদিকতার বিপরীতে প্রকৃত সাংবাদিকতাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে এবং শত প্রতিকূলতার মধ্যেও শক্তিশালী প্রতিবেদনগুলো টিকে আছে। তবে তার সহকর্মীরা আরও উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরেন। ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমদ এক ‘দূষিত’ গণমাধ্যম পরিবেশের কথা উল্লেখ করে বলেন, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়াই যত্রতত্র গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান খোলার লাইসেন্স বিতরণের ফলে জনআস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবস্থাটিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে যে এখন কেউ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই বলে দাবি করতে পারে না, কারণ লাইসেন্স পাওয়ার একটি কৃত্রিম ব্যবস্থা আগে থেকেই বিদ্যমান বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এই আপাত বাধাহীন পরিবেশই বাংলাদেশের গণমাধ্যম সংস্কারের মূল সংকটকে লুকিয়ে রেখেছে। ২০২৪ সালের আগস্টের পর দেশব্যাপী চরম দলাদলি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গ্রেফতার এবং বিগত সরকারের অন্যায্য চর্চাগুলোর পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গণমাধ্যমের ভেতরেই যারা এখন নিজেকে বিজয়ী মনে করছেন, তাদের মধ্যে ‘এখন আমাদের সময়’- এমন একটি মানসিকতা তৈরি হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা সেই পুরোনো দুর্নীতিগ্রস্ত ধারাকেই টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে এই ধরনের মানসিকতা সংস্কারের উদীয়মান সম্ভাবনাগুলোকে ব্যর্থতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এহেন পরিস্থিতির পেছনে সংশ্লিষ্টদের দায়বদ্ধতা অনেক গভীর। চ্যানেল ২৪-এর সাবেক নির্বাহী পরিচালক তালাত মামুন বলেন কর্তৃত্ববাদের পতনের পর নতুন শক্তির উদ্ভব ঘটাই স্বাভাবিক এবং সাংবাদিকদের সেই নতুন পরিস্থিতির মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নি অভিযোগ করেন যে, একটি মিডিয়া কমিশন গঠন এবং এর সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা চললেও বাস্তবে এ পর্যন্ত খুব সামান্য অগ্রগতি হয়েছে।
আলোচনা সভা শেষে ‘দুর্নীতিবিরোধী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার ২০২৫’ এর বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। এ বছর বিভিন্ন বিভাগে চারজন সাংবাদিক এবং একটি তথ্যচিত্রকে সম্মানিত করা হয়। আঞ্চলিক সংবাদপত্র বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন যশোরের দৈনিক গ্রামের কাগজ-এর সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার ফয়সাল ইসলাম এবং স্টাফ রিপোর্টার আশিকুর রহমান শিমুল। জাতীয় সংবাদপত্র বিভাগে পুরস্কৃত হয়েছেন ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি সান-এর সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার রাশেদুল হাসান। টেলিভিশন (প্রতিবেদন) বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি মুফতি পারভেজ নাদির রেজা (বর্তমানে চ্যানেল ওয়ান-এর ইনপুট প্রধান ও প্ল্যানিং এডিটর)। বিজয়ীদের প্রত্যেককে সম্মাননা সনদ, ক্রেস্ট এবং ১ লক্ষ ২৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয়। এছাড়া টেলিভিশন (তথ্যচিত্র) বিভাগে চ্যানেল ২৪-এ প্রচারিত ‘সার্চলাইট’ তথ্যচিত্রটি বিজয়ী হয়েছে। অনুসন্ধান ও উপস্থাপনায় ছিলেন সার্চলাইট টিমের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি মো. ফয়জুল আলম সিদ্দিকী (বর্তমানে স্টার নিউজ-এর বিশেষ প্রতিনিধি)। বিজয়ী তথ্যচিত্রটিকে সম্মাননা সনদ, ক্রেস্ট ও ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার প্রদান করা হয়।
তবে সাংবাদিকদের অনুপ্রাণিত করতে পুরস্কার জরুরি হলেও এটি কোনোভাবেই কাঠামোগত পরিবর্তনের বিকল্প হতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. শামীম রেজা এবং অন্যান্য আলোচকরা মনে করেন যে, সব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সাংবাদিকতা চালিয়ে যেতে হবে, কারণ এর মাধ্যমেই জনআস্থা বৃদ্ধি পায়। এর জন্য এমন একটি পরিবেশ প্রয়োজন যেখানে সত্য প্রকাশ করলে শাস্তির বদলে সুরক্ষা মিলবে, সাংবাদিকরা নজরদারি বা প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই কাজ করতে পারবেন এবং আমলাতান্ত্রিক কাঠামো জবাবদিহিতার পথে বাধা না হয়ে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
ড. ইফতেখারুজ্জমানের সমাপনী বক্তব্যে সতর্কতা ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই ছিল। তিনি বলেন, 'সংস্কারের সুফল পেতে হলে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং আমলাতান্ত্রিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। এই মৌলিক রূপান্তর না ঘটলে অন্যায়ের এই চক্র আবারও ফিরে আসবে। যে জনগণ জবাবদিহিতার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল, তারা হয়তো দেখবে যে ক্ষমতার চরিত্র না বদলে কেবল তার বহিরাঙ্গ বদলেছে এবং তাদের আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সংস্কারের কারিগরি দিক কিংবা কমিশন গঠনের চেয়েও বড় বিষয় হলো ক্ষমতার চর্চা কার স্বার্থে এবং কীভাবে হচ্ছে সেই মৌলিক পরিবর্তন আনা।'