আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস ২০২৬

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতার গভীর ঘাটতি নিয়ে উদ্বিগ্ন টিআইবি ও সমমনা সংগঠনসমূহ

প্রকাশকাল: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬

ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই বৈশ্বিক রূপান্তরের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করে ২০২৩ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২৬ জানুয়ারিকে আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণার মূল লক্ষ্য ছিল বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে সুশাসনের উত্তম চর্চা প্রতিষ্ঠা, স্বচ্ছতা এবং সকল অংশীজনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এ বছর আন্তর্জাতিক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ঢাকা ও দেশজুড়ে দিবসটি পালন করেছে। এ আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিল জ্বালানি খাতের সুশাসনকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা। দেশব্যপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে টিআইবি জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে একটি মানববন্ধন আয়োজন করে। মানববন্ধনে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি-নির্ভর নীতি কাঠামো গঠনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবিগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়।

জ্বালানি খাতের পরিকল্পনার ধরন, বিনিয়োগের অগ্রাধিকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনও জীবাশ্ম জ্বালানিকে প্রাধান্য দিয়ে এই খাতের ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণ করছে বলে মনে করে টিআইবি। মানববন্ধনে সংস্থাটির পক্ষ থেকে নীতি প্রণয়নে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো যেন জনস্বার্থ, জলবায়ু বিষয়ক দায়বদ্ধতা ও দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতার ভিত্তিতে নেওয়া হয়, তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। স্বচ্ছতার অভাবের সুযোগে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের যে ধারাবাহিক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে, তা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনমানুষের টিকে থাকার ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের মত জলবায়ু পরিবর্তনের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশের জন্য জ্বালানি খাতের সুশাসন চর্চা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখা প্রকৃত অর্থে অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদ।

জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে টিআইবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের অনীহাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানান। তিনি বলেন, “বর্তমান জ্বালানি মাস্টার প্ল্যানে দেশি ও বিদেশি জীবাশ্ম জ্বালানি সংশ্লিষ্ট স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাব স্পষ্ট, যা বিগত স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনেরই অবশেষ।” এ সময় তিনি বাংলাদেশের জ্বালানি সংকটকে মূলত সুশাসনের ঘাটতিজনিত সমস্যা হিসেবে অভিহিত করেন। ড. ইফতেখারুজ্জামান নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং ‘খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত মাস্টার প্ল্যান ২০২৫’ কে ঢেলে সাজানো জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনায় স্বচ্ছতা ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।

মাস্টার প্ল্যানে যেন নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী রূপরেখা প্রতিফলিত হয়, সেজন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশীজন পরামর্শ, উপাত্ত ও তথ্যের স্বচ্ছ প্রকাশ এবং স্বতন্ত্র পর্যালোচনা প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের অন্যতম পূর্বশর্তগুলো হচ্ছে উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন, বর্ধিত কারিগরি সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে জোরালো সমন্বয়। এছাড়া ভূমির ব্যবহার সংক্রান্ত সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছ প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং নীতিমালার পূর্বাভাসযোগ্যতা একটি দায়িত্বশীল ও টেকসই বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে উন্নয়নের অগ্রাধিকার এবং সুশাসনের একটি অপরিহার্য দাবি হিসেবে তুলে ধরে টিআইবি জোর দিয়ে জানায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কোনো গৌণ বিষয় নয়। জনআস্থা বৃদ্ধি, নীতিমালার গ্রহণযোগ্যতা অর্জন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির সুফল সর্বস্তরের মানুষের কাছে সমতার ভিত্তিতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এগুলোই হলো প্রধান এবং মৌলিক শর্ত।

এই লক্ষ্যসমূহ অর্জনে, মানববন্ধনে টিআইবির পক্ষ থেকে ধারণাপত্রের মাধ্যমে নীতিনির্ধারকদের সামনে একগুচ্ছ সুস্পষ্ট ও কার্যকর সুপারিশ তুলে ধরা হয়। পর্যায়ক্রমে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনতে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ গ্রহণের জন্য দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকারের দাবি জানানো হয়। জ্বালানি খাতের সততা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে টিআইবি একটি স্বাধীন তদারকি ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ গঠনেরও আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে সংস্থাটি সাস্টেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (স্রেডা) প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর স্বায়ত্তশাসন জোরদার করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। এছাড়া জ্বালানি সংশ্লিষ্ট সকল নীতিমালাকে একটি সমন্বিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি কাঠামোর আওতায় আনা, নেট মিটারিং ব্যবস্থা সহজ করা, ফিড-ইন ট্যারিফ চালু করা, প্রকল্প অনুমোদন ও ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ক গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও টিআইবি দাবি জানায়। বাতিলকৃত কয়লা ও এলএনজি প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জমি নবায়নযোগ্য জ্বালানি কেন্দ্র, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ব্যবহার করার বিষয়টিকে সংস্থাটি একটি বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরে।

টিআইবির এই অবস্থান মূলত নাগরিক সমাজের মধ্যে তৈরি হওয়া এক বৃহত্তর তৎপরতারই প্রতিফলন। সমমনা বিভিন্ন সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশবাদী নেটওয়ার্ক এবং নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলো বর্তমানে জ্বালানি খাতের সুশাসন সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে টিআইবি। ৪৫টি জেলায় তৃণমূল পর্যায়ে বিপুল সমর্থনের পাশাপাশি ২০টি জাতীয় সংগঠনের এই নজিরবিহীন জোট বাংলাদেশে জ্বালানি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তনের এক ব্যাপক জনদাবিকেই নির্দেশ করছে। গবেষণা, সংলাপ, জনসচেতনতা এবং সম্মিলিত কর্মসূচির মাধ্যমে এই প্রতিনিধিরা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনমুখী জ্বালানি সংস্কারের ক্রমবর্ধমান দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে এই সমন্বিত উদ্যোগ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের আলোচনায় একটি মাইলফলক। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রাধান্য দিয়ে আজ জ্বালানি খাতের সুশাসন নিশ্চিতে সংস্কারের দাবি একটি পূর্ণাঙ্গ আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

জ্বালানি খাতে সুশাসনের ঘাটতির বিষয়ে টিআইবি এবং এর নাগরিক সমাজের অংশীদাররা ক্রমাগত সতর্কবার্তা দিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ভবিষ্যতের নির্বাচিত নেতৃত্বের কাছে জোরালোভাবে এই দাবিগুলো উঠে এসেছে। বাংলাদেশের পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে উত্তরণ প্রক্রিয়া অতীতের দুর্নীতিগ্রস্ত ও অস্বচ্ছ ব্যবস্থার পরিবর্তে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং প্রকৃত জনঅংশগ্রহণের ভিত্তির ওপর গড়ে উঠবে, টিআইবিসহ সমমনা সংগঠনগুলোর এমনটাই প্রত্যাশা। ড. ইফতেখারুজ্জামান এই বলে তার বক্তব্য শেষ করেন যে, “বাংলাদেশ হয় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা এবং সুশাসনের ব্যর্থতার পথে চলা অব্যাহত রাখতে পারে, অথবা একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎকে বেছে নিতে পারে। জনগণ তাদের রায় দিয়ে দিয়েছে; এখন ক্ষমতাসীনদের সেই কথা শোনার সময় এসেছে।”


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি