নারী সাংবাদিকদের নিরাপদ নির্বাচনী রিপোর্টিং নিশ্চিত করতে টিআইবির প্রশিক্ষণ

প্রকাশকাল: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫

"আমরা বাঁচার আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। চোখের সামনে দেখছিলাম দাউদাউ করে জ্বলছে আমাদের অফিস। বাইরে হাজারো মানুষের চিৎকার, কিন্তু আমাদের উদ্ধারে কেউ নেই।" দ্য ডেইলি স্টার-এর সাংবাদিক শামীমা রীতার যখন তাঁর অফিসের সেই ভয়াবহ আগুনের গল্প বলছিলেন, তখন উপস্থিত সবার চোখেমুখে এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। চোখের সামনে নিজের কর্মস্থল পুড়ছে, ধোঁয়ায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, অথচ ৯৯৯-এ ফোন করেও কোনো সাহায্য মিলছে না। পুলিশ পাশে দাঁড়িয়ে থেকেও বলছে, ‘ওপরের নির্দেশ নেই’। জীবন আর মৃত্যুর সেই সন্ধিক্ষণ থেকে ফিরে আসা শামীমা যখন বলছিলেন যে, "সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল যখন প্রাণ বাঁচাতে ভবন থেকে বের হলাম। বাইরে আমাদের জন্য আগুনের চেয়েও ভয়ংকর এক উন্মত্ত ভিড় অপেক্ষা করছিল। সাংবাদিক হওয়ার অপরাধে আমাদের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা চলছিল, আর নারী হওয়ার কারণে সেই আক্রমণের তীব্রতা ছিল কয়েক গুণ বেশি।"


শামীমার এই অভিজ্ঞতা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন নারী যখন সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন, তখন এই লড়াইটা তার প্রতিদিনের সঙ্গী। রাস্তায় বের হলে মানুষের কটু কথা, রাজনৈতিক সমাবেশে প্রবেশে বাঁধা, আর কখনো কখনো খোদ সহকর্মীদের বাঁকা চাহনি—সব মিলিয়ে এক অদৃশ্য যুদ্ধের ভেতর দিয়ে তাদের পথ চলতে হয়। বিশেষত নির্বাচনের সময়ে এই অনিশ্চয়তা আর ভয় পাহাড়ের মতো হয়ে দাঁড়ায়।


এই সংকটময় প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজন করে নারী সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ এক প্রশিক্ষণ কর্মশালা: নির্বাচনী রিপোর্টিং ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা। গত ২১ ডিসেম্বর ২০২৫-এ আয়োজিত এই প্রশিক্ষণে জড়ো হয়েছিলেন প্রায় ৪০ জন নারী সাংবাদিক। উদ্দেশ্য একটাই—আসন্ন নির্বাচনে কীভাবে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পেশাগত দায়িত্ব পালন করা যায়।


অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, 'সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের সুরক্ষা আমাদের সকলের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হলে যারা সত্য তুলে ধরেন, আগে তাঁদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।' উপদেষ্টা, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা  অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের সাংবাদিকদের সক্রিয় থাকার আহ্বান জানান এবং বলেন যে, বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জগুলো মাথায় রেখেই সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। উদ্বোধনী অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন টিআইবি’র আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।


এই প্রশিক্ষণের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল বাস্তবমুখী আলোচনা। সাবেক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা জেসমিন তুলি ব্যাখ্যা করেন কীভাবে রাজনৈতিক চাপ ও কাঠামোগত দুর্বলতা সাংবাদিকদের জন্য পরিবেশকে বৈরী করে তোলে। তিনি আইন কানুন ভালো করে বোঝা এবং প্রতিটি অনিয়ম নথিবদ্ধ করার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাখাওয়াত লিটন তুলে ধরেন যে, নারী সাংবাদিকদের মাঠ থেকে দূরে রাখা বা হেনস্তা করা আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কৌশল। তিনি তুলে ধরেন, আরপিও (RPO) বা নির্বাচনী আচরণবিধি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা একজন সাংবাদিকের আত্মবিশ্বাসের সাথে পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে সাহায্য করে।

Speaker imageটিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. মাহফুজুল হক দেখান কীভাবে 'ইলেকশন প্রসেস ট্র্যাকিং' এর মাধ্যমে তথ্যের সঠিকতা যাচাই রিপোর্টিংয়ের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়। আর পুলিশের ডিআইজি তাপ্তুন নাসরিন সরাসরি কথা বলেন সংবাদ সংগ্রহে মাঠে চলাফেরা, ভিড় সামলানো এবং সাংবাদিকদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে। তিনি বুঝিয়ে দেন কীভাবে আইনি অধিকারগুলো ব্যবহার করে পুলিশি সহায়তা নিশ্চিত করা সম্ভব।


এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা কেবল তথ্যই পাননি, বরং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল শিখেছেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছেন কেন তাঁদের কাজ বাধাগ্রস্ত হয় এবং কীভাবে আইন ও তথ্যের শক্তিতে সেসব মোকাবিলা করা যায়।

সমাপনী অধিবেশনে ড. ইফতেখারুজ্জামান অংশগ্রহণকারীদের হাতে সনদ তুলে দেন। এই আয়োজনটি নারী সাংবাদিকদের পাশে থাকার জন্য টিআইবি’র একটি অঙ্গীকার, যেন চ্যালেঞ্জিং পরিবেশেও তাঁরা নির্ভয়ে এবং নৈতিকতা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি