প্রকাশকাল: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
“ই-বর্জ্য আসলে ময়লা নয়, এটি আমাদের জন্য বর্জ্যের চেয়েও বড় একটি সুযোগ বা অপরচুনিটি। সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে এই খাত থেকে বছরে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি আয় করা সম্ভব। কিন্তু সেই সম্পদ আজ অবহেলায় বিষ হয়ে মাটির সাথে মিশছে।”
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক রওশন মমতাজের এই কথাই যেন গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে আয়োজিত অংশীজন সভার মূল সুর বেঁধে দেয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত এই সভায় যখন ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকটের কথা আসছিল, তখন এই আশার বাণীটি উপস্থিত সবাইকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। তবে এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার ঠিক উল্টো পিঠেই যে এক ভয়াবহ অব্যবস্থাপনার পাহাড় জমেছে, সেই রূঢ় সত্যটি উঠে আসে টিআইবির সাম্প্রতিক গবেষণায়। টিআইবির “প্রোমোটিং ইন্ট্রিগ্রিটি ইন সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট টুওয়ার্ডস ক্লাইমেট জাস্টিস ইন বাংলাদেশ” প্রকল্পের আওতায় এই সময়োপযোগী গবেষণাটি সম্পন্ন হয়।
প্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে আমাদের প্রতিদিনের জীবন ইলেকট্রনিক পণ্য ছাড়া কল্পনা করা কঠিন। সকালে স্মার্টফোনের অ্যালার্ম থেকে শুরু করে অফিসের ল্যাপটপ কিংবা বাসার রেফ্রিজারেটর—সবই আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটি বেশ অন্ধকার। এই পণ্যগুলো যখন পুরনো বা নষ্ট হয়ে যায়, তখন সেগুলো পরিণত হয় 'ই-বর্জ্য' বা ইলেকট্রনিক বর্জ্যে; যা আমাদের অজান্তেই পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য এক চরম ঝুঁকি তৈরি করছে।
সভার শুরুতে গবেষণার বিস্তারিত তথ্য ও সুপারিশসমূহ উপস্থাপন করেন টিআইবির পরিবেশ ও জলবায়ু অর্থায়ন বিভাগের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আবদুল্লাহ্ জাহীদ ওসমানী। তাঁর উপস্থাপনায় উঠে আসে এক উদ্বেগজনক চিত্র। তিনি জানান, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১৩.৩ মিলিয়ন কেজি ই-বর্জ্য উৎপাদিত হলেও এর মাত্র ৩ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় আসে। বাকি ৯৭ শতাংশই চলে যাচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের হাতে, যেখানে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বর্জ্য পোড়ানো বা ভাঙা হয়। গবেষণায় আরও দেখা যায়, ই-বর্জ্য আমদানি নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ২০২১-২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার টন ই-বর্জ্য দেশে এসেছে, যার পেছনে খরচ হয়েছে ৭ লাখ মার্কিন ডলার। এর মানে হলো, আমরা একদিকে নিজেদের বর্জ্য সামলাতে পারছি না, অন্যদিকে বিদেশের বিষাক্ত বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছি। এছাড়া বড় কোম্পানিগুলো বর্জ্য সংগ্রহের যে লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছিল, তা পালনেও তাদের চরম অনীহা লক্ষ্য করা গেছে।
ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে ট্রান্সকম ইলেকট্রনিক্স-এর হেড অব প্ল্যান জনাব হুমায়ুন কবীর এবং ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জড়িত অন্যান্য উদ্যোক্তারা সভায় তাঁদের সীমাবদ্ধতার কথা স্পষ্ট করেন। জনাব হুমায়ুন কবীর বলেন, ব্যবসায়ীদের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উদ্বুদ্ধ করতে নিয়ম-নীতির সাথে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেন যে, সঠিক কোনো 'সিস্টেম' বা পদ্ধতি গড়ে না ওঠায় প্রয়োজনীয় পরিমাণ বর্জ্য তাঁদের কাছে পৌঁছায় না। অধিকাংশ বর্জ্য ভাঙারিওয়ালাদের মাধ্যমে অদক্ষভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয় অথবা যন্ত্রাংশ হিসেবে অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যায়। তাঁরা এই খাতকে একটি লাভজনক শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে সকল অংশীজনের সমন্বয়ে একটি কার্যকর ব্যবস্থা দাঁড় করানোর আহ্বান জানান।
সভার আলোচনায় সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা ও সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও প্রকট হয়ে ওঠে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা স্বীকার করেন যে, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিধিমালা থাকলেও মাঠপর্যায়ে কার কী ভূমিকা, তা নিয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট কারিগরি নির্দেশিকা (Technical Guidelines) নেই। ফলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে তাঁরা দ্রুত মেজারমেন্ট টুল আপডেট এবং নির্দেশিকা প্রণয়নের আশ্বাস দেন। একই সুর শোনা যায় সিটি কর্পোরেশনের প্রতিনিধিদের কণ্ঠেও। তাঁরা জানান, ই-বর্জ্য সংগ্রহের জন্য সিটি কর্পোরেশনের কাছে কোনো কার্যকরী নির্দেশনা নেই। ফলে তারা এই বর্জ্য সাধারণ ময়লার সাথেই ফেলে দিচ্ছে, যা মাটির জন্য দীর্ঘমেয়াদী বিষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এছাড়া তদারকির জন্য পর্যাপ্ত জনবলের অভাবের বিষয়টিও সভায় গুরুত্বের সাথে উঠে আসে।
পুরো আলোচনা সভাটি পরিচালনা করেন টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের। তিনি এই খাতের প্রধান বাধা হিসেবে 'সমন্বয়ের অভাব'কে চিহ্নিত করেন এবং একটি সমন্বিত কাজের পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আইন ও তার সঠিক ব্যবহারের জন্য সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সারা বিশ্বেই ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বেশ কঠিন। তবে আমাদের দেশে দায়বদ্ধতার অভাব এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।” তিনি ভোক্তা পর্যায় থেকে শুরু করে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান—সবার অংশগ্রহণে একটি 'কার্যকর সিস্টেম' বা পদ্ধতি দাঁড় করানোর ওপর জোর দেন।
প্রযুক্তির আলো যেন পরিবেশের জন্য কালো ধোঁয়া হয়ে না দাঁড়ায়, সেজন্য এখনই সময় সম্মিলিতভাবে এই 'ইলেকট্রনিক বর্জ্য'কে সম্পদে রূপান্তর করার। অন্যথায়, আগামীর বাংলাদেশে প্রযুক্তির আশীর্বাদের চেয়ে ই-বর্জ্যের অভিশাপই বেশি ভারী হয়ে উঠবে। দায়বদ্ধতা আর সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।