দুর্নীতিবিরোধী কার্টুন প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনী ২০২৫: তরুণদের তুলিতে দুর্নীতির প্রভাব ও মানবাধিকারের বিপন্ন রূপ

প্রকাশকাল: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫

দুর্নীতির মত সর্বগ্রাসী সামাজিক ব্যাধিকে প্রতিহত করতে কি পেন্সিল-রঙ-তুলিই যথেষ্ট? হয়তো নয়। কিন্তু সমাজকে সচেতন করতে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে তরুণদের এই তুলনাহীন উদ্যোগ গত ২০ বছর ধরে বয়ে এনেছে সার্থকতা। তাই আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস ২০২৫ উপলক্ষে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ২০তম দুর্নীতিবিরোধী কার্টুন প্রতিযোগিতার পুরষ্কার বিতরণী ও প্রদর্শনী আয়োজন করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এ বছরের প্রতিপাদ্য “দুর্নীতি ও মানবাধিকার” তরুণ শিল্পীদের কার্টুন, কমিক স্ট্রিপ এবং ডিজিটাল শিল্পকর্মে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। রূপক ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মাধ্যমেই দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যকার নিবিড় যোগসূত্র তুলে ধরেছে তরুণ প্রজন্ম।

কার্টুনিস্টরা যেমন হাস্যরসের মাধ্যমে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকা-ের অযৌক্তিকতা প্রকাশ করেছেন, আবার অনেকে সততা বিসর্জন দেওয়ার ফলে সমাজের যে অবক্ষয় ঘটে তার একটি ভয়াবহ রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। নাগরিকদের মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত করার প্রশাসনিক বাধা থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম-অন্যায়কে স্বাভাবিকতায় রূপ দেওয়া যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিল্পকর্মগুলো প্রমাণ করেছে যে যেখানেই দুর্নীতি আছে, সেখানেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়; কারণ ক্ষমতাশালীরা ব্যক্তিগত লাভের জন্য ক্ষমতাহীনদের শোষণ করে। গত ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ আয়োজিত পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তরুণদের সৃজনশীলতার এই পরিবর্তনকামী শক্তির প্রশংসা করেন। সুইডেন দূতাবাসের ডেপুটি হেড অফ মিশন ইভা স্মেডবাগ বলেন তরুণরা কার্টুনের মাধ্যমে সামাজিক বৈষম্যগুলো তুলে ধরছে এবং এই শিল্প মাধ্যমই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হতে সাহায্য করবে। নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি কর স্টাউটেন অংশগ্রহণকারী কার্টুনিস্টদের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা অন্যায়গুলো তারা তুলে ধরেছেন এবং দেখিয়েছেন যেখানেই দুর্নীতি আছে সেখানেই মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটে। ব্রিটিশ হাইকমিশনের গভর্নেন্স অ্যাডভাইজার এমা উইন্ড সামাজিক কাঠামোর অদৃশ্য অনিয়মগুলো তুলে ধরার জন্য তরুণ শিল্পীদের প্রশংসা করেন। বাংলাদেশে সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার (গভর্নেন্স অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস) সাবিনা ইয়াসমীন লুবনা বলেন কার্টুন পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে এবং সমাজে ইতিবাচক রূপান্তর আনতে তরুণরা এর মাধ্যমে আপামর জনসাধারণকে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বলেন, “কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল কার্টুন, গ্রাফিতি এবং দেয়ালচিত্র। এখানে অগ্রণী ভূমিকা রাখা তরুণ শিল্পীদের অনেকেই টিআইবি আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। তারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে এগিয়ে এসেছিলেন অপশাসনের বিরুদ্ধে যা মানুষের প্রতিবাদের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। তাদের সাহস প্রমাণ করে যে দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে তরুণরা এবং তাঁদের শিল্পকর্ম অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি। তাই এই প্রদর্শনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান কেবল শৈল্পিক প্রতিভার উদ্যাপনই নয়, বরং সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকারও প্রতিফলন।”

এ বছর প্রতিযোগিতার ২০তম আসরে ১৯৯ জন শিল্পী ৪০০-র বেশি কার্টুন পাঠিয়েছিলেন। হাতে আঁকা কার্টুনের দুটি বিভাগে ৩৩৯টি, ডিজিটাল বিভাগে ৪৪টি এবং কমিক স্ট্রিপ বিভাগে ২৭টি কার্টুন জমা পড়েছে। প্রতিযোগিতার বিজয়ী এবং বিশেষ মনোনয়নপ্রাপ্ত ৪২ জন কার্টুনিস্টের মোট ৫৯টি কার্টুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের জয়নুল গ্যালারিতে ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত প্রদর্শিত হবে। অনলাইনে ভার্চুয়াল গ্যালারিতেও ছবিগুলো দেখার সুযোগ রয়েছে।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি