নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের রূপান্তরে স্বচ্ছতা ও নীতি সংস্কারের দাবি বিশেষজ্ঞদের

প্রকাশকাল: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫

গভীরতর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং একাধিক অস্বচ্ছ চুক্তির বেড়াজালে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উত্তরণের পথ দীর্ঘকাল ধরে বাধাগ্রস্ত হয়ে আছে। সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার এবং বিশ্বজুড়ে কার্বনমুক্ত জ্বালানির (ডিকার্বনাইজেশন) ক্রমবর্ধমান দাবি সত্ত্বেও, কাঠামোগত নানা অনিয়ম এই খাতের অগ্রযাত্রাকে সীমিত করে রেখেছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ এনার্জি কনফারেন্স ২০২৫ এ চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে উত্তরণকে বাধাগ্রস্ত করা প্রশাসনিক ব্যর্থতার মোকাবেলায় এ সম্মেলনে একত্রিত হয়েছিলেন নীতিনির্ধারক, নিয়ন্ত্রক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দসহ চার শতাধিক অংশীজন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং ষোলটি সহ-আয়োজকদের সহায়তায় বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিডব্লিউজিইডি) এর উদ্যোগে যৌথভাবে ৬-৮ ডিসেম্বর ঢাকাস্থ বাংলাদেশ সামরিক জাদুঘরে তিনদিনব্যাপী তৃতীয় বাংলাদেশ জ্বালানি সম্মেলন ২০২৫ অনুষ্ঠিত হয়।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রধান অতিথি হিসেবে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা একটি দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত প্রক্রিয়া। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য ধারাবাহিক নীতি নির্দেশনা এবং সততা ও সুশাসনের ভিত্তিতে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক তত্ত্বাবধান প্রয়োজন। তিনি সকল সরকারি ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের সরকারের উদ্যোগের দ্রুত অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করেন।

উদ্বোধনী অধিবেশনে অন্যান্য বিশিষ্ট বক্তাদের মধ্যে ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এর গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম; সেন্টার ফর রিনিউয়েবল এনার্জি সার্ভিসেস লিমিটেড (সিআরইএসএল) এর চেয়ারম্যান শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী; এথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ (ইটিআই) বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক আবিল বিন আমিন; পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (প্রাণ) এর প্রধান নির্বাহী নুরুল আলম মাসুদ; অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশনের ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ; সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি (এসআরএস) এর নির্বাহী পরিচালক সেকেন্দার আলী মিনা; লইয়ার্স ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এলইইডি) এর গবেষণা পরিচালক অ্যাডভোকেট শিমনুজ্জামান; মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের রাইটস অ্যান্ড গভর্নেন্স বিভাগের পরিচালক বনশ্রী মিত্র নিয়োগী; এবং বিডব্লিউজিইডির আহ্বায়ক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম। তারা বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের জন্য শাসন, নীতিগত সমন্বয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি অনুসরণের ওপর জোর দেন।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো স্বীকার করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফওজুল কবির খান বলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা এবং সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে বড় বাধা স্বার্থের দ্বন্দ্ব । সরকার নবায়নযোগ্য যন্ত্রপাতির উপর কর হ্রাস এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজীকরণের প্রবর্তন করলেও, এ খাতে গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের আশু প্রয়োজন। বাংলাদেশ জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের চাপের কারণে তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় নীতিমালার অভাবে শিল্প মালিকরা চাইলেও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি গ্রহণ করতে পারছেন না। শিল্প ও জ্বালানি খাতের এই সমন্বয়হীনতা দূর করা জরুরি।

সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা কীভাবে সামাজিক ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করে তা বিশদভাবে তুলে ধরা হয়। টিআইবির এনার্জি গভর্নেন্স বিভাগের সহ-সমন্বয়ক আশনা ইসলামের সঞ্চালনায় একটি অধিবেশনে নারী, আদিবাসী সম্প্রদায় এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কীভাবে জ্বালানি রূপান্তর পরিকল্পনা থেকে বঞ্চিত থাকে তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিক পরামর্শে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রকৃত সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত প্রসারিত করা উচিত। টিআইবি এনার্জি গভর্নেন্স বিভাগের সমন্বয়ক নেওয়াজুল মওলা একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন, যেখানে দেখানো হয়েছে যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিদ্যমান নীতিমালার অস্পষ্টতা এবং দুর্বল তদারকি পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উত্তরণ প্রক্রিয়াকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা প্রকল্প অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান তার বক্তব্যে বলেন, প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া এড়িয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সুবিধা রক্ষার্থে অতীতে সম্পাদিত অস্বচ্ছ চুক্তিগুলোই এখন এই খাতের বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ‘অন্যায্য চর্চা’ বন্ধ না হলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের লক্ষ্য অধরা থেকে যাবে।

কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবিতে একটি নাগরিক ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে সম্মেলনটি সমাপ্ত হয়। ঘোষণাপত্রে জীবাশ্ম জ্বালানি ভর্তুকি বন্ধ, নতুন এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ এবং স্বচ্ছ শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়। এতে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ত্বরান্বিত করার জন্য সূর্যবাড়ি উদ্যোগের প্রস্তাব করা হয় এবং সৌর সরঞ্জামের উপর আমদানি শুল্ক হ্রাস করার আহ্বান জানানো হয়। ঘোষণাপত্রে নীতি কাঠামোর সাথে ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের একীকরণ এবং সমন্বিত কর্মসূচির মাধ্যমে দুই মিলিয়ন পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান সৃষ্টির দাবিও করা হয়।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি