প্রকাশকাল: ৩০ নভেম্বর ২০২৫
বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল মাধ্যমের মাধ্যমে অর্থ পাচার ও দুর্নীতির প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। এ সব অপরাধের তদন্ত, অপরাধী চিহ্নিত করা এবং তাদের বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনাও জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দুর্নীতি নির্মূলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এর বিভিন্ন পর্যায়ের ৪০ জন তদন্ত কর্মকর্তার (ঢাকা থেকে ২৪ জন এবং ঢাকার বাইরে থেকে ১৬ জন) পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে ২৬-২৭ নভেম্বর ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি)'র ধানমণ্ডি কার্যালয়ে প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
‘ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে বিদেশে অর্থপাচারের হিড়িক সম্পর্কে আমরা যা জানি, তা ভাসাভাসা জ্ঞান। ইন্টারনেটের বিশাল জগতের হয়ত মাত্র ৪-৫% আমাদের জানার পরিধির মধ্যে আছে। দেশের বাইরে থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অনেকেই সম্পদ পাচার করছেন। আজ যে প্রশিক্ষণ আমাদের দেওয়া হলো, এটা খুবই সময়োপযোগী। এর মাধ্যমে এগুলো আটকানোর উপায় সম্পর্কে আমাদের কিছুটা হলেও ধারণা হলো।’ কথাগুলো বলছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একজন তদন্ত কর্মকর্তা। দুদক ও টিআইবির মধ্যকার চলমান সমঝোতা স্মারকের আওতায় আয়োজিত দুই-দিনব্যপী ‘ডিজিটাল ফরেনসিক, ফরেনসিক এনালাইসিস, ফরেনসিক একাউন্টিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সি’ বিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণের সমাপনী অধিবেশনে তার আরও ৩৯ জন সহকর্মীর পক্ষ থেকে তিনি এই বক্তব্য রাখেন। দুদকের ওই তদন্ত কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘পুঁজিবাজার সংক্রান্ত তদন্ত করতে কোন বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নজর দেওয়া প্রয়োজন তা-ও শিখলাম। আশা করছি, ডিজিটাল উপায়ে আর্থিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই প্রশিক্ষণ আমাদের কাজে লাগবে।’
প্রশিক্ষণের প্রথম দিনে ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং, ডিজিটাল জালিয়াতি সনাক্তকরণ ও অনুসন্ধান এবং পুঁজিবাজারে ডিজিটাল কারচুপি ও অবৈধ প্রভাববিস্তার সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিবিএ প্রোগ্রামের পরিচালক এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন রিফর্ম টাস্কফোর্সের সদস্য জনাব আল-আমিন দিনব্যাপী এ সেশন পরিচালনা করেন।
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের নিম্নমুখী গতির কারণ হিসেবে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবের উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পুঁজিবাজারে এ ধরনের অপরাধের কারণেই অতীতে সাধারণ ক্রেতারা সর্বস্ব হারিয়েছেন। তাই এখনও পুঁজিবাজারে জনগণের আস্থা সম্পূর্ণভাবে ফিরে আসেনি।’ এ অবস্থার উত্তরণে দুদক কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি জরুরি বলে মনে করেন তিনি।
প্রশিক্ষকের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করে একজন দুদক কর্মকর্তা বলেন পুঁজিবাজার সংক্রান্ত দুর্নীতিগুলো চিহ্নিত করতে তদন্তকারী কর্মকর্তার জানাশোনার পরিধি আরও বিস্তৃত করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে এ ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যকরী কারণ তাতে অবৈধ লেনদেন, বিশেষ করে বাজারে প্রভাববিস্তারের কৌশল উন্মোচন করা সহজ হয়ে যায়।’
প্রশিক্ষণের দ্বিতীয় দিনে ইউনিভার্সিটি অব মালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ এরশাদুল করিম ডিজিটাল স্পেস, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থপাচার ও ডার্ক ওয়েব সংক্রান্ত সশন পরিচালনা করেন। সেশনটিতে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো থেকে কীভাবে ডিজিটাল কারেন্সি, বিশেষত বিটকয়েনের মত ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে দেশের বাইরে থেকেও প্রাক্তন আমলা মন্ত্রীরা অর্থপাচার করেছেন এ সম্পর্কে ধারণা দেন তিনি।
ঢাকার বাইরে থেকে আগত একজন প্রশিক্ষণার্থী বলেন, ‘জেলা পর্যায়ে অর্থাৎ সমন্বিত জেলা কার্যালয়গুলোতে এ ধরনের বিপুল অঙ্কের দুর্নীতি সাধারণত আমাদের মোকাবেলা করতে হয় না। তবে আমাদের হাতে এখন প্রাক্তন মন্ত্রী ও স্থানীয় সাংসদদের বিপুল পরিমাণ দুর্নীতির তথ্য আছে, যা যাচাই বাছাই করতে ও তাদের আইনের আওতায় আনতে ডিজিটাল কারেন্সি সংক্রান্ত জ্ঞান আমরা কাজে লাগাতে পারব।’
কর্মশালার সর্বশেষ সেশনটি পরিচালনা করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। ওপেন সোর্স ব্যবহার করে অবৈধ সম্পদ চিহ্নিত করার কৌশল এবং ওপেন ডেটার বিভিন্ন তথ্যভা-ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি নির্মূলে ওপেন সোর্স সংক্রান্ত জ্ঞান দুর্নীতিগুলো চিহ্নিত করতে তদন্ত কর্মকর্তাদের কার্যকর ও প্রয়োজনীয় সহায়তা করবে। ’
সমাপনী অধিবেশনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘দুদককে প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যকর করার জন্য অন্যতম পূর্বশর্ত দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা। আপনাদের দক্ষতা, পেশাগত উৎকর্ষ, সততা এক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত আপনাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যে দক্ষতা প্রয়োজন, সেটি বৃদ্ধির জন্য টিআইবি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দুদকের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য টিআইবি সবসময় সবধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। দুদকের জন্মলগ্ন থেকে টিআইবি যুক্ত ছিল। আমরা চাই, দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদক মানুষের প্রত্যাশা পূরণে একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেকে পরিচিত করুক, কার্যকর ফলাফল লাভের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করুক।’
টিআইবির অব্যাহত সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে দুদক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন জানান দুদক ও টিআইবির যৌথ উদ্যোগের পরিধি আরো বিস্তৃত করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘দুদকের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যোগ বেগবান করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও সহায়তা প্রদান করা হবে। দুর্নীতি দমনে টিআইবি দুদকের অন্যতম শক্তিশালী মিত্র। টিআইবি যত ভালভাবে নিজেদের কাজ করতে পারবে, দুদকের কাজ তত সহজ হবে।’
দুদক চেয়ারম্যানের বক্তব্যের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত প্রশিক্ষণার্থীরা ভবিষ্যতে টিআইবির তত্ত্বাবধানে আরও নিবিড় প্রশিক্ষণে যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অংশগ্রহণকারীদের মাঝে সনদ বিতরণের মাধ্যমে দুইদিনের এই বিশেষায়িত কর্মশালা শেষ হয়।