প্রকাশকাল: ০৯ নভেম্বর ২০২৫
দুর্নীতির বিরুদ্ধে একদল সচেতন তরুণ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে সাভারের সিসিডিবি হোপ সেন্টারে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হলো তিন দিনের এক আবাসিক বিতর্ক প্রতিযোগিতা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ১০০ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী এবং ৫০ জন বিচারকের অংশগ্রহণে এই আসরটি আয়োজন করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি। আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুক্তির মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করা।
আবাসিক এই আয়োজনে বিতার্কিকদের ব্যস্ততা কেবল মঞ্চে সীমাবদ্ধ ছিল না। ডরমিটরির আড্ডা থেকে শুরু করে খাবারের টেবিল পর্যন্ত সবখানেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল একটি প্রশ্ন: আমাদের এই অনড় সিস্টেম কি আদৌ বদলানো সম্ভব? এই কৌতূহল থেকেই জন্ম নিচ্ছিল একের পর এক অকাট্য যুক্তি। তিন দিনের এই আবাসিক প্রতিযোগিতায় মোট ৮৭টি সংসদীয় পদ্ধতির বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় যার প্রতিটি সেশন ছিল সুশাসন ও জবাবদিহিতার এক একটি বৌদ্ধিক মহড়া।
প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্যায়ে মুখোমুখি হয় ঢাকা ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি এবং রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং ফোরাম। ফাইনাল বিতর্কের বিষয় ছিল: দুর্নীতি প্রতিরোধে তরুণ প্রজন্মের প্রতি প্রত্যাশা বাগড়ম্বরমাত্র। দুই পক্ষই অত্যন্ত চমৎকারভাবে তাদের অবস্থান তুলে ধরে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তবে উপস্থিত দর্শকদের মতে এই জয় কেবল একটি দলের ছিল না বরং জয়ী হয়েছে সেই সব শিক্ষার্থী যারা দুর্নীতিকে এড়িয়ে না গিয়ে সেটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সাহস দেখিয়েছে।
এই আয়োজনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল লৈঙ্গিক সমতা। ৩২টি দলের প্রতিটিতেই নারী বিতার্কিক ছিলেন এবং বিচারক প্যানেলের ১৬ জন ছিলেন নারী। এটি কেবল সংখ্যা নয় বরং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারী নেতৃত্বের একটি ইতিবাচক প্রতিফলন।
ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে আসরের সেরা বিতার্কিক হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারিম আহসান এবং ফাইনাল রাউন্ডের সেরা হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিফতাহুল জান্নাত রিফাত। তাদের কাছে ট্রফির চেয়েও বড় পাওয়া ছিল এই তিন দিনের অভিজ্ঞতা যা তাদের দুর্নীতির মতো জটিল বিষয়কে গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিতার্কিক ও বিচারকগণকে শপথ বাক্য পাঠ করান। ব্যক্তিজীবনে সততা বজায় রাখা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বদা সোচ্চার থাকার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়েই প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এই শপথের প্রভাব প্রতিটি শিক্ষার্থীর মধ্যে এক ধরণের নৈতিক দৃঢ়তা তৈরি করে, যা পুরো আয়োজনেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল।
সমাপনী বক্তব্যে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন যে একজন প্রকৃত বিতার্কিক কখনোই দুর্নীতি করতে পারেন না। কারণ বিতর্ক মানুষকে যুক্তিনির্ভর হতে এবং অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়। দুর্নীতির ভিত্তি হলো অসততা আর বিতর্কের ভিত্তি সত্য ও যুক্তি। তাই এই দুটি পথ কখনোই এক হতে পারে না।
অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও নেটওয়ার্কিং দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে টিআইবির প্রকৃত লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। আয়োজনের শেষে ঘোষণা করা হয় প্রতিযোগিতার সেরা আটটি দল সরাসরি ২০২৬ সালের আসরে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। এই তরুণরা এখন নিজ নিজ ক্যাম্পাস আর লোকালয়ে ফিরে যাবে একেকজন দুর্নিতির প্রতির সজাগ প্রহরী হিসেবে। তাদের এই শাণিত যুক্তিগুলো এখন কেবল বিতর্কের মঞ্চে নয় বরং ছড়িয়ে পড়বে প্রাত্যহিক জীবনের প্রতিটি স্তরে।