প্রকাশকাল: ০৫ অক্টোবর ২০২৫
জাতিসংঘের ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ব্যক্তি বছরে গড়ে ৮২ কেজি খাদ্য অপচয় করেন। সমষ্টিগতভাবে এটি বছরে প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ টন খাদ্য অপচয়, যা চাল, ডাল, আম ও মাছসহ প্রধান খাদ্যের প্রায় ৩৪ শতাংশ। এই বিপুল অপচয় কেবল খাদ্য নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং জলবায়ু সংকট ও টেকসই উন্নয়নের জন্যও এক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এসব অপচয়িত খাদ্য শেষ পর্যন্ত বর্জ্যভূমিতে পচে উৎপন্ন করে মিথেন গ্যাস, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় বহু গুণ ক্ষতিকর।
এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ‘ইন্টারন্যাশনাল ডে অব অ্যাওয়ারনেস অন ফুড লস অ্যান্ড ফুড ওয়েস্ট’ উপলক্ষে “বর্জ্যভূমি হ্রাসে খাদ্য অপচয় রোধ” শীর্ষক বিশেষজ্ঞ পরামর্শ সভার আয়োজন করে। সভায় পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতের একাডেমিক, গবেষক, সাংবাদিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা অংশ নেন।
পরামর্শ সভায় অংশগ্রহণকারীরা ভোক্তা ও খুচরা পর্যায়ের খাদ্য অপচয়, উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে খাদ্য ক্ষতি এবং শাসনব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে আলোচনা করেন। তারা জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বর্জ্য আলাদা করা, পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। “ওয়েস্ট কনসার্ন”-এর পরিচালক এনায়েতুল্লাহ আর্থিক ও নিয়ন্ত্রক প্রণোদনা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির সুপারিশ করেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মো. শফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, দেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখনো কার্যকর নীতি ও বাস্তবায়ন ঘাটতি বিদ্যমান।
জাইকার সলিড ওয়েস্ট কনসালট্যান্ট ড. তারিক বিন ইউসুফ জানান, প্রশিক্ষণের অভাবে পৌরসভাগুলোতে যন্ত্রপাতির অপব্যবহার হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর মো. জাহিদুল ইসলাম সঠিক তথ্যের ঘাটতির কথা উল্লেখ করেন, কারণ অধিকাংশ তথ্য শুধু সিটি করপোরেশনভিত্তিক, গ্রামীণ এলাকার তথ্য অনুপস্থিত। ওয়াটার এইড বাংলাদেশ-এর কাজী রাশেদ হায়দার বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রগুলোকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ পুনরুদ্ধার কেন্দ্রে রূপান্তরের প্রস্তাব দেন।
বিশ্বব্যাপী বর্জ্যভূমি মিথেন নির্গমনের তৃতীয় বৃহত্তম উৎস, যা খাদ্য অপচয় কমিয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব। এটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) ১২.৩, ১৩ এবং ২ অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
সভা পরিচালনা করেন টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা, ড. সুমাইয়া খায়ের। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা, উদ্ভাবন ও জনসচেতনতার সমন্বয়ে বাংলাদেশ একটি টেকসই, দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বিভিন্ন দেশের সফল উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে তা প্রয়োগের মাধ্যমে খাদ্য অপচয় হ্রাস ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব।” তিনি সরকার, ব্যবসায়ী, নাগরিক সমাজ ও জনগণকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
খাদ্য অপচয় হ্রাস পরিবেশ সুরক্ষা ও সম্পদ সংরক্ষণের সবচেয়ে সরাসরি ও কার্যকর উপায়। আজকের নষ্ট ফসল যেন আগামী দিনের ভবিষ্যৎ হারিয়ে না ফেলে—এই নৈতিক ও পরিবেশগত দায়িত্ববোধ থেকেই টিআইবির এই পরামর্শ সভা টেকসই, জবাবদিহিমূলক ও ক্ষুধামুক্ত ভবিষ্যতের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।