প্রকাশকাল: ০৫ অক্টোবর ২০২৫
নাগরিকের তথ্য অধিকার সুরক্ষা ও তথ্য অধিকার আইনকে কার্যকর করতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও কার্যকর তথ্য কমিশন গঠন জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও স্বার্থসংঘাতমুক্ত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস উপলক্ষে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ বিষয়ক এক সেমিনারে এসব মতামত ব্যক্ত করেন বক্তারা। “পরিবেশের তথ্য ডিজিটাল যুগে হোক সুনিশ্চিত” আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তথ্য অধিকার ফোরামের আয়োজনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়, যার অন্যতম অংশীদার ছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশের উপপরিচালক রুহি নাজ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এতে তথ্য অধিকার আইনের সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা, তথ্য কমিশনের অকার্যকারিতা, গোপনীয়তার সংস্কৃতি এবং তথ্যপ্রাপ্তিতে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাসহ বিভিন্ন ইস্যু উঠে আসে।
আলোচক হিসেবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কমিশন—তথ্য কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনে কমিশনার পদ শূন্য রয়েছে। এটি সম্ভবত প্রথমবারের মতো ঘটেছে। সরকার অনেক ভালো উদ্যোগ নিয়েছে, তবে এসব পদ পূরণ না করা একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে ১৪০ দেশের মধ্যে ২৭তম স্থানে আছে, যা তুলনামূলকভাবে ভালো; তবে আইনটির সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং সংশোধন প্রয়োজন। জাতীয় স্বার্থের স্পষ্ট সংজ্ঞা থাকা দরকার এবং আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী কিছু প্রতিষ্ঠান এর আওতার বাইরে রয়েছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, দুর্নীতির বড় অংশ বেসরকারি খাত ও রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার সঙ্গে যুক্ত, তাই এসব খাতকেও তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনা জরুরি।
ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঙ্গে একমত প্রকাশ করে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনা না গেলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। দলীয় স্বচ্ছতা ও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে জবাবদিহিমূলক শাসন কাঠামো গড়ে উঠবে না।” তিনি আরও বলেন, নাগরিক অংশগ্রহণই হচ্ছে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি, আর তথ্য অধিকার আইন সে পথ সুগম করে।
ইউনেসকো ঢাকা অফিসের প্রধান ও কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ সুজান ভাইজ তথ্য অধিকার আবেদন বাতিলের স্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি প্রস্তাব দেন, উচ্চ আদালতে মামলা করার সামর্থ্য যাদের নেই, তাদের জন্য কমিশনের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনায় একটি নাগরিক ফোরাম গঠন করা যেতে পারে।
সভাপতিত্ব করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। তিনি বলেন, “তথ্য অধিকার বর্তমানে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে। গত দেড় বছর ধরে তথ্য কমিশন কার্যত নিষ্ক্রিয়। জনগণ এখন এমন একটি সরকারের প্রত্যাশা করে, যা নাগরিকের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকারসহ তথ্য অধিকার রক্ষা করবে। এ জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।”
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের সচিব মাহমুদুল হোসেন খান। তিনি বলেন, “অনেক সরকারি দপ্তরে নাগরিক সনদ মানসম্মত নয়, যার ফলে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয় এবং এক অফিস থেকে আরেক অফিসে ঘুরে সময় নষ্ট করে।” তিনি তাৎক্ষণিক সংস্কারের আহ্বান জানান এবং নাগরিক সেবার মান উন্নয়নে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, একই দিনে তথ্য কমিশনের আয়োজিত পৃথক এক সেমিনারেও বক্তৃতা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি সতর্ক করে বলেন, “তথ্য কমিশন যেন অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের জায়গা না হয়ে ওঠে, যেমনটা অতীতে দেখা গেছে।” তিনি উল্লেখ করেন, কমিশন অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ক্রিয় রয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, যিনি দ্রুত কমিশনকে সক্রিয় করার আশ্বাস দেন। তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা শুধুমাত্র প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি নয়, এটি নাগরিক ক্ষমতায়নের জন্য এক অপরিহার্য পদক্ষেপ—সেমিনারে অংশগ্রহণকারীরা এ বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন।