অগ্রগতি সত্ত্বেও রাষ্ট্র সংস্কার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে: কর্তৃত্ববাদী সরকার পতন পরবর্তী এক বছর নিয়ে টিআইবির পর্যালোচনা

প্রকাশকাল: ০৭ আগস্ট ২০২৫


পতিত সরকারের কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে রাষ্ট্র একটি চৌর্যতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছিল এবং রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও আমলাদের যোগসাজশে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছিল। এর ফলে একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয়। লাগামহীন চাঁদাবাজি আর অত্যাচারে জনজীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি থেকে সৃষ্ট ক্ষোভের ফলই ছিল শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণ-আন্দোলন। সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে সেই আন্দোলনে কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ঘটে আর এক ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্নযাত্রা শুরু হয়।

কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর এক বছর অতিক্রান্ত হয়েছে এবং পূর্ববর্তী শাসনের অপচর্চাগুলোকে প্রতিহত করতে ব্যাপক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। যে শিক্ষার্থীরা এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনে নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারাই এখন উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ এক বছরে বাস্তবে কী পরিবর্তন এসেছে?

এই প্রেক্ষিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ‘কর্তৃত্ববাদী সরকার পতন-পরবর্তী এক বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক একটি গবেষণা পরিচালনা করেছে। এ ধরনের ব্যাপক পর্যালোচনামূলক গবেষণা পরিচালনাকারী প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিআইবির এই প্রতিবেদনের একটি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ এই সময়জুড়ে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের সমর্থনে টিআইবি ব্যাপক গবেষণা ও অধিপরামর্শ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। প্রতিবেদনটি একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে। বিচার বিভাগীয় সংস্কার, নির্বাচনী প্রস্তুতি এবং সুশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও সুশাসনের মানদণ্ডে বিচার করলে বেশ কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান। এর মধ্যে রয়েছে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি ও স্বচ্ছতার অভাব, স্বার্থের দ্বন্দ্বের মাঝে খেয়ালখুশিমতো শাসনকার্য পরিচালনা এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দলবাজি, অবৈধ দখল, চাঁদাবাজি ও অর্থের বিনিময়ে আইনকে প্রভাবিত করার মতো চাপ প্রয়োগের ঘটনা যা এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মৌলিক সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ক্ষমতাপ্রত্যাশী বড় দলগুলোর মধ্যে শর্তসাপেক্ষ ঐক্যমত্যও অধরা থেকে যাওয়ায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া, সামনে এগোনোর জন্য কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনো অনুপস্থিত।

কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পর স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে এগিয়ে এলেও বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি। দলীয়করণ, চাঁদাবাজি, ভূমি দখল ও আধিপত্য বিস্তারের মতো অপচর্চাগুলো এখনো বিদ্যমান। এটি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল চেতনাকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত অর্জনের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করছে। প্রতিবেদনটিতে তথ্যের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে চলমান চ্যালেঞ্জগুলোও তুলে ধরা হয়েছে। নাগরিক সমাজের সহযোগিতা ও সমালোচনা থেকে একটি মুক্ত পরিবেশের ইঙ্গিত মিললেও, কিছু গোষ্ঠীর ক্ষমতার অপব্যবহার এবং চাপিয়ে দেওয়া এজেন্ডা সমতার বাংলাদেশ গড়ার পথে বাধা সৃষ্টি করছে। বিগত এক বছরে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিস্তার লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, প্রতিষ্ঠানটি মামলা দায়ের ও প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত ও পক্ষপাতদুষ্ট রয়ে গেছে। অর্থ পাচারের মামলা আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ রেখে প্রস্তাবিত সংশোধনী নিয়ে টিআইবি উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করেছে যে, এটি অর্থ পাচারকে আরও উৎসাহিত করতে পারে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের জন্য প্রস্তাবিত ‘বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ ট্রান্সপারেন্সি’ বা ‘প্রকৃত মালিকানার স্বচ্ছতা’ আইন বহুলাংশে উপেক্ষিত হয়েছে, যা অর্থ পাচারবিরোধী কার্যক্রমকে দুর্বল করে ফেলেছে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন ‘বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে শুরু করলেও রাষ্ট্রসংস্কারের যাত্রাপথে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল চেতনার প্রতিফলনে অনেক অপ্রাপ্তি, স্থবিরতা, এমনকি পশ্চাদমুখীতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতির মৌলিক কোনো পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি। যারা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ফলে নিজেদের ক্ষমতায়িত ভাবছেন, তাদের অনেকেই একেবারে শুরু থেকেই দলবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি গ্রেফতার-বাণিজ্য, মামলা-বাণিজ্য, জামিন-বাণিজ্য ও আধিপত্য বিস্তারের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছেন। শুরু থেকে সরকারের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রণীত হয়নি, সরকার পরিচালনা হয়েছে এড-হক ভিত্তিতে, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির কারণে সিদ্ধান্তহীনতা এবং অনেক ক্ষেত্রে সরকারের পেছনের কোনো কোনো শক্তির বা অতিক্ষমতায়িত কোনো কোনো আন্দোলনকারীর চাপের মুখে সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হয়েছে। সংস্কার কমিশনসমূহের আশুকরণীয় সুপারিশ বাস্তবায়ন অভ্যন্তরীণ আমলাতান্ত্রিক প্রতিকূলতার হাতে জিম্মি রয়ে গেছে। কর্তৃত্ববাদের মেয়াদে যারা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বলয়ের বাইরে ছিলেন তারা মূলত দলীয়করণ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে দলীয়করণের ধারা অব্যাহত রেখে ‘‘এবার আমাদের পালা’’- এই সংস্কৃতির চর্চায় লিপ্ত হয়েছেন, যার বিস্তৃতি সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ে সকল ক্ষেত্রে দৃশ্যমান রয়েছে।’ টিআইবির এই গবেষণায় একটি হতাশাজনক বাস্তবতা উঠে এসেছে। কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন পরিবর্তনের জন্য অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করলেও ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর প্রতিশ্রুতি মূলত অপূর্ণই রয়ে গেছে। এর কারণ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কোনো সুস্পষ্ট লক্ষ্য ঠিক করতে পারেনি এবং প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী মহলকে রুখতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে পুরোনো সেই অপচর্চাগুলোই এখন নতুন রূপে ফিরে আসছে। এখনই যদি সঠিক পথে না ফেরা যায়, তবে বাংলাদেশ পরিবর্তনের এই ঐতিহাসিক সুযোগটি হারাবে। এজন্য স্বচ্ছতার প্রতি সত্যিকারের অঙ্গীকার দেখাতে হবে, সংস্কার প্রস্তাবগুলো ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে হবে পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্বার্থে এই ক্রান্তিকালকে ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জাতি আজ এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে হলে শোষণের এই পুরোনো চক্রকে ভেঙে অর্থবহ সংস্কার আনতেই হবে।

Read the Executive Summary of the Study


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি