প্রকাশকাল: ২৩ জুলাই ২০২৫
“আপনারা কি ‘মিনিস্টার মিলিয়নস’ প্রতিবেদনটি সম্পর্কে জানেন ?” – প্রশ্নটি করা মাত্রই নড়ে চড়ে বসেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ঝাঁক শিক্ষার্থী। প্রবল উৎসাহে তারা সেই সাড়াজাগানো অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের খুঁটিনাটি তুলে ধরেন, যেখানে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিদেশে গোপনে ৫০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি মূল্যের সম্পদ গড়ে তোলার তথ্য ফাঁস করা হয়েছিল। এই প্রতিবেদনে তাঁর দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিষয়টি উন্মোচিত হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই খবর প্রকাশের অনেক আগেই ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তাদের তথ্যনির্ভর ‘হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি’ গবেষণার মাধ্যমে সাইফুজ্জামান চৌধুরীকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। সেই সময়ই তাঁর বিদেশে সন্দেহজনক বিনিয়োগের বিষয়টি উঠে আসে। সম্পূরক প্রশ্ন হিসেবে টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একজন সাংবাদিক কীভাবে আরও গভীরে গিয়ে দুর্নীতির তথ্য উন্মোচনে ডেটা বা উপাত্তকে কাজে লাগাতে পারেন।
এই চিত্র দেখা গিয়েছিল গত ২৩ জুলাই। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগ ও টিআইবির যৌথ উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের জন্য ডেটা জার্নালিজম কর্মশালা আয়োজন করা হয়। কর্মশালায় কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের চল্লিশেরও বেশি শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য ছিল, সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীদের ডেটা জার্নালিজমের প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং ডেটাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের মাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতি মোকাবিলা করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় তাঁদের প্রয়োজনীয় কলাকৌশলে দক্ষ করে তোলা।
ডেটা জার্নালিজমের মৌলিক ধারণাগুলোকে আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরতে টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম একটি অভিনব লেগো খেলার মাধ্যমে প্রথম পর্বের সূচনা করেন। ঠিক যেমন লেগোর ছোট ছোট ব্লক দিয়ে একটি অর্থবহ কাঠামো তৈরি হয়, তেমনি বিচ্ছিন্ন উপাত্তকে একত্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করা যায়—এই বিষয়টিই তুলে ধরা হয় খেলাটির মাধ্যমে।
দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক জাইমা ইসলাম এর পরে একটি মনোগ্রাহী পর্ব পরিচালনা করেন। এখানে শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকতায় ক্যারিয়ার সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে নিজেদের ভাবনা তুলে ধরেন। প্রত্যেক শিক্ষার্থীই উপাত্ত ব্যবহার করে বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিবেদন লেখার গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেন। এই পর্বটির মূল আকর্ষণ ছিল প্রকাশিত প্রতিবেদনে উপাত্তের প্রায়োগিক ব্যবহার। জাইমা ইসলাম তাঁর বহুল আলোচিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘আপনার ওষুধ কেন কাজ করে না’ (Why your drugs don’t work) শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে তিনি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ফার্মেসিতে অভিযানকালে ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে থাকতেন এবং পুরো এক বছর ধরে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সংগৃহীত তথ্য সাজিয়ে ও বিশ্লেষণ করে তিনি স্বাস্থ্য খাতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ও ডায়াগনস্টিক রিএজেন্টের ব্যাপক ব্যবহারের বিষয়টি উন্মোচন করেন।
এরপর মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের জন্য উন্মুক্ত উপাত্ত (open data) ও তথ্য অধিকার আইনের ব্যবহারের ওপর আরও একটি অধিবেশন পরিচালনা করেন। তিনি দেখান, কীভাবে এই দুটি হাতিয়ার সাংবাদিকদের প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সক্ষম করে তোলে।
এর ধারাবাহিকতায় টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট কোঅর্ডিনেটরবৃন্দ কে এম রফিকুল আলম এবং রিফাত রহমান উপাত্ত বিশ্লেষণ ও ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন নিয়ে হাতে-কলমে দুটি সেশন পরিচালনা করেন। এখানে শিক্ষার্থীরা সরাসরি ডেটাসেট নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান এবং শেখেন কিভাবে অবিন্যস্ত তথ্যকে কীভাবে শক্তিশালী প্রতিবেদন ও ভিজ্যুয়াল স্টোরিতে রূপান্তর করা যায়।
অনুষ্ঠানে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের প্রধান আফতাব হোসেন সাংবাদিকতায় উপাত্তের ব্যবহারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর জোর দেন। তিনি ভুল তথ্যের বিস্তার রোধে প্রকাশের আগে তথ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বলেন, এটি স্বচ্ছতা নিশ্চিতে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। তিনি শিক্ষার্থীদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হিসেবে উপাত্তকে গ্রহণ করতে এবং সত্য ও জবাবদিহির হাতিয়ার হিসেবে একে তুলে ধরতে আহ্বান জানান। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. লিজা শারমিন গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে ডেটা সাংবাদিকতার ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের কর্মশালা থেকে অর্জিত জ্ঞান সাংবাদিকতা জীবনে প্রয়োগ করার জন্য উৎসাহিত করেন।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে সকাল ১০টায় দিনব্যাপী কর্মশালাটি শুরু হয়। সনদপত্র বিতরণী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।