প্রকাশকাল: ০৪ মে ২০২৫
"স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর আমার অফিসে ভাঙচুর হয়েছে। একের পর এক হুমকি এসেছে, আমার পরিবারের বিরুদ্ধে চালানো হয়েছে ঘৃণ্য অপপ্রচার। আমার স্ত্রী, আমার কন্যারা আজ একা বাইরে বেরোতে পর্যন্ত ভয় পায়," বলছিলেন নোয়াখালীর স্থানীয় টিভি সাংবাদিক সাইফুল্লাহ কামরুল। অল্প কথায় তিনি তুলে ধরেছিলেন পেশাগত দায়িত্বের অগ্নিপথে হাঁটতে গিয়ে সাংবাদিকদের নিত্যদিনের রূঢ় বাস্তবতার এক করুণ চিত্র।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে উন্মুক্ত আলোচনার সময় সাইফুল্লাহ কামরুলের মতোই আরও অনেক সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাবিদ এবং অন্যান্য গণমাধ্যমকর্মীরা তাঁদের পেশাগত জীবনের সংকট ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) "সাহসী নতুন বাংলাদেশ: গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় সংস্কারের রূপরেখা" (Brave New Bangladesh: Reform Roadmap for Press Freedom) – শীর্ষক অনুষ্ঠানটি ৪ মে ২০২৪ তারিখ ধানমণ্ডি কার্যালয়ে আয়োজন করে।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার উঠে এসেছে তৃণমূল পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকদের জীবন-সংগ্রামের করুণ চিত্র। একটি স্বনামধন্য পত্রিকার বরিশাল প্রতিনিধি আখতার ফারুক শাহীন যখন মফস্বল সাংবাদিকদের অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন, তখন উপস্থিত অনেকেই তার সুরে সুর মেলান। পেটে দু'বেলা ভাতের নিশ্চয়তা নেই, চাকরির স্থায়িত্বের কোনো বালাই নেই – এমনি অবস্থায় স্থানীয় ক্ষমতাধরদের রক্তচক্ষু আর হুমকির মুখে তাঁদের প্রতিটি দিন কাটে। তিনি বলেন, "কোনো রকম কারণ দর্শানো ছাড়াই, এক রাতের নোটিশে চাকরি চলে যেতে পারে। অথচ স্থানীয় সাংবাদিকদের এই সমস্যাগুলো নিয়ে কেউই কথা বলেন না।”
আশার কথা এই যে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচক ২০২৫-এ বাংলাদেশ ১৬ ধাপ উন্নতি করে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম স্থানে উঠে এসেছে। ভারত, ভুটান ও পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়ে। তবে এই অর্জন নিয়ে আত্মতৃপ্তিতে ভোগার অবকাশ যে নেই তা সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, "উস্কানিমূলক প্রশ্ন" করার দায়ে একজন বেসরকারি টিভি সাংবাদিকের চাকরিচ্যুতির ঘটনা।
আলোচনা জুড়ে বক্তারা আমূল কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেন। তারা বলেন, একটি কার্যকর সাংবাদিক সুরক্ষা আইন, একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন এবং একটি জাতীয় সম্প্রচার কর্তৃপক্ষ গঠন আজ সময়ের দাবি। শুধু তাই নয়, সংবাদকক্ষে নারীদের আরও বেশি অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা এবং সাংবাদিকদের জন্য একটি মজবুত আর্থিক ও আইনি সুরক্ষা বলয় গড়ে তোলার ওপরও তাঁরা জোর দেন।
জবাবদিহিতার মানদণ্ড নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "জনগণের স্বার্থে, ভয়ডরহীন, নিরপেক্ষ সাংবাদিকতাই গণমাধ্যমের মূলমন্ত্র হওয়া উচিত।" সংস্কারের পথে সরকারের এগিয়ে আসার সদিচ্ছাকে তিনি সাধুবাদ জানালেও, আইন প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যে ধরনের গোপনীয়তা এখনও বজায় রাখা হচ্ছে, তার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, "সাহসী নতুন বাংলাদেশে এমন লুকোছাপা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।"
আলোচনার এক পর্যায়ে ড. জামান তুলে ধরেন সেই অস্বস্তিকর সত্য যা নিয়ে সহজে কেউ মুখ খুলতে চায় না। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার গণমাধ্যমের ওপর তীক্ষ্ণ নজরদারি এবং তার স্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করার যে পুরোনো খেলা, তা আজও অব্যাহত। রাষ্ট্রীয় এবং অ-রাষ্ট্রীয় – উভয় শক্তির তরফ থেকেই যে ভীতিপ্রদর্শন ও দমিয়ে রাখার অপচেষ্টা চলে, সে বিষয়ে সকলকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে সম্প্রতি গরু জবাই নিয়ে যে হুমকি দেওয়া হয়েছে, সেই প্রসঙ্গটিও তিনি তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তথ্য উপদেষ্টা মো. মাহফুজ আলম বলেন, জবাবদিহিতার সংস্কৃতি শুধু নীতিনির্ধারকদের জন্য নয়, গণমাধ্যমের জন্য ও সমানভাবে প্রযোজ্য। তিনি বলেন, "আমরা গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে চাই না, এটা ঠিক। তবে কোনো প্রশ্ন তোলার পেছনে প্রকৃতই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সদিচ্ছা আছে, নাকি বিশেষ কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে – সেটাও খতিয়ে দেখা জরুরি।"
উপস্থিত সুধীবৃন্দ বলেন, গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যদি প্রকৃত অর্থেই স্বাধীন ও মুক্ত গণমাধ্যম চায় তবে সাংবাদিকদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে এমন পরিবেশ যেখানে সাংবাদিকরা ভয়হীন, নির্ভীক চিত্তে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
ইউনেস্কো ঢাকা অফিস, ঢাকায় অবস্থিত সুইডেন দূতাবাস এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক কামাল আহমেদ। এছাড়াও ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঞ্চালনায় মূল্যবান বক্তব্য রাখেন ইউনেস্কোর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. সুজান ভাইজ, সুইডিশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস, এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব রেজওয়ানুল হক রাজা, শেখ সাবিহা আলম এবং এ. কে. আজাদ।