বদলে যাওয়া প্রশাসনের চাবিকাঠি নারী ইউএনওদের হাতে

প্রকাশকাল: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫

"আমি যেদিন প্রথম অফিসে আসি, এক বয়স্ক লোক আমার সঙ্গে কথাই বলতে চাইলেন না। তিনি জমি সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে এসেছিলেন। তিনি সটান উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'আসল অফিসার' যখন আসবেন, তখন তিনি আবার আসবেন।" এই কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহী অঞ্চলের একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ। "সেই একই লোক তিন বছর পর এখন তার নাতনিকে আমার অফিসে নিয়ে এসে বলেন, 'দেখো, তুমিও একদিন ম্যাডামের মতো হতে পারবে।'"

এই ছোট্ট ঘটনাই বুঝিয়ে দেয়, বাংলাদেশের স্থানীয় প্রশাসনে একটা নীরব বিপ্লব ঘটে চলেছে। এখানে নারী কর্মকর্তারা শুধু সামাজিক বাধা ভাঙছেন না, তারা সরকারি সেবার পুরো ভিত্তিটাই নতুন করে গড়ে তুলছেন। বাংলাদেশে নারী ইউএনও-দের নানাবিধ কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। তাদের সরকারি কাজের তালিকার বাইরেও থাকে আরও অনেক জটিলতা। তবুও তারা অধ্যবসায়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে দিচ্ছেন, শাসনমান উন্নত করছেন এবং সমঅধিকার ভিত্তিক সমাজ গড়ার পথ তৈরি করছেন।

বাংলাদেশের আটটি বিভাগের একুশজন নারী ইউএনও সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আয়োজিত কর্মশালায় যোগ দিয়েছিলেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখ অনুষ্ঠিত "টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা, সুশাসন ও নারী" শীর্ষক কর্মশালাটি আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত হয়। সপ্তমবারের মত অনুষ্ঠিত কর্মশালাটির মাধ্যমে ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১৩০ জন ইউএনও-কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

"আমাদের প্রতিনিয়ত নিজেদের প্রমাণ করতে হয়। আমি যখন কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিই, লোকে বলে এটা নাকি আবেগপ্রবণ চিন্তা। আর আমার পুরুষ সহকর্মী যখন একই সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেটাকে বলা হয় নেতৃত্ব দেয়া।,” বলছিলেন খুলনা বিভাগের ইউএনও রনি খাতুন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই নারী নেত্রীদের মধ্যে বাধা সত্ত্বেও অপরিমেয় সম্ভাবনা দেখতে পান। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, "দুর্নীতি সুশাসনের পথে বাধা। আবার সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে দুর্নীতি কমে। গবেষণায় বারবার দেখা গেছে, নারীরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে বেশি সোচ্চার হন। তাই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৬ – অর্থাৎ শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার জন্য প্রশাসনে তাদের উপস্থিতি খুবই জরুরি।”

টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম ক্রমবর্ধমান অপতথ্য মোকাবেলার চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করেন। গণমাধ্যম সম্পর্কে জ্ঞান আর কার্যকর যোগাযোগের কৌশলের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, "ডিজিটাল যুগ নৈতিকতার চর্চার বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করেছে।"

এসডিজি, লিঙ্গবৈষম্য ও সুশাসন বিষয়ক প্রশিক্ষণ

কর্মশালায় অংশ হিসেবে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আলোচনার সময় উপস্থিত ইউএনওরা প্রাতিষ্ঠানিক এবং সাংস্কৃতিক – দুই ধরনের বাধাই কীভাবে সামাল দেওয়া যায়, সেই কৌশল সম্পর্কে মতবিনিময় করেন।

লিঙ্গসমতা এবং প্রশাসনে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কর্মশালার প্রথম অধিবেশনটি পরিচালনা করেন মানবাধিকার কর্মী উম্মে হাবিবুন নেসা। অংশগ্রহণকারীদের তিনি বলেন, "আপনারা এখানে যা করছেন – একে অপরকে সমর্থন করছেন, নিজেদের জ্ঞান ভাগ করে নিচ্ছেন – এভাবেই স্থায়ী পরিবর্তন আসবে। আপনারা প্রত্যেকেই কিন্তু নিজ নিজ এলাকায় প্রভাবশালী ‘চেঞ্জমেকার’।"

কেরানীগঞ্জের ইউএনও রিনাত ফৌজিয়াও একই সুরে কথা বলেন। কর্মশালার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার এবং সুশাসন ও নারীর ক্ষমতায়নের মধ্যেকার গভীর সম্পর্ক বুঝবার সুযোগ পেয়ে তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। "কাল যখন আমি আমার উপজেলায় ফিরে যাব, তখন নতুন কৌশল শিখে যাব। আর এই ভরসায় বলীয়ান হয়ে যাব যে, এই লড়াইয়ে আমি একা নই।"

নারী নেতৃত্ব ও নৈতিক সুশাসনের মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে দ্বিতীয় অধিবেশনে আরও বিস্তারিত আলোচনা করেন টিআইবির নির্বাহী ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ড. সুমাইয়া খায়ের। তিনি বলেন, "নারী কর্মকর্তারা সাধারণত অধিক নৈতিক মূল্যবোধের পরিচয় দেন। আর উঁচু মহলের দুর্নীতিবাজ চক্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগও কম থাকে। একারণেই প্রশাসনে থাকা নারীরা দুর্নীতিতে কম জড়ান।” কিন্তু এই নৈতিক অবস্থানের কারণে প্রশাসনে নারী কর্মকর্তাদের অন্যরকম চ্যালেঞ্জের মুখেও পড়তে হয় বলে তিনি জানান। “অনেক নারী ইউএনও জানিয়েছেন, তারা যখন স্বচ্ছতা আনার চেষ্টা করেছেন, তখন তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়েছে, অপপ্রচার চালানো হয়েছে।”

ড. খায়ের প্রশাসনে নারীদের আরও কিছু পদ্ধতিগত চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন যার মধ্যে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য আর সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। তিনি বলেন, "প্রশাসনের এই কৃত্রিম বাধা, এই ‘গ্লাস সিলিং’ লিঙ্গবৈষম্যকে জিইয়ে রাখে। এতে নারী কর্মকর্তা এবং তারা যাদের সেবা দেন, সেই সাধারণ মানুষ – দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।" এই বাধা দূর করতে তিনি নারী ইউএনও-দের এই গতানুগতিক ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ করতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বের পক্ষে কথা বলতে এবং লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।

পরিবর্তনের ঢেউ

নারী ইউএনও-দের প্রভাব শুধু প্রশাসনিক দক্ষতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরগুনার ইউএনও উম্মে সালমা বলেন, "একবার এক মা তার কিশোরী মেয়েকে আমার সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, একটা জনসভায় আমাকে সভাপতিত্ব করতে দেখার পর থেকে তার মেয়ে নাকি জনপ্রশাসন নিয়ে পড়ার কথা বলছে। এই ঘটনাগুলোই আমাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়, কেন এই কাজটা এত গুরুত্বপূর্ণ কারণ প্রকৃতপক্ষে আমরা পরবর্তী প্রজন্মের ভাবনার জগতটাকেই বদলে দিচ্ছি।"

ড. ইফতেখারুজ্জামান এই ব্যক্তিগত আখ্যানগুলোকে একটা বৃহত্তর জাতীয় পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখেন। সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, "সরকারি কর্মকর্তা এবং টিআইবির মতো সংস্থাগুলোর লক্ষ্য একই – দেশের সেবা করা। নারী ইউএনও-রা যে চ্যালেঞ্জগুলোর কথা তুলে ধরেছেন, সেগুলো সমাধানের জন্য আমরা আমাদের এডভোকেসি চালিয়ে যাব। পাশাপাশি স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কাজ করে যাব।"

কর্মশালা শেষে এই একুশজন নারী নিজ নিজ উপজেলায় ফিরে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন তখন তাদের মধ্যে স্পষ্ট নতুন উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছিল। তারা শুধু নতুন দক্ষতাই সঙ্গে নিয়ে ফিরছিলেন না বরং আরও শক্তিশালী হাতিয়ার – এই বিশ্বাস যে, তাদের সংগ্রাম আর সাফল্য একটা সম্মিলিত যাত্রার অংশ। যে যাত্রার লক্ষ্য ন্যায়পরায়ণ আর সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

এই সুরে বিদায় নেওয়ার সময় একজন ইউএনও বলেন, "আমরা শুধু জেলা চালাচ্ছি না; আমরা ইতিহাস নতুন করে লিখছি – আমাদের একটি করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বদলে যাবে সমাজ এবং মানুষের চিন্তাধারা।"


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি