প্রকাশকাল: ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪
স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং জনস্বার্থে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনকে উৎসাহিত করতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ৫ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে দেশের প্রথম অনুসন্ধানী সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে। একই আয়োজনে ঘোষণা করা হয় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার ২০২৪। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহ রক্ষায় টিআইবির প্রতিশ্রুতি আরও একবার স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
এ বছরের সম্মেলনটি ছিল টিআইবির অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কারের ২৫ বছর পূর্তির অংশ। ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই পুরস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত মোট ১,৪৪০টি প্রতিবেদন জমা পড়েছে এবং পুরস্কার পেয়েছে ৯০টি প্রতিবেদন। এই তালিকায় আছেন ৮৮ জন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, ১৩জন ডকুমেন্টারি নির্মাতা, ৭ জন নারী সাংবাদিক এবং ১৭ জন ক্যামেরাপারসন। এসব প্রতিবেদন দেশের নানা খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে ধরে গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের প্রিন্ট, অনলাইন ও টেলিভিশন সাংবাদিক, গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং গবেষকরা। বিভিন্ন অধিবেশনে তাঁরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার, সংবাদমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের চাপ, আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্ম-সেন্সরশিপ, সংবাদবস্তুর মানের অবনতি, ভুয়া তথ্য এবং বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট মোকাবিলা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির চ্যালেঞ্জ এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও নৈতিক সাংবাদিকতার পরিবেশ তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
IJ Award Categories and Topics
২০২৪ সালের পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও প্রতিবেদন এবার চারটি বিভাগে পুরস্কার প্রদান করা হয়েছেঃ জাতীয় প্রিন্ট/অনলাইন মিডিয়া, স্থানীয় প্রিন্ট/অনলাইন মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং টিভি ডকুমেন্টারি। এবছর মোট ৫৯টি প্রতিবেদন জমা পড়ে, যার মধ্য থেকে প্রতি বিভাগে একটি করে প্রতিবেদনকে বিজয়ী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
স্থানীয় প্রিন্ট/অনলাইন মিডিয়া বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন দৈনিক একুশে পত্রিকার প্রধান প্রতিবেদক শরিফুল ইসলাম (শরিফুল রুকন)। তাঁর তিন পর্বের অনুসন্ধানঃ ‘চিকিৎসকদের চেক-বাসা-গাড়ি দিয়ে কিনছে কোম্পানি’, ‘ঘুষের বোঝা বইছেন রোগীরা’, এবং ‘কমিশন বাণিজ্যে দ্বিগুণ হচ্ছে রোগ নির্ণয়ের খরচ’, চিকিৎসকদের এক শ্রেণির অনৈতিক আচরণ এবং ওষুধ কোম্পানির মুনাফাভিত্তিক কৌশলের ফলে রোগীদের উপর বাড়তি চাপ কীভাবে তৈরি হয়, তা বিশ্লেষণ করে।
জাতীয় প্রিন্ট/অনলাইন মিডিয়া বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন দ্য ডেইলি স্টারের সিনিয়র রিপোর্টার জায়মা ইসলাম। তাঁর প্রতিবেদন ‘এস আলমের জাদুর চেরাগ’ দেশের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ এর গোপন আর্থিক লেনদেন ও বিদেশে সম্পদ গড়ার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। সিঙ্গাপুরে তাদের শত কোটি টাকার সম্পদ এবং আর্থিক অনিয়ম উন্মোচনের মাধ্যমে এই প্রতিবেদন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে ওঠে।
ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিভাগে পুরস্কার পেয়েছেন আল-আমিন হক অহন। তাঁর প্রতিবেদন ‘অসহায় নারীদের প্রকল্পে সুবিধা পাচ্ছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা’ একটি সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি ও সুবিধাভোগীদের অনিয়ম নিয়ে তৈরি। প্রতিবেদনটি দেখিয়েছে কীভাবে প্রকল্পের উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে সুবিধা চলে যাচ্ছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের হাতে, এবং এর ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
টিভি ডকুমেন্টারি বিভাগে বিজয়ী হয়েছে ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান ‘তালাশ’। তাঁদের ডকুমেন্টারি ‘গরিবের চাল-গম লুটে নেয় ডিলার-প্রশাসন’ এ সরকারি খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির দুর্বলতা ও দুর্নীতির চিত্র ফুটে উঠেছে। পুরস্কার গ্রহণ করেন 'তালাশ' দলের সদস্য মো. সবুজ মাহমুদ, গোলাম কিবরিয়া, মো. আব্দুল্লাহ আল রাফি, মো. ইয়াসিন নূর এবং মো. হাসান মাহমুদ।
টিআইবি বিশ্বাস করে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা শুধু তথ্য প্রকাশের মাধ্যম নয়, এটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলার এবং জবাবদিহিমূলক সমাজ গঠনের অন্যতম হাতিয়ার। এই পুরস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে সাংবাদিকদের কাজকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তাদের অনুপ্রাণিত করাই টিআইবির উদ্দেশ্য। আগামীতেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিকাশে এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে টিআইবি দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ।