প্রকাশকাল: ০৪ ডিসেম্বর ২০২৪
গত ১৫ বছরে বাংলাদেশের জনগণ প্রায় ১ লক্ষ ৪৬ হাজার ২৫২ কোটি টাকা ঘুষ দিয়েছে। তারা ১৮টি বিভিন্ন খাত ও প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা পেতে এই টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে দেয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর জাতীয় খানা জরিপ ২০২৩ গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। ৩ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখ টিআইবি ঢাকা কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
গবেষণা জরিপে আরও দেখা যায়, ৭০.৯% পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছে। তারা ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিলের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা নিতে গিয়ে এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়। ২০২৩ সালে সব খাত মিলিয়ে প্রায় ১০,৯০২ কোটি টাকা ঘুষ হিসেবে লেনদেন হয় যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১.৪৩% এবং জিডিপির ০.২২%। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় বাংলাদেশের সেবামূলক খাতে দুর্নীতি কি ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
টিআইবির দীর্ঘদিনের দুর্নীতি জরিপ
১৯৯৭ সাল থেকে টিআইবি প্রতি দুই বছর পর এই জরিপ করে। এবছর দশম খানা জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিলের মধ্যে পরিবারগুলো বিভিন্ন খাত থেকে সেবা নিতে গিয়ে কেমন হয়রানি ও দুর্নীতির শিকার হয়েছে, তার তথ্য এই জরিপে সংগ্রহ করা হয়। জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয় ২০২৪ সালের ১৩ই মে থেকে ৩রা আগস্ট পর্যন্ত।
সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত পাসপোর্ট
পাসপোর্ট সেবা সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত (৮৬%) খাত বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এর পরেই আছে বিআরটিএ (৮৫.২%)। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (৭৪.৫%), বিচারিক সেবা (৬২.৩%)। ভূমি সেবা (৫১%), সরকারি স্বাস্থ্যসেবা (৪৯.১%) এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানও (৪৪.২%) শীর্ষ তালিকায় আছে। সব মিলিয়ে, ৫০.৮% পরিবার সেবা পেতে ঘুষ দিয়েছে অথবা নিয়মবহির্ভূত টাকা দিতে বাধ্য হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ঘুষ দেওয়ার ঘটনা পাসপোর্ট সেবায় (৭৪.৮%)। বিআরটিএ-তে (৭১.৯%) এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় (৫৮.৩%) ঘুষ দেওয়ার হারও বেশি। বিচারিক সেবায় (৩৪.১%), ভূমি সেবায় (৩২.৩%) এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানেও (২৯.৭%) সেবা পেতে মানুষ ঘুষ দেয়।
দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া
খানা জরিপে অধিকাংশ উত্তরদাতার মতে, দুর্নীতির প্রধান কারণ দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় পাওয়া। সামাজিক সচেতনতার অভাব এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি বড় কারণ। এছাড়া, ৭৭.২% ঘুষ দেওয়া পরিবার বলেছে, তাদের অন্য কোনো উপায় ছিল না। কারণ "ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না।" এই ফলাফলগুলো দুর্নীতির এক ভয়াবহ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তুলে ধরেছে যা নিরসনে আশু পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হচ্ছে যা আশংকাজনক। এই প্রবণতা চলতে থাকা বিচারহীনতার মাধ্যমে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রতিষ্ঠার প্রয়াসকে নির্দেশ করে। এই পরিস্থিতি আমাদের জন্য খুবই উদ্বেগের।” ড. জামান আরও বলেন, “খানা জরিপের ফল অনুযায়ী, জনগণের সবচেয়ে বড় দাবি হলো দুর্নীতিতে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা। বর্তমান পরিস্থিতি তা নিশ্চিত করার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি শক্তিশালী উদাহরণ তৈরি করতে পারে। এটি ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হবে এবং দুর্নীতি দমনে তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করবে।”
সরাসরি সেবা পেতে দুর্নীতি হয় বেশি
গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনলাইন বা মিশ্র পদ্ধতির তুলনায় সরাসরি সেবা নেওয়ার সময় দুর্নীতি বেশি হয়। এই জরিপ ডিজিটাল সেবার ত্রুটিগুলো তুলে ধরে। অনেক খাতে ডিজিটাল সেবা চালু হলেও এর মাধ্যমে দুর্নীতির সুযোগ থেকে যায়।
ড. জামান আরও বলেন, “আমরা দেখেছি, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের ঘোষণা কেবল কথার কথা। দুর্নীতির বিস্তার দেখায় এমন জরিপ প্রায়শই উপেক্ষা করা হয়।” দুর্নীতি প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের পরিধি অনেক কমে গেছে উল্লেখ করে ড. জামান বলেন, সাধারণ মানুষ দুর্নীতি সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে কারণ তারা তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
গরিবের ওপর বোঝা
জরিপে আরও দেখা যায়, নিম্ন আয়ের পরিবার ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দুর্নীতির শিকার বেশি হয়। স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো ঘুষ ও অবৈধভাবে টাকা দিতে গিয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া, দুর্নীতির প্রভাবে নারী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিদ্যমান সমস্যাগুলো বৃদ্ধি পায়। তাদের আর্থ-সামাজিক সমস্যা বাড়ায় এবং কোণঠাসা করে ফেলে। স্থানীয় সরকার এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতি নারীদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। এটি তাদের অংশগ্রহণ কমায় এবং অগ্রগতিতে বাধা দেয়।
সুপারিশ
জরিপে দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে এতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানানো হয়। সেবার সম্পূর্ণ ডিজিটাল করার কথা বলা হয়েছে এবং প্রয়োজনানুসারে ‘ওয়ান-স্টপ’ সেবা চালুর আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে সেবাদাতা ও গ্রহীতার সরাসরি যোগাযোগ কমবে এবং দুর্নীতি হ্রাস পাবে। টিআইবি আরও বলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিক আচরণবিধি গ্রহণ করা উচিত যেখানে সেবা প্রদানের নিয়ম, সময়সীমা এবং আচরণের মান উল্লেখ থাকবে। কাজের মূল্যায়নের জন্য সেবাগ্রহীতার মতামত নেওয়ার ব্যবস্থাও রাখতে হবে। কর্মীদের পদোন্নতি ও পদায়ন মেধার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যেন কোনো সুবিধা না পায়। এছাড়া, কর্মী, অবকাঠামো এবং সরঞ্জামের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। কর্মীদের জন্য দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে।
বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন এখানে।