প্রকাশকাল: ২৩ নভেম্বর ২০২৪
বর্তমান বিশ্বে, যেখানে দুর্নীতি নানা ধরনের প্রযুক্তিগত জটিলতার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে, শুধু প্রচলিত অনুসন্ধান কৌশল দিয়ে অপরাধী চিহ্নিত করা অনেক সময়েই যথেষ্ট নয়। এ প্রেক্ষাপটে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যৌথভাবে আয়োজন করে একটি তিন দিনব্যাপী আধুনিক প্রশিক্ষণ কর্মশালা। এতে প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার নতুন পথ দেখানো হয়।
১৯ থেকে ২১ নভেম্বর ২০২৪ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ প্রশিক্ষণে অংশ নেন দুদকের ৩০ জন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। প্রশিক্ষণটি মূলত আধুনিক ডিজিটাল অনুসন্ধান কৌশল, উদীয়মান আর্থিক প্রযুক্তির বৈশিষ্ট্য, ডিজিটাল প্রমাণের আইনি কাঠামো এবং সম্পদ শনাক্তে ব্যবহারযোগ্য ব্যবহারিক কৌশলগুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হয়।
ডিজিটাল পরিসর: মৌলিক ধারণা ও প্রেক্ষাপট
প্রশিক্ষণে দেশের খ্যাতনামা একাডেমিক বিশেষজ্ঞরা তাঁদের জ্ঞানের পরিসর থেকে অংশগ্রহণকারীদের সামনে তুলে ধরেন সমসাময়িক নানা দিক। ইউনিভার্সিটি অব মালয়ার ড. মোহাম্মদ এরশাদুল করিম "ডিজিটাল স্পেস: মৌলিক ধারণা ও প্রেক্ষাপট" বিষয়ে বক্তব্য দেন, যেখানে তিনি তুলে ধরেন কীভাবে ডিজিটাল পরিসর দুর্নীতিবিরোধী প্রচেষ্টার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
ডিজিটাল ফরেনসিকস
প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধানের বাস্তবতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপান তাঁর অধিবেশনে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন ডিজিটাল ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের পদ্ধতি। তিনি বলেন, দুর্নীতি ও অর্থপাচারের মতো জটিল আর্থিক অপরাধের তদন্তে এসব প্রমাণ অপরিহার্য। তিনি জোর দেন গবেষণালব্ধ পদ্ধতি, নির্ভুল প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং আইনি জ্ঞানের সম্মিলিত ব্যবহারের ওপর।
আধুনিক প্রযুক্তি ও আর্থিক অপরাধ
এক নতুন বাস্তবতা প্রশিক্ষণের দ্বিতীয় দিনে অংশগ্রহণকারীরা ডিজিটাল আর্থিক অপরাধের জটিলতা সম্পর্কে আরও গভীরভাবে অবগত হন। ড. এরশাদুল করিম তাঁর তিনটি অধিবেশনে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেন ব্লকচেইন প্রযুক্তি ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো বিষয়, যেগুলো প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তিনি বলেন, ডিজিটাল লেনদেনের ছদ্মবেশী চরিত্র বিবেচনায় রেখে আমাদের প্রয়োজন একটি অভিযোজনযোগ্য আইনি কাঠামো, যা একই সঙ্গে উদ্ভাবনী প্রযুক্তিকে উৎসাহ দেবে এবং আর্থিক অপরাধ দমনে কার্যকর হবে।
তিনি তাঁর শেষ অধিবেশনে ভারসাম্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কথা বলেন, যেখানে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও নজরদারিমূলক কার্যক্রমের সমন্বয় থাকবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও আন্তঃবিভাগীয় কৌশল গ্রহণের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন, বিশেষ করে ভার্চুয়াল সম্পদ ব্যবস্থাপনায় উদীয়মান অর্থপাচার ঝুঁকি মোকাবেলায়।
ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং: সংখ্যার পেছনের গল্প
শেষ দিনের দুটি অধিবেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আল-আমিন বাস্তবভিত্তিক ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং উপস্থাপন করেন। তিনি অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি বিশ্লেষণধর্মী সরঞ্জামভাণ্ডার তুলে ধরেন, যার মাধ্যমে জটিল আর্থিক অপরাধ সনাক্ত ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব। বিভিন্ন বাস্তব কেস স্টাডির মাধ্যমে তিনি দেখান, শুধু হিসাব মিলানোই যথেষ্ট নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো সংখ্যাগুলোর পেছনের গল্প বোঝা। তিনি বলেন, “আর্থিক প্রতারণার সূক্ষ্ম প্যাটার্ন বুঝতে পারা জরুরি। এটা শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, বরং সংখ্যার পেছনে যে ঘটনা রয়েছে, সেটাই অনুসন্ধানে সহায়তা করে।”
অনুসন্ধানে ওপেন ডেটার বাস্তব প্রয়োগ
প্রশিক্ষণের শেষ দিন টিআইবির আউটরিচ ও কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম একটি অংশগ্রহণভিত্তিক অধিবেশন পরিচালনা করেন। তিনি অংশগ্রহণকারীদের সামনে ওপেন ডেটা ব্যবহার করে সম্পদ শনাক্ত করার আধুনিক কৌশল তুলে ধরেন এবং হাতে-কলমে দেখান কীভাবে এই পদ্ধতি অনুসন্ধানে তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।
প্রশিক্ষণশেষ প্রতিক্রিয়া এবং ভবিষৎ প্রত্যাশা
প্রশিক্ষণশেষে অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্ব ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দুদকের কর্মকর্তা সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, “এই ধরনের প্রশিক্ষণ শুধু দক্ষতা বাড়ায় না, বরং স্বচ্ছ সমাজ গঠনের পথ তৈরি করে।” দুদকের আরেক কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “এই জ্ঞান আমাদের অনুসন্ধান ও আইনি প্রক্রিয়ার দক্ষতা আরও বাড়াবে।” অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তা সিলভিয়া ফেরদৌস মনে করেন, এমন প্রশিক্ষণ চলমান থাকা উচিত, কারণ ডিজিটাল বিশ্বে দুর্নীতির ধরন বদলে যাচ্ছে এবং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদেরও প্রস্তুত থাকতে হবে।
টিআইবির উপদেষ্টা ড. সুমাইয়া খায়ের অংশগ্রহণকারীদের অভিনন্দন জানান এবং তাঁদের নতুন শেখা দক্ষতাগুলো বাস্তবে প্রয়োগ করার আহ্বান জানান। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে, দুর্নীতিবিহীন এমন এক স্বচ্ছ পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে আমাদের প্রয়োজনই থাকবে না।”
এই প্রশিক্ষণের সমাপনী সনদ প্রদান অনুষ্ঠান ও সমাপনী হয় অংশগ্রহণকারীদের পক্ষ থেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার লক্ষ্যে নতুন অর্জিত দক্ষতাকে কাজে লাগানোর এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারের মাধ্যমে।