প্রকাশকাল: ১২ নভেম্বর ২০২৪
একটি দেশ যখন কর্তৃত্ববাদী শাসনের ছায়া থেকে বের হয়ে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে, নতুন বাংলাদেশের তরুণরা কোন পথে এগোবে। গণতন্ত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করতে স্বাধীনতার দ্বিতীয় ঢেউয়ের পর আমাদের করণীয় কী। বন্ধুসভার ২৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক প্রাণবন্ত আয়োজনে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় এক নতুন আশাবাদের আবহ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এবং বন্ধুসভার এই যৌথ আয়োজনটি তুলে ধরে তরুণ প্রজন্মের সেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, যা ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে গড়বে স্বচ্ছতা, সততা ও দুর্নীতিমুক্ত চেতনার ভিত্তিতে।
রাজধানীর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে দেশব্যাপী থেকে আসা বন্ধুসভার সদস্যরা জড়ো হন এই আয়োজনে অংশ নিতে। তাদের মুখে ছিল উৎসাহ, চোখে ছিল স্বপ্ন। সকলেই এক হয়ে টিআইবির দুর্নীতিবিরোধী বার্তার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করতে চেয়েছেন, জানতে চেয়েছেন কীভাবে তারা দেশের জন্য একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারেন। দেশের খ্যাতনামা দৈনিক প্রথম আলোর একটি অন্যতম উদ্যোগ হিসেবে বন্ধুসভা স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে সাম্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং আত্মউন্নয়নের চর্চা করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। ফলে তরুণদের মাঝে দুর্নীতিবিরোধী চেতনা জাগ্রত করতে এই আয়োজন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা উপস্থিত সবার মাঝে একতা ও দায়িত্ববোধের অনুভব জাগিয়ে তোলে। এরপর টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান তরুণদের দুর্নীতিবিরোধী শপথ পাঠ করান এবং বলেন, আমাদের ভবিষ্যৎ গড়তে হলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। তাঁর বক্তব্য তরুণদের মধ্যে স্বচ্ছতা ও সততার প্রতি দায়বদ্ধতা আরও দৃঢ় করে তোলে। তিনি আরও বলেন, দেশের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে ঠিকই, তবে বৈষম্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এখনো শেষ হয়নি। আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে একটি নিপীড়নমূলক শাসনব্যবস্থার জায়গায় আরেকটি দমনমূলক পন্থা যেন প্রতিষ্ঠিত না হয়, সে বিষয়ে আমাদের সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। দুর্নীতি ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন যেন আমাদের জীবন ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে থাকে, এই আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল "তারুণ্যের নতুন আলোয় জেগে উঠুক বাংলাদেশ"। এই আহ্বান অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের মনে গভীর দাগ কাটে এবং সকল বক্তার বক্তব্যে বারবার উঠে আসে তরুণদের দায়িত্ব ও সম্ভাবনার কথা। প্রখ্যাত নির্মাতা আশফাক নিপুন তাঁর বক্তব্যে তুলে ধরেন সমাজে দুর্নীতি কীভাবে সুক্ষ্মভাবে গেঁথে আছে এবং কীভাবে আমরা অনেক সময় তা চিনতে পারি না। তিনি বলেন, দুর্নীতি অনেক সময় আমাদের চিন্তাভাবনার মধ্যেও ঢুকে পড়ে। নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের নিজস্ব চিন্তা ও অবস্থানকেও হতে হবে দুর্নীতিমুক্ত। তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি তরুণদের আহ্বান জানান নিজেকে বদলে সমাজ বদলাতে।
জনপ্রিয় লেখক আনিসুল হক তাঁর বক্তব্যে বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এখনো অনেক দূর এগোনো বাকি। তিনি বলেন, যদি আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায়ে থাকা দুর্নীতিকে নির্মূল করতে পারি, তবে বৈষম্যহীন একটি সমাজ গড়া সম্ভব হবে। তিনি একটি সুশাসনভিত্তিক ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গঠনের আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে একটি ইন্টারঅ্যাকটিভ সেশন অনুষ্ঠিত হয় যার শিরোনাম ছিল রাষ্ট্র সংস্কার ও দুর্নীতি। এখানে অংশগ্রহণকারীদের সরাসরি যুক্ত করার মাধ্যমে আলোচনা আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এই পর্বে টিআইবির পরিচালনা ও যোগাযোগ বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, তরুণরা যদি আজই দুর্নীতিকে না বলে, তবে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া অনেক সহজ হবে। তিনি বলেন, সমাজে দুর্নীতি এত গভীরভাবে প্রোথিত যে তা উপড়ে ফেলতে হলে আমাদের অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষ করে যখন ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা দুর্নীতিকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তখন তা মোকাবিলা করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন একাধিক সমাজতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সংগঠক, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আরিফুল ইসলাম অদীব এবং তাপসী দে প্রাপ্তি। তাঁদের আলোচনা তরুণদের মাঝে সৃষ্টি করে এক ঐক্যবদ্ধতার অনুভব, একটি ন্যায়ভিত্তিক ও স্বচ্ছ ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখার সংকল্প।
অনুষ্ঠান শেষে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে এই তরুণেরা কেবল স্বপ্ন দেখেন না, বরং তারা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজেদের তৈরি রাখছেন। তারা বিশ্বাস করে, সততা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে নতুন বাংলাদেশ। তাদের হাতেই আছে ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ, এবং এই নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের পথে তারাই হবেন পথপ্রদর্শক।