প্রকাশকাল: ১১ অক্টোবর ২০২৪
দুর্নীতি একটি সর্বব্যাপী সমস্যা যা স্বচ্ছ সরকার ব্যবস্থা বিনষ্ট করে এবং উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে লড়াই করার জন্য, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জ্ঞানকে হাতিয়ার করে সরকারি কর্মকর্তাদের হাতে তুলে দেয়া অপরিহার্য। এই লক্ষ্য নিয়ে সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সঙ্গে যৌথভাবে একটি প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। মানিকগঞ্জের কইট্টায় প্রশিকা মানবসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন দিনের এই কর্মশালাটি অনুষ্ঠিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দুদকের কর্মকর্তাদের দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এই প্রশিক্ষণটি সরকারি সংস্থাটির ১৫ জন কর্মকর্তার জন্য একটি ফলো-আপ সেশন ছিল। এখানে উন্নত গবেষণা প্রক্রিয়ার তত্ত্ব এবং প্রয়োগ উভয় দিকেই মনোযোগ দেওয়া হয়।
দুর্নীতি দমনে গবেষণার গুরুত্ব
দুর্নীতি চিহ্নিত করা, এর মূল কারণ বোঝা এবং তা মোকাবিলার কার্যকর কৌশল তৈরিতে গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সরকারি কর্মকর্তাদের উন্নত গবেষণা দক্ষতা সম্পর্কে সম্যক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমরা তাদের আরও শক্তিশালী করতে পারি। এর ফলে তারা দুর্নীতি চিহ্নিত করতে, দুর্নীতির গোপন ধরন উন্মোচন করতে এবং দুর্নীতির চর্চা প্রকাশ করতে সক্ষম হবেন।
প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনকালে টিআইবির রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, গবেষণা প্রক্রিয়া সম্পর্কে পুঙ্খানুপুঙ্খ ধারণা লাভের মাধ্যমে দুদকের কর্মকর্তারা প্রশাসনিক পর্যায়ে অধিকতর জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তাদের শিক্ষাকে কাজে লাগাতে পারবেন।’
কর্মশালার প্রথম দিনে গবেষণার বিভিন্ন দিকের ওপর বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ছিল তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি, তথ্য কোডিং এবং ট্রান্সক্রিপশন, তথ্য বিশ্লেষণ, বিভিন্ন সূত্রের তথ্যের সমন্বয় ও যাচাই এবং প্রতিবেদন তৈরি। টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শাহজাদা আকরাম ও মো. মাহফুজুল হক এবং রিসার্চ ফেলো অতনু দাস প্রশিক্ষণ অধিবেশনগুলো পরিচালনা করেন।
দ্বিতীয় দিনে, ১৫ জন দুদক কর্মকর্তা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে তাদের শেখা জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগ করেন। তারা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, ভূমি অফিস এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের মতো বিভিন্ন সরকারি অফিসে সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে কর্মশালার শেষ দিনে অংশগ্রহণকারী দুদক কর্মকর্তারা সরকারি সেবা খাতের বিদ্যমান অসংগতি ও অনিয়ম বিশ্লেষণ করেন। তারা তাদের শেখা জ্ঞানের আলোকে প্রাপ্ত ফলাফল উপস্থাপন করেন। অংশগ্রহণকারীরা একে অপরের কাজের ওপর প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্বেও অংশ নেন। পরিশেষে, প্রতিটি দল ঐসব সরকারি সংস্থার সেবার মান উন্নয়নের জন্য একাধিক সুপারিশ পেশ করে।
প্রশিক্ষণ কর্মশালাটি থেকে দুদকের কর্মকর্তারা উন্নত গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে মূল্যবান অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেন যার মধ্যে অন্যতম দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গবেষণার তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব; দুর্নীতি মোকাবিলায় সরকারি সংস্থা এবং সুশীল সমাজ সংগঠনগুলোর মধ্যে সহযোগিতার গুরুত্ব এবং পাশাপাশি গবেষণার ক্ষেত্রে ক্রমাগত শেখা ও লব্ধ জ্ঞান উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা।
টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দুদক কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি দুদককে একটি প্রভাবশালী সরকারি সংস্থায় পরিণত করতে সাহায্য করবে যা সঠিকভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে পারবে। আমরা আশাবাদী যে এই কর্মশালার ফলস্বরূপ দুদক গবেষণার মাধ্যমে দুর্নীতি মোকাবিলা ও প্রতিরোধের নতুন উপায় উন্মোচন করবে।’
এর আগে, টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন পরিচালক দুর্নীতি গবেষণার জন্য উন্মুক্ত ডেটা উৎস ব্যবহারের তাৎপর্য এবং ডেটা কালেকশন ও ক্লিনিং এর জন্য বিভিন্ন অনলাইন রিপজিটরি ও টুলস ব্যবহারের ওপর একটি বিশেষ সেশন পরিচালনা করেন।
উপসংহার
উন্নত গবেষণা পদ্ধতির ওপর এই প্রশিক্ষণ কর্মশালা দুদক কর্মকর্তাদের আরও কার্যকরভাবে দুর্নীতি মোকাবিলায় শক্তিশালী করার একটি মূল্যবান পদক্ষেপ ছিল। কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় টুলস ও জ্ঞান দিয়ে সজ্জিত করার মাধ্যমে সরকারি সংস্থাগুলো দুর্নীতি চিহ্নিত করতে এবং তার সমাধান করতে সক্ষম হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত থাকায়, সরকারি কর্মকর্তাদের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা রয়েছে তা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ করা অপরিহার্য।
অংশগ্রহণকারীরা গবেষণা ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে টিআইবির প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন। দুদক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে উপ-পরিচালক শারিকা ইসলাম কর্মশালার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ডিজাইনের জন্য টিআইবিকে ধন্যবাদ জানান এবং প্রশিক্ষকদের দক্ষতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘উন্নত গবেষণা পদ্ধতির ওপর আমাদের অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে, আমরা এখন থেকে কর্মশালার ফলস্বরূপ দুর্নীতি বিষয়ক গবেষণার সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করতে পারব।’ তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, দুদকের সদ্য খোলা গবেষণা শাখা কর্মশালা থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাকে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগের মাধ্যমে আরও কার্যকরভাবে কাজ করবে।
অংশগ্রহণকারী দুদক কর্মকর্তাদের মধ্যে সনদ বিতরণের মাধ্যমে তিন দিনের কর্মশালাটি শেষ হয়।