ক্রীড়া সাংবাদিকতায় নৈতিকতা চর্চা: সাংবাদিকদের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা

প্রকাশকাল: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪

খেলার মাঠের উত্তেজনা আর রোমাঞ্চ সবাইকে মুগ্ধ করে। কিন্তু এই খেলার জগতেও যখন বাসা বাঁধে অনিয়ম আর দুর্নীতির কালো মেঘ, তখন ভক্তদের মন ভেঙে যায়। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধেই কলম ধরেন ক্রীড়া সাংবাদিকরা। তাঁদের ক্ষুরধার লেখাই পারে খেলার মাঠকে কলুষমুক্ত রাখতে। আর এই অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সঠিকভাবে করার জন্য প্রয়োজন যথাযথ প্রশিক্ষণ আর স্বচ্ছ নৈতিকতার জ্ঞান।

এই মহৎ লক্ষ্য নিয়েই সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজন করেছিল এক বিশেষ কর্মশালার। দেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছিলেন ক্রীড়া সাংবাদিকরা। বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত কর্মশালাটির নামও ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী – “আনকভারিং ইন্টিগ্রিটি: বিএসপিএ সদস্যদের জন্য ক্রীড়া সাংবাদিকতা কর্মশালা”। কর্মশালা উপলক্ষে টিআইবির সম্মেলন কক্ষে সকাল থেকেই ছিল প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর। স্বভাবসুলভ আন্তরিকতায়, মুখে এক চিলতে হাসি নিয়েই উপস্থিত সকলকে স্বাগত জানান।

কর্মশালার উদ্বোধনী বক্তব্যে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে দুর্নীতির গভীরতা নিয়ে তেমন কোনো বিস্তারিত গবেষণা হয়নি। তাই সাংবাদিকদেরই তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা আর ভেতরের গল্পগুলো সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরতে হবে। তিনি জোর গলায় বলেন, “আপনাদের প্রতিটি কথাই মূল্যবান।”

এই কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য ছিল, সাংবাদিকদের এমন কিছু কৌশল শেখানো, যা তাঁদের খেলার মাঠের অনৈতিক চর্চার বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে লড়তে সাহায্য করবে। খেলাধুলা আমাদের সবাইকে একসূত্রে বাঁধে, কিন্তু কিছু মানুষের অসাধু কার্যকলাপের জন্য এর পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে। আলোচনায় উঠে আসে স্বচ্ছতার পাহারাদার হিসেবে তাঁদের ভূমিকা কী।

অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন খন্দকার তারেক। তিনি একাধারে মুক্তিযোদ্ধা এবং আলোকচিত্র সাংবাদিকতায় নিবেদিতপ্রাণ। খেলার খবরের মাধ্যমে তিনি স্বচ্ছতা আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যেতে চান। কর্মশালায় তন্ময় হয়ে বসেছিলেন তিনি, কলম চলছিল দ্রুত নোটবুকের পাতায়। ক্রীড়া সাংবাদিকতার নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজের অভিজ্ঞতা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেই ভাবনাগুলোই টুকে রাখছিলেন। তাঁর মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল নানা প্রশ্ন, “আমরা কী পরিবর্তন আনতে পারি? আমাদের প্রতিবেদনে কীভাবে সততা আর নিষ্ঠা বজায় রাখব?”

বিএসপিএ-এর সভাপতি রেজওয়ান-উজ-জামান বললেন, সাংবাদিকদের জ্ঞান দিয়ে আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে। এমন কর্মশালা তাই আরও দরকার। তিনি বলেন, “একসঙ্গে মিলে আমাদের ক্রীড়াঙ্গন দুর্নীতিমুক্ত করার একটা পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।”

দিন যত গড়াচ্ছিল, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা আর মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টিং বা বহুমাধ্যম সাংবাদিকতা নিয়ে আলোচনা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠছিল। সাংবাদিকরা খেলার খবরের নৈতিক দিকগুলো নিয়ে গভীরভাবে মতবিনিময় করছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সাইফুল আলম চৌধুরীর মতো বিশিষ্টজনেরা নিরপেক্ষতা আর দায়িত্বশীলভাবে খবর পরিবেশনের ওপর জোর দেন। তারা সাংবাদিকদের এই ভুল তথ্যের যুগে সত্যনিষ্ঠ থাকার আহ্বান জানান। প্রবীণ সাংবাদিক এবং ‘সকাল সন্ধ্যা’ পত্রিকার ক্রীড়া সম্পাদক সনৎ বাবলা কর্মশালার উদ্দেশ্যটা খুব সহজ করে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “খেলার খবরে নৈতিক সাংবাদিকতা নিয়ে এটা একটা জরুরি আলোচনার সূত্রপাত। আমাদের এই আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে, যাতে আমরা সবাই মিলে নৈতিকতা চর্চার পথে যে বাধাগুলো আছে, সেগুলো চিহ্নিত করে দূর করতে পারি।”

দিনের শেষে কর্মশালাটি শুধু কিছু নীরস আলোচনায় আটকে থাকেনি বরং সবার মধ্যে একটা গভীর সম্মিলিত দায়িত্ববোধও তৈরি করেছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান কর্মশালার শেষে তাঁদের এই ব্রতের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “একসঙ্গে মিলে আমরা একটা নতুন দিনের গল্প লিখব – যেখানে ক্রীড়া সাংবাদিকতায় সততা আর নৈতিকতার বিজয় পতাকা উড়বে।”

টিআইবি মনে করে এই কর্মশালা থেকে দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে খন্দকার তারেক এবং তাঁর সহকর্মী সাংবাদিকরা নিজেদের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা আর নৈতিকতার চর্চা প্রতিষ্ঠার একনিষ্ঠ কারিগর হিসেবে নব উদ্যমে যাত্রা শুরু করেছেন। তাঁরা শুধু খেলার মাঠের জয়কেই উদযাপন করবেন না, বরং সত্যের সন্ধানেও অবিচল থাকবেন। বাংলাদেশের খেলাধুলা এবং এর অগণিত উৎসাহী সমর্থকদের মঙ্গলের জন্য তাঁরা ক্রীড়া সাংবাদিকতায় স্বচ্ছতা বাড়াতে দৃঢ় অঙ্গীকারবদ্ধ।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি