প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা বিধিমালা ২০২৪: মৌলিক অধিকারের ওপর নতুন খাঁড়া?

প্রকাশকাল: ২০ জুন ২০২৪


সাইবার জগৎ এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু এই জগৎকে নিরাপদ রাখার নামে যদি আমাদের কথা বলার অধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আর সাধারণ মানবাধিকার খর্ব হয়, তবে তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সম্প্রতি প্রস্তাবিত ‘সাইবার নিরাপত্তা বিধিমালা ২০২৪’ নিয়ে এমনই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং আর্টিকেল-১৯ যৌথভাবে এই বিধিমালা পর্যালোচনা করেছে। গত ১৩ জুন ২০২৪ তারিখে এই পর্যালোচনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপন এই পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশগুলো তৈরি এবং উপস্থাপন করেন।

সাইবার নিরাপত্তা আইন: মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী? ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নতুন রূপ?

নাম পরিবর্তন হলেও ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩’ যেন সেই পুরনো ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ)’-এরই নতুন সংস্করণ। ডিএসএ-এর অনেক দমনমূলক বৈশিষ্ট্যই এই নতুন আইনে রয়ে গেছে। ফলে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর যে দমন-পীড়নের ভয় ছিল, তা মোটেই কমেনি। অনেকেই বলছেন, সাইবার নিরাপত্তা আইনের অনেক অংশই ডিএসএ-এর অনুকরণ, যা ভিন্নমত দমন এবং মৌলিক বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত হানার জন্য পরিচিত ছিল। এই নতুন বিধিমালাও সেই একই স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মূলনীতির পরিপন্থী, যেখানে মুক্ত আলোচনা এবং তথ্যের অবাধ প্রবাহকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই বিতর্কিত দিকগুলোর ধারাবাহিকতা দেখে মনে হচ্ছে, এটি নিছকই বাহ্যিক পরিবর্তন, মৌলিক কোনো সংস্কার নয়।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই বিধিমালায় সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত প্রতিফলিত হয়নি। তিনি বলেন, “তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং মত প্রকাশের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্যই ডিএসএ-এর পর সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) কার্যকর করা হয়েছে। সিএসএ পর্যালোচনায় যে সব স্বেচ্ছামূলক বা ইচ্ছাকৃত উপাদান বেরিয়ে এসেছে, প্রস্তাবিত বিধিমালায় তা আরও জটিল হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আইনটি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যে সব স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাকে জড়িত করা প্রয়োজন, তাদের কথা বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়নি। এই আইন ও বিধিমালার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণের কোনো সম্ভাবনা আমরা দেখছি না। আমাদের আশঙ্কা, এটি কেবল নাগরিকদের অধিকার নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হবে।”

যথেচ্ছ নিয়ম নির্ধারণ এবং অস্পষ্ট সংজ্ঞা

সাইবার নিরাপত্তা আইনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর মধ্যে একটি হলো এর অস্পষ্ট সংজ্ঞা এবং যথেচ্ছ নিয়ম তৈরির সুযোগ। এই ধরনের অস্পষ্টতা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে আইনটি প্রয়োগের দিকে নিয়ে যেতে পারে, যা নির্দিষ্ট স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করা হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রস্তাবিত বিধিমালার ২৬ নম্বর ধারায় মহাপরিচালককে মূল আইনের চেয়েও বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এটি জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতাহীন আইনের প্রয়োগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দরজা খুলে দেয়।

ডিজিটাল জগতের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ

সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং এর সংশ্লিষ্ট বিধিমালার একটি গুরুতর সমস্যা হলো, ডিজিটাল জগৎকে সরকারি নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের অধীনে রাখার ধারণা। এই দৃষ্টিভঙ্গি ইন্টারনেটের মৌলিক নীতির পরিপন্থী, যাকে বলা হয় চিন্তা আদান-প্রদানের একটি মুক্ত ও উন্মুক্ত স্থান। বিধিমালায় নজরদারি ক্ষমতার সম্ভাব্য অপব্যবহারের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই। ফলে, সাইবার নিরাপত্তার অজুহাতে ব্যাপক পর্যবেক্ষণ ও সেন্সরশিপের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

দক্ষতাহীন মাথাভারী সংস্থা

সাইবার নিরাপত্তা আইনের অধীনে ‘জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা (এনসিএসএ)’-এর গঠন কাঠামোতেও ত্রুটি দেখা গেছে। সংস্থাটিকে ‘টপ হেভি’ বলে প্রতীয়মান হচ্ছে, যেখানে কর্মীদের যোগ্যতা এবং দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা অস্পষ্ট। সাইবার নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের নিয়োগ এবং কর্মক্ষমতার জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ডের অভাব সংস্থার কার্যকারিতা হ্রাস করতে পারে। এছাড়া স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থার অনুপস্থিতি ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

প্রস্তাবিত সাইবার নিরাপত্তা বিধিমালা ২০২৪ মৌলিক অধিকারকে সম্মান জানিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার করার পরিবর্তে সমস্যাযুক্ত নীতিগুলোর ধারাবাহিকতাকেই প্রতিফলিত করে। এই সমালোচনাগুলো সাইবার নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের সুরক্ষার ভারসাম্য রক্ষার জন্য জরুরি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

এই পর্যালোচনার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে আর্টিকেল-১৯ এর আঞ্চলিক পরিচালক শেখ মনজুর-ই-আলম বলেন, “আমরা এখনও তথ্য সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন করিনি, অথচ আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতি নিয়ে কাজ করছি, যদিও এআই মূলত তথ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সাইবার জগতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে, আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ, তথ্য ও ডেটাতে প্রবেশাধিকার এবং মানুষকে হয়রানি করার জন্য এই ধরনের আইন বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখাচ্ছি। আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে আসতে হবে।”

অংশীজনদের জন্য বিধিমালাটির উদ্দেশ্য পূরণ এবং একইসঙ্গে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিগুলো অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য সংশোধনের দাবি জানানো অপরিহার্য।

সম্পূর্ণ পর্যালোচনা ও উপস্থাপনা পেতে ভিজিট করুন -
visit - https://ti-bangladesh.org/bn/articles/position-paper/7020


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি