প্রকাশকাল: ১৯ মে ২০২৬
বাংলাদেশের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন সবসময়ই একটি সাধারণ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। কাজের ধরন যখন ধীরগতির, জৌলুসহীন এবং লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে, তখন স্বেচ্ছাসেবকদের কীভাবে অনুপ্রাণিত রাখা যায়? সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততাই বা কীভাবে ধরে রাখা সম্ভব? গত এপ্রিলে টানা দুই দিন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে। রংপুর ও বগুড়ায় তারা কয়েকশ কর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে সভা করেছে। সভার মূল উদ্দেশ্য শুধু কাজের অগ্রগতি তুলে ধরা ছিল না, বরং সামনের দিনে কাজ চালিয়ে যাওয়ার মনোবল দৃঢ় করাও এর একটি বড় লক্ষ্য ছিল।
সনাক, ইয়ুথ এনগেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট (ইয়েস) গ্রুপ এবং একটিভ সিটিজেনস গ্রুপ (এসিজি) এর প্রতিনিধিত্বকারী শিক্ষক, আইনজীবী, তরুণ কর্মী ও সমাজ সংগঠকেরা এখানে এক কাতারে শামিল হন। ভবিষ্যতে বড় কোনো সাফল্য ছিনিয়ে আনতে যে সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রয়োজন হয়, তাঁরা মূলত সেই ভিতটিই তৈরি করেছেন এই সভাগুলোর মাধ্যমে।
পরিচিত গণ্ডির বাইরে যোগাযোগ বৃদ্ধি
দুটি অধিবেশন থেকেই একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত ঐকমত্য বেরিয়ে আসে। আন্দোলন কখনো নিজের গণ্ডির ভেতর আটকে থেকে বড় হতে পারে না। এর আসল শক্তি লুকিয়ে আছে বাইরের সমমনা নাগরিক সংগঠন এবং আনুষ্ঠানিক প্রচারণার বাইরে থাকা সাধারণ মানুষের সাথে সংযোগ স্থাপনের মাঝে। অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে, স্বেচ্ছাসেবকেরা নিছক কোনো ব্যবহার্য সম্পদ নন, বরং তাঁরাই এই আন্দোলনের মূল প্রাণ। তাঁদের ছাড়া এই কমিটিগুলো কেবলই কাগুজে নাম। আর তাঁদের উপস্থিতি একে একটি অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত করে।
উভয় সভাতেই একটি যুক্তি খুব স্পষ্টভাবে উঠে আসে। স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক কাজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়, আর গ্রহণযোগ্যতা সম্প্রসারণের নতুন পথ উন্মোচন করে। পুরোনো সদস্যদের আরও বেশি সক্রিয় করার পাশাপাশি দুর্নীতিবিরোধী কাজের সাথে এখনো যুক্ত হয়নি এমন সংগঠনগুলোকে টেনে আনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই দুটি লক্ষ্য একে অপরের পরিপূরক। দুই শহরের এরিয়া কোঅর্ডিনেটররা তাদের সাম্প্রতিক কাজের অত্যন্ত খোলামেলা চিত্র তুলে ধরেন। পরিকল্পনামতো এগোয়নি এমন কাজগুলোর ব্যর্থতা থেকেও যে অনেক কিছু শেখার আছে, সে বিষয়টি তাঁরা অকপটে স্বীকার করেন। এই সততা ও স্পষ্টবাদিতার কারণেই একটি সাধারণ গতানুগতিক আলোচনা হয়ে ওঠে অত্যন্ত প্রাণবন্ত।
রংপুর ও বগুড়ার সভার শেষভাগে সব অংশগ্রহণকারী একত্রে দাঁড়িয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধের শপথ গ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার বদলে সম্পূর্ণ নৈতিক দায়বদ্ধতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি আন্দোলনে সহকর্মীদের সামনে দাঁড়িয়ে এমন প্রকাশ্য অঙ্গীকারের একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এর মাধ্যমে জবাবদিহির বিষয়টি দৃশ্যমান হয় এবং আন্দোলনটি নিজস্ব মানদণ্ডে অটুট থাকে। পাশাপাশি এটি সবাইকে মনে করিয়ে দেয় যে, সনাক এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলো এমন একটি পরিমণ্ডলে কাজ করে যেখানে মানুষের পারস্পরিক আস্থাই সবচেয়ে বড় চুক্তি।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে তৃণমূলের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর
গত ২৭ এপ্রিল আরডিআরএস বাংলাদেশ এর বেগম রোকেয়া মিলনায়তনে রংপুরের সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সনাক রংপুরের সভাপতি ড. শাশ্বত ভট্টাচার্য। অ্যাডভোকেট দিলরুবা রহমানের স্বাগত বক্তব্যের পর টিআইবি এর সিভিক এনগেজমেন্ট কোঅর্ডিনেটর মো. আতিকুর রহমান স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক বিষয়ে কৌশলগত দিকনির্দেশনা দেন। টিআইবির ক্লাস্টার কোঅর্ডিনেটর সভার মূল উদ্দেশ্যগুলো তুলে ধরেন। সনাক সভাপতির পরিচালনায় সমাপনী শপথের আগে সহসভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান, অধ্যাপক মো. শাহ আলম এবং নাফিসা সুলতানাও উপস্থিত সবার উদ্দেশে বক্তব্য দেন।
পরদিন ২৮ এপ্রিল বগুড়ার এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন সনাক বগুড়ার সভাপতি অধ্যাপক মো. ওসমান গণি। মো. আতিকুর রহমান এখানেও নাগরিক যোগাযোগ ও আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর বক্তব্য রাখেন। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠনের মাঝে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়ে কথা বলেন সহসভাপতি মিলন রহমান, অধ্যাপক নাসিমা আক্তার, অজিত কুমার, তাপসী দে, মাসুদুর রহমান হেলাল এবং মেরাজুল হাসান মণ্ডল। এরপর এরিয়া কোঅর্ডিনেটর কাজের সার্বিক অর্জনগুলো উপস্থাপন করেন এবং সম্মিলিত দুর্নীতিবিরোধী শপথের মাধ্যমে সভার সমাপ্তি ঘটে।
নাগরিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধিই প্রধান নিয়ামক
দুই শহরের অংশগ্রহণকারীরাই শুধু সাময়িক অনুপ্রেরণা নয়, বরং তার চেয়েও বেশি কিছু নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। এই সভাগুলো এমন একটি বিশ্বাসকে আরও সুদৃঢ় করেছে যা শুরু থেকেই সনাক এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোকে পথ দেখিয়ে আসছে। সেই বিশ্বাসটি হলো, শুধু প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে কোনো স্বচ্ছ সমাজ গড়ে ওঠে না। এর জন্য প্রয়োজন এমন কিছু মানুষের ধারাবাহিক ও স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ, যাঁরা সমাজকে একটি উন্নত ও জবাবদিহিমূলক জায়গায় দেখতে চান।
সমমনা সংগঠনগুলোর সাথে যোগাযোগ বাড়ানো, নাগরিক অংশগ্রহণ গভীর করা এবং আন্দোলনের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ঘটানো এখানে কোনো কল্পনাবিলাসী ধারণা নয়। বরং এগুলোই তাদের নির্ধারিত কাজ। রংপুর ও বগুড়া প্রমাণ করেছে যে, এই কাজকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত আত্মবিশ্বাসী মানুষ, সাংগঠনিক কাঠামো এবং সৎ আত্মসমালোচনার চর্চা তাদের রয়েছে। এই জমায়েত খুব স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, স্বচ্ছতা ও সুশাসনের দাবি কোনো নির্দিষ্ট শহরের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি সর্বজনীন লড়াই, এবং এই লড়াইয়ের পথ চলা এখনো অনেক বাকি।