সিলেটে তথ্যনির্ভর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নতুন যাত্রা

প্রকাশকাল: ২৯ জুলাই ২০২৬

হাসপাতালের এক অন্ধকার বদ্ধ ঘরে অযত্নে ধুলো জমছে ২০ কোটি টাকার একদম নতুন এমআরআই যন্ত্রটিতে। । আর ঠিক বাইরে, চিকিৎসার আশায় এসে খালি হাতে ফিরে যাচ্ছে একের পর এক অসহায় মানুষ। এই নির্মম বাস্তবতার আসল গল্পটা লুকিয়ে আছে কোথায়? ভিটেমাটি বেচে পাশের ক্লিনিকে দৌড়ানো পরিবারগুলোর চিৎকারে? নাকি কোনো ধুলো পড়া ফাইলের স্তূপে? যে ফাইলের কাগজগুলো ঘাঁটলে হয়তো দেখা যাবে, জার্মানির তৈরি নতুন মেশিনের নাম করে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে একটা সস্তার ভাঙাচোরা জিনিস!

কিংবা যখন ১৭৬ কোটি টাকার একটা সরকারি আবাসন প্রকল্পের দরপত্রে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়, অথচ কেউ কোনো প্রশ্ন পর্যন্ত তোলে না? যখন কুশিয়ারা নদীর তীরে বাঁধ নির্মাণের নামে কোটি কোটি টাকা নদীতে ভেসে যায়, আর বছরের পর বছর ধরে প্লাবিত হতে থাকে নদীপাড়ের ভিটেমাটি?

এগুলো নিছক কোনো দুর্ভোগের গল্প নয়। যখন নজরদারির কেউ থাকে না, তখন প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ঠিক এভাবেই নিজের শিকড় ছড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের অনুসন্ধানী সংবাদকর্মীরা প্রায়ই এক অলক্ষ্য দেয়ালের সামনে এসে থমকে দাঁড়ান। অন্যায়ের পেছনে মানুষের হাহাকার তারা স্বচক্ষে দেখতে পান, কিন্তু যখনই এর পেছনের আসল কারিগরদের খুঁজতে যান, অমনি সামনে আসে নানা অজুহাত, কালক্ষেপণ কিংবা আইনি নোটিশের পরোক্ষ হুমকি। কেবল সরকারি প্রেস রিলিজ আর কর্তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ধরে এই দেয়াল ডিঙানো অসম্ভব। দরকার নিখুঁত প্রযুক্তিগত দক্ষতা, অকাট্য প্রমাণ এবং সরকারি তথ্য বা ডাটা সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণের ক্ষমতা।

সিলেটের আঞ্চলিক সাংবাদিকদের ঠিক এই জায়গাটিতেই আরও শক্তিশালী করে তুলতে হোটেল ক্রাউন পার্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত একদিনের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় আঞ্চলিক ৪১ জন সাংবাদিক একত্র হয়েছিলেন ।

মাঠপর্যায়ের নানা অভিজ্ঞতার গল্পে ঘরটা তখনো বেশ প্রাণবন্ত। কিন্তু সেই সহজ আবহটা হুট করেই কেমন গম্ভীর হয়ে এলো, যখন পর্দার ওপর জাতীয় ই-জিপি পোর্টালের নিরীক্ষাচিত্রটি ফুটে উঠল।

চলতি আলোচনার গতি থামিয়ে টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন ডিরেক্টর মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম একটা অদ্ভুত পরিসংখ্যানের দিকে সবার নজর ফেরালেন। গত ১৬ বছরে সরকারি খরচের হিসাব। কোনো রকম প্রতিযোগিতা ছাড়া, কেবল নামমাত্র একক দরপত্রের আড়ালে পার হয়ে গেছে প্রায় ৮৪ হাজার কোটি টাকা!

জাতীয় পর্যায়ের বিশাল অংকের খতিয়ান বেশ অবাক করলেও একেবারে অপরিচিত নয় প্রশিক্ষণার্থী সাংবাদিকদের কাছে। তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতার গল্পে তাই উঠে আসছিলো সিলেটের অনিয়মের নিজস্ব চিত্র, দুর্নীতির এক নতুন কৌশল।

তারা শোনালেন কীভাবে সেখানে বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোকে ভেঙে ৫ কোটি টাকার কম বাজেটে ভাগ করে ফেলা হয়, যাতে উন্মুক্ত দরপত্রের বদলে সীমিত দরপত্র পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়। বিশেষ প্রযুক্তি কেনার আইনকে হাতিয়ার বানিয়ে সাধারণ সড়ক নির্মাণের কাজগুলোকে পরিণত করা হয় রাজনৈতিক ভাগ বাটোয়ারায়। আলোচনায় উঠে আসে, দুর্নীতির এসব প্রমাণ সব সময় বন্ধ ঘরের ভেতর লুকিয়ে থাকে না; অনেক সময় তা সরকারি ওয়েবসাইটের উন্মুক্ত পাতাতেই পড়ে থাকে, কেবল জহুরির চোখ দিয়ে তা চিনে নেওয়ার অপেক্ষা।

তবে মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম মনে করিয়ে দেন, স্ক্রিনে অসংগতি খুঁজে পাওয়াটা কেবল আসল লড়াইয়ের শুরু। আসল চ্যালেঞ্জ হলো, একটি সন্দেহজনক সংখ্যাকে অস্বীকার করা যায়না এমন খবরে রূপ দেওয়া।

অভিজ্ঞ অনুসন্ধানী সাংবাদিক মো. বদরুদ্দোজা খুব ভালো করেই জানেন এই পথটা কতটা কঠিন, আবার কতটা সম্ভাবনাময়। তিনি কীভাবে কোনো গোপন নথির ওপর নির্ভর না করে কেবল মাঠপর্যায়ের কঠোর পরিশ্রমে ৪২৫ কোটি টাকার এক বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ভূমি ক্রয় দুর্নীতির তথ্য উন্মোচন করেছিলেন, তা অংশগ্রহণকারীদের সামনে বিস্তারিত তুলে ধরেন। রূপগঞ্জের স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল মেলানো, আশেপাশের জমি মালিকদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে প্রকৃত বাজারদর যাচাই করা এবং ব্যাংকে দ্রুত টাকা স্থানান্তরের পথ ধরে ধরে তিনি এই অনুসন্ধান চালান। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যখন সংবাদ সম্মেলন ডেকে পুরো ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে, মো. বদরুদ্দোজার দল তখনো পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল। শেষ পর্যন্ত কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে এমন ১০টি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করা হয়, যার কোনো জবাব তারা দিতে পারেনি। আর এরই ধারাবাহিকতায় বিচারকাজে সাতজন দুর্নীতিবাজের কারাদণ্ড হয়।

অনুসন্ধানে মো. বদরুদ্দোজা ব্যবহার করেছেন ৫পি কাঠামো: পারপাস বা উদ্দেশ্য, প্রসেস বা প্রক্রিয়া, পিপল বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, পেপার বা নথি এবং প্রুফ বা প্রমাণ। একজন দক্ষ গবেষক বা সাংবাদিকের কাজকে তিনি তুলনা করেন একজন সার্জনের অপারেশনের সাথে, যেখানে অত্যন্ত সতর্কতা আর দক্ষতার সাথে অন্যায়ের টিউমার অস্ত্রোপচার করে বাদ দিতে হয় সুস্থ কোনো টিস্যু নষ্ট না করে।

কিন্তু সময়ের অভাব অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বড় বাধা। পরদিনের ডেডলাইনের পেছনে ছুটতে থাকা একজন সাংবাদিকের পক্ষে হাজার হাজার পৃষ্ঠার বাজেট ও কেনাকাটার নথি যাচাই করা প্রায় অসম্ভব।

এই সমস্যার সমাধান নিয়ে আসেন টিআইবি এর সহকারী সমন্বয়ক (ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন) রিফাত রহমান। তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা অগোছালো সরকারি নথি থেকে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মূল তথ্য বের করে দেখান। সফটওয়্যারটি কুশিয়ারা নদীর ১০৬টি প্রকল্পের প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার নথি বিশ্লেষণ করে বন্যার তথ্য ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তথ্যের সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দিল। তবে রিফাত রহমান মনে করিয়ে দেন, প্রযুক্তি নথি গুছিয়ে দিতে পারে, কিন্তু সত্য কোনটা বা কোন তথ্য গুরুত্বপূর্ণ সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা সংবাদকর্মীর নিজের।

শৃঙ্খলা আর সততা না থাকলে এই সমস্ত আয়োজনই ব্যর্থ। উন্মুক্ত তথ্য আর শক্ত প্রমাণের ওপর ভর করে যে খবর লেখা হয়, তা শুধু খবরের পেছনের সত্যটাই উন্মোচন করে না, বরং সাংবাদিকের জন্যও এক সুরক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়। আইনি ভয়ভীতি থেকে যেমন রিপোর্টারকে রক্ষা করে, তেমনি জনগণের আমানত আর রক্তঘামের টাকাকেও পাহারায় রাখে। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি সাংবাদিকের হাতে তুলে দেওয়া হয় টিআইবির তৈরি বাংলায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডেটা সাংবাদিকতা সহায়িকা, সাথে মাঠে নেমে কাজ শুরু করার মতো প্রয়োজনীয় সব ডিজিটাল রিসোর্স।

দিনশেষের প্রাপ্তিটা আসলে এখানেই। মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের দেখানো উন্মুক্ত তথ্য থেকে অনুসন্ধানের উপায়, মো. বদরুদ্দোজার সুবিন্যস্ত ৫পি কাঠামো, আর রিফাত রহমানের হাতে-কলমে দেখানো আধুনিক প্রযুক্তি, একত্রে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিতে করেছে আরো দক্ষ।

পুরো আয়োজনের সারমর্ম টেনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেন অনুসন্ধানের আসল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা মানে কেবল তথ্যের বিবরণ দেওয়া নয়, এটি প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনস্বার্থ রক্ষার এক নিরন্তর লড়াই। উন্মুক্ত তথ্য ও আধুনিক অনুসন্ধানী কৌশলে পারদর্শী হয়ে উঠলে সাংবাদিকরা কেবল নীরব দর্শক থাকেন না, বরং রূপ নেন গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সততার মূল চালিকাশক্তিতে।‘

তথ্য, কৌশল আর সাধারণ ফাইলের আড়ালে জমে থাকা সত্য বের করে আনার এই দীক্ষাই ছিল সিলেটের ওই ঘরে এক হওয়া ৪১ জন সাংবাদিকের মূল অর্জন। আর ঠিক এ কারণেই গল্পটা আবার ফিরে যায় তার চেনা গোড়ায়। সেই তালাবন্ধ ঘর, যেখানে নিঃশব্দে ধুলো জমছে নতুন এমআরআই যন্ত্রটায়। নদীর তীর রক্ষার নামে কোটি কোটি টাকা গায়েব হলেও প্রতি বর্ষায় ভিটেমাটি হারাচ্ছে মানুষ। তালা মারা সেই ঘরের দরজা খুলতে কিংবা উধাও হয়ে যাওয়া টাকার আসল পথ খুঁজে বের করতে দরকার এই একই রকম একনিষ্ঠতা। কেবল তবেই কোনো অস্পষ্ট গাণিতিক হিসাব রূপ নেবে এক অকাট্য সত্যে।

কোনো ড্রয়ারের তালা কিংবা কর্মকর্তাদের আইনি নোটিশের ভয় আর তাদের থামাতে পারবে না। প্রেস কনফারেন্সে তোলা অস্বীকারের প্রাচীরও আটকে রাখতে পারবে না তাদের। ডেটা আর তথ্যের হিসাব কষে, নথির পেছনের সত্য উন্মোচন করে তারা এখন প্রস্তুত পুরো দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি দাঁড় করাতে।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি