প্রকাশকাল: ০৫ জুলাই ২০২৬
বন্যার সময় বিদ্যুৎ নেই, তবু কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা বন্ধ হবে না। মোবাইলে কয়েকটি তথ্য দিলেই জানা যাবে, নিজের বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বসানো কতটা লাভজনক। আবার উপকূলের চিংড়িচাষিরা নিজেরাই উৎপাদন ও ব্যবহার করবেন পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ।
শুনতে ভবিষ্যতের গল্প মনে হলেও, এগুলো এসেছে বাংলাদেশের তরুণদের কাছ থেকেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত ‘আইডিয়া কনটেস্ট ২০২৬’ এই ভাবনাগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছিল। তরুণদের সেই ভাবনাগুলোকে আরও বিকশিত করার লক্ষ্যেই টিআইবি এবার দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজন করেছে ‘আইডিয়া কনটেস্ট’। তবে এই প্রতিযোগিতা আয়োজনের উদ্দেশ্য শুধু নতুন প্রযুক্তির ধারনা খুঁজে বের করা নয়; বরং বাস্তব সমস্যার গভীরে গিয়ে সেগুলোর পেছনের সুশাসন-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো বোঝা এবং সেই প্রেক্ষাপটে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে তরুণদের উৎসাহিত করা।
আর সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জমা পড়েছিল তিন শতাধিক ধারনা। বিষয় আলাদা, অঞ্চল আলাদা, শিক্ষার্থীদের পটভূমিও ভিন্ন কিন্তু প্রতিযোগিতায় জমা পড়া তিন শতাধিক ধারনার বৈচিত্র্য ছিল যেমন বিস্ময়কর, তেমনি ছিল তাদের মিল! এই ভাবনাগুলোর উৎস ছিল ভিন্ন—কেউ ভেবেছে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে, কেউ কৃষি, কেউ প্রযুক্তি, আবার কেউ উপকূলীয় জীবিকা নিয়ে। কিন্তু সব পথ শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিলেছে একটি উপলব্ধিতে—বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার মানে শুধু আরও বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়; বরং মানুষের জীবনকে আরও নিরাপদ, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার নতুন সুযোগ।
এই দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিফলন দেখা যায় বিজয়ী তিনটি উদ্ভাবনে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী মো. মিরাজ হোসাইন মাহিন ও মেহেরাব হোসাইন অপির দল ‘রোদ্দুর এআই’ এমন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্ল্যাটফর্মের ধারনা দিয়েছে, যার মাধ্যমে দেশের যেকোনো স্থানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন কতটা সম্ভাবনাময়, তা সাধারণ মানুষ সহজেই জানতে পারবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজিম মালিয়াত ও আসফিন জান্নাত শামসির দল ‘হেলথপাওয়ার (স্বাস্থ্যশক্তি)’ দেখিয়েছে, কীভাবে বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত হাইব্রিড জরুরি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রূপান্তর করা যেতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. নাসিমুজ্জামান সাব্বিরের দল ‘সোলারক্লাস্টার’ সাতক্ষীরার চিংড়িচাষ অঞ্চলকে কেন্দ্র করে কমিউনিটি মালিকানাধীন সৌর মিনি-গ্রিডের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন ও সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি টেকসই মডেল উপস্থাপন করেছে।
চূড়ান্ত পর্বে ওঠা অন্য দলগুলোর ধারনাও ছিল সমান বৈচিত্র্যময়—নবায়নযোগ্য জ্বালানিচালিত কোল্ড স্টোরেজ, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির পুনর্ব্যবহার, তৈরি পোশাক কারখানার অপচয় হওয়া তাপের ব্যবহার, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় জলবায়ু অর্থায়নের সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের নতুন পথ—সব মিলিয়ে প্রতিযোগিতাটি হয়ে ওঠে সম্ভাবনার এক উন্মুক্ত মঞ্চ!
এই আয়োজনে তাই গুরুত্ব পেয়েছে শুধু নতুন নতুন ধারনা নয়, সেই ধারনা কতটা বাস্তবসম্মত, টেকসই এবং মানুষের কাজে লাগবে—সেই প্রশ্নগুলোরও উত্তর খোঁজা। মানুষ কি এই সমাধান গ্রহণ করবে? অর্থনৈতিকভাবে কতটা টেকসই? বাস্তবায়নের পথে কী ধরনের নীতিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক বাধা রয়েছে? আর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নাগরিক অংশগ্রহণ কীভাবে একটি ভালো ধারনাকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের ধারনাকে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। প্রতিযোগিতা শেষে অনেক অংশগ্রহণকারীই উপলব্ধি করেন, এই আয়োজনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল পুরস্কার জেতার মতো একটি ধারনা তৈরি করা নয়; বরং সেটিকে আরও কিভাবে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর করে তোলার পথ খুঁজে পাওয়া। বরং এই আয়োজন তাদেরকে সাহায্য করেছে জটিল সমস্যাকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা, সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করা এবং ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করতে শেখা।
চূড়ান্ত পর্বে বিচারক ও বিশেষজ্ঞরা শুধু ধারনাগুলোর অভিনবত্ব নয়, সেগুলোর পেছনের চিন্তা, বিশ্লেষণ এবং বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে, অংশগ্রহণকারীরা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের গণ্ডি পেরিয়ে জ্বালানি সুশাসন, জনস্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের প্রশ্নগুলোকেও সমান গুরুত্ব দিয়েছে। তাঁদের মতে, প্রচলিত ধারনাকে প্রশ্ন করার সাহসই অনেক সময় নতুন সমাধানের জন্ম দেয়!
এই সম্ভাবনার প্রতিফলন দেখেই টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, "বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় সবসময় তরুণরাই পথ দেখিয়েছে। টিআইবি বিশ্বাস করে, শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে এগিয়ে যাওয়ার যাত্রাতেও নেতৃত্ব দেবে তরুণরাই। যারা এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে এসেছে, তারা প্রত্যেকেই বিজয়ী।"
শেষ পর্যন্ত পুরস্কার হাতে নিয়েছে মাত্র তিনটি দল। কিন্তু টিআইবির কাছে ‘আইডিয়া কনটেস্টে’র সবচেয়ে বড় অর্জন অন্য জায়গায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শত শত তরুণ দেখিয়ে দিয়েছে, তারা শুধু নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে চায় না; তারা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করতে, বাস্তব সমস্যার সমাধান খুঁজতে এবং বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে কল্পনা করতে প্রস্তুত।
সেই কারণেই ‘আইডিয়া কনটেস্ট’ কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয় - এটি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে তরুণদের সৃজনশীলতা, সুশাসনের মূল্যবোধ এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান খোঁজার মানসিকতা একসঙ্গে মিলিত হয়ে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।