প্রকাশকাল: ০৬ জুলাই ২০২৬
একটি ডাম্পসাইটে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ কী দেখেন? দুর্গন্ধ। ময়লার স্তূপ। ধোঁয়া। হয়তো কিছু পথশিশু, কয়েকজন বর্জ্য সংগ্রহকারী, আর দূরে উড়ে বেড়ানো কাক। কিন্তু একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক? তিনি কি একই দৃশ্য দেখেন, নাকি সেই দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আরেকটি গল্প খুঁজতে শুরু করেন? হয়তো তিনি ভাবেন—এই বর্জ্য এখানে কেন জমছে? কোথা থেকে আসছে? কে এর দায়িত্বে? এর প্রভাব কার জীবনে পড়ছে? একটি ডাম্পসাইট কি শুধু পরিচ্ছন্নতার সংকট, নাকি এটি নগর পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনীতি এবং সুশাসনেরও গল্প?
এই প্রশ্নগুলো নিয়েই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ২৯ জন সাংবাদিক অংশ নিয়েছিলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত Advanced Investigative Journalism Training on Solid Waste Management (SWM)-এ। কিন্তু তিন দিনের এই প্রশিক্ষণ তাঁদের হাতে কোনো প্রস্তুত উত্তর তুলে দেয়নি। বরং এমন কিছু নতুন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে, যেগুলো হয়তো তাঁরা আগে একইভাবে ভাবেননি।
প্রশিক্ষণের শুরুতেই অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল—এই তিন দিন শেষে তাঁরা কী নিয়ে ফিরতে চান? উত্তরগুলো লেখা হয়েছিল ছোট ছোট VIPP কার্ডে। কিন্তু সেই কার্ডগুলোতে শুধু প্রত্যাশা লেখা ছিল না; ছিল বাংলাদেশের সাংবাদিকতার মাঠে প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। কেউ জানতে চেয়েছেন, একটি পৌরসভার জবাবদিহিতা কীভাবে অনুসরণ করা যায়। কেউ খুঁজছিলেন বড় ডেটাসেট বিশ্লেষণের সহজ উপায়। কারও কৌতূহল ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনুসন্ধানের কাজে কতটা সহায়ক হতে পারে। আবার কেউ তখনও নিশ্চিত ছিলেন না—একটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ বর্জ্যের গল্প আদৌ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিষয় হতে পারে কি না।
তিন দিনের যাত্রা শেষে ফিরে তাকালে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি সম্ভবত উত্তরগুলোতে নয়, প্রশ্নগুলোতেই ধরা পড়ে। শুরুতে প্রশ্ন ছিল—একটি ডাম্পসাইটে কী দেখা যায়? শেষের দিকে এসে প্রশ্নটি বদলে যায়—কী দেখা যায় না? কারণ দৃশ্যমান বর্জ্যের স্তূপের নিচেই লুকিয়ে থাকে নীতি, পরিকল্পনা, অর্থনীতি, জলবায়ু, জনস্বাস্থ্য এবং সুশাসনের বহু অদৃশ্য স্তর। একটি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও তখন আর শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি পুরো ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। কোথাও একটি ডাম্পসাইটের সংকট মানে শুধু বর্জ্য অপসারণের ব্যর্থতা নয়, বরং পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা, নীতির অপূর্ণ প্রয়োগ, সম্পদের ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহির প্রশ্নও।
এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে ছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. রওশন মমতাজ, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ কাজী আমিন, টিআইবির পরিবেশ ও জলবায়ু অর্থায়ন বিভাগের গবেষণা সমন্বয়ক ড. নাবিল হক এবং গবেষণা সহযোগী সমন্বয়কারী আব্দুল্লাহ জাহিদ ওসমানীর গবেষণা, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও বাস্তব পর্যবেক্ষণের সংমিশ্রণ।
এই জায়গাতেই যেন প্রশিক্ষণটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমা অতিক্রম করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল দর্শনের দিকে এগিয়ে যায়। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সবচেয়ে কঠিন কাজ তথ্য খুঁজে পাওয়া নয়; গল্প খুঁজে পাওয়া। কারণ একটি ডাম্পসাইটে দাঁড়িয়ে সবাই একই দৃশ্য দেখে। কিন্তু সবাই একই গল্প খুঁজে পায় না। কারও চোখে সেটি শুধু বর্জ্যের স্তূপ। আবার কারও কাছে সেটিই হয়ে ওঠে জলবায়ু পরিবর্তনের গল্প। কেউ সেখানে জনস্বাস্থ্যের সংকট দেখেন, কেউ নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা, কেউ অর্থনীতির অদৃশ্য হিসাব, আবার কেউ খুঁজে পান নীতির প্রয়োগ, জবাবদিহি এবং সুশাসনের প্রশ্ন। একটি দৃশ্য—অসংখ্য সম্ভাব্য গল্প।
প্রশিক্ষণের এক পর্যায়ে এসে এই ভাবনাটিই যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিষয় অনেক সময় ঘটনাটি নয়; বরং ঘটনাটির সঙ্গে অদৃশ্যভাবে যুক্ত মানুষ, প্রতিষ্ঠান, সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। ফলে একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের প্রথম দায়িত্ব উত্তর খোঁজা নয়, বরং এমন প্রশ্ন করা, যা অন্যরা করতে ভুলে যায়।
এই ভাবনাটিই ধীরে ধীরে পুরো প্রশিক্ষণের কেন্দ্রে জায়গা করে নেয়। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বিষয় অনেক সময় ঘটনাটি নয়; বরং সেই ঘটনার সঙ্গে অদৃশ্যভাবে যুক্ত মানুষ, প্রতিষ্ঠান, সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব। একটি ডাম্পসাইট কীভাবে একই সঙ্গে জলবায়ু, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা এবং নীতিনির্ধারণের গল্প হয়ে উঠতে পারে, মাঠের বাস্তব অভিজ্ঞতা সেই সংযোগগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করেছে ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান এবং ‘Climate Watch’-এর প্রকাশক ও সম্পাদক শামছুদ্দিন ইলিয়াসের মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতা।
কিন্তু গল্প খুঁজে পেলেই কি অনুসন্ধান শেষ? বরং সেখান থেকেই শুরু হয় আরও কঠিন কাজ। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে তথ্য ও প্রমাণ। সেই প্রমাণ অনেক সময় লুকিয়ে থাকে সরকারি নথিতে, উন্মুক্ত ডেটাবেসে, কিংবা হাজার হাজার সংখ্যার ভেতরে। তখন একটি সংখ্যা আর শুধু সংখ্যা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে মানুষের জীবন, নীতির সাফল্য-ব্যর্থতা কিংবা কোনো অদৃশ্য বৈষম্যের সাক্ষ্য। কোথায় নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়, কোন ডেটা বিশ্বাস করা যায়, মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে সংখ্যাকে কীভাবে মিলিয়ে দেখা যায়, কিংবা বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলোকে একত্র করে কীভাবে একটি বড় চিত্র তৈরি করা যায়—এই অনুসন্ধানী দক্ষতাগুলোকে আরও শাণিত করেছে টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন ডিরেক্টর মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান ও ডেটা বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা এবং টিআইবির অ্যাসিস্ট্যান্ট কোঅর্ডিনেটর (ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন) রিফাত রহমান।
প্রশিক্ষণের এক পর্যায়ে আরেকটি নতুন প্রশ্ন উঠে এসেছে—AI কীভাবে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে? বড় ডেটাসেট গুছিয়ে নেওয়া, প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত খুঁজে বের করা কিংবা অনুসন্ধানের প্রাথমিক প্রস্তুতিকে আরও সহজ করা—এসব কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে সহায়ক হতে পারে, তার ব্যবহারিক দিকগুলো হাতে-কলমে দেখেছেন অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকরা। একই সঙ্গে তাঁরা বুঝেছেন, প্রযুক্তি কাজের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু সত্যতা নিশ্চিত করতে পারে না। AI নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়, তবে কোন তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি বিভ্রান্তিকর, আর কোনটি জনস্বার্থে সত্যিই মূল্যবান—সেই সিদ্ধান্ত এখনও মানুষেরই।
এরপর প্রশ্ন উঠে এলো প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, একটি অনুসন্ধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কি? একটি অনুসন্ধান শুরু হয় কিভাবে? উত্তর হলো, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়। কিন্তু সেই প্রশ্নের মূল্য তখনই তৈরি হয়, যখন তা নির্ভরযোগ্য তথ্য, প্রমাণ এবং ধারাবাহিক যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে জনস্বার্থের একটি বড় চিত্র সামনে আনে।‘ব্যক্তি নয়, সিস্টেমকে দেখা; অভিযোগ নয়, তথ্যকে অনুসরণ করা; অনুমান নয়, যাচাই করা’—এই অনুসন্ধানী মানসিকতাই পুরো প্রশিক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে। অনুসন্ধানী সাংবাদিক মোহাম্মদ বদরুদ্দোজার দীর্ঘদিনের মাঠ-অভিজ্ঞতা সেই দর্শনকেই আরও দৃঢ় করে। তাঁর সেশনটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য মনে করিয়ে দেয়—অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা শুধু কৌশল শেখার বিষয় নয়; এটি এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি! একটি প্রশ্নকে শেষ পর্যন্ত অনুসরণ করার ধৈর্য, অল্প তথ্যের ভেতরেও সম্ভাব্য গল্প খুঁজে পাওয়ার কৌতূহল, আর জনস্বার্থের প্রশ্নে আপস না করার দায়বদ্ধতাই একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিককে আলাদা করে।
শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি, ডেটা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট পদ্ধতির চেয়ে একটি বিষয়ই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে— যে ভালো অনুসন্ধানের মূল ভিত্তি কোনো একটি পদ্ধতি বা প্রযুক্তি নয়; বরং সঠিক প্রশ্ন করার সাহস, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার ধৈর্য, আর জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সাংবাদিকসুলভ বিচারবোধ!
তিন দিনের প্রশিক্ষণে প্রশ্ন ছিল, ধারণা ছিল, পদ্ধতি ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি মনে থেকে যায় মানুষের গল্প। সমাপনী অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্বে এসে যেন পুরো প্রশিক্ষণটি হয়ে উঠেছিল সাংবাদিকদের নিজেদের। তিনদিন যেসব বিষয় তত্ত্ব, কৌশল কিংবা অনুসন্ধানের পদ্ধতি হিসেবে সামনে এসেছিল, সেগুলো এবার ফিরে আসে বাস্তব অভিজ্ঞতার ভাষায়।
কেউ বলছিলেন একটি ছোট সূত্র ধরে মাসের পর মাস অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়ার কথা। কেউ স্মরণ করছিলেন একটি তথ্যের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার অভিজ্ঞতা। কেউ ভাগ করে নিচ্ছিলেন মাঠপর্যায়ে নানা বাধা, অনিশ্চয়তা কিংবা চাপের মধ্যেও জনস্বার্থের প্রশ্নটি ধরে রাখার লড়াই। আবার কেউ বুঝতে পারছিলেন, আগে যেসব অনুসন্ধানে বিচ্ছিন্ন ঘটনা দেখেছিলেন, এখন সেগুলোর মধ্যেও নতুন সংযোগ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
প্রশ্ন এসেছে, পাল্টা প্রশ্ন এসেছে, মতের ভিন্নতা এসেছে, আবার পুরো কক্ষজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে হাসিও। সেই মুহূর্তে বোঝা যাচ্ছিল, একজনের অভিজ্ঞতা আরেকজনের নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে, আবার সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নিচ্ছে নতুন ভাবনা। তিন দিনের এই যাত্রা যেন শেষ পর্যন্ত একটি যৌথ শেখার পরিসরে রূপ নেয়, যেখানে প্রশিক্ষক ও অংশগ্রহণকারীর সীমারেখাও অনেকটাই মুছে যায়।
প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের হাতে সার্টিফিকেট তুলে দেওয়া হয়। তবে এই তিন দিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি শুধু সার্টিফিকেট পাওয়াই নয়; এই প্রশিক্ষণ থেকে সবচেয়ে বড় পাওয়া হলো গল্পকে নতুনভাবে দেখার, পড়ার এবং প্রশ্ন করার একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি!
তিন দিন আগে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকরা এসেছিলেন উত্তর খুঁজতে। ফিরে গেলেন আরও ভালো প্রশ্ন করতে শেখার আত্মবিশ্বাস নিয়ে। তিন দিনের এই যাত্রার সবচেয়ে বড় অর্জন—বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আরও বেশি জানা নয়, বরং জনস্বার্থের গল্পকে নতুন চোখে দেখতে শেখা। এখন তাঁদের কাছে একটি ডাম্পসাইট আর শুধু বর্জ্যের স্তূপ নয়; এটি এমন একটি জনস্বার্থের ক্ষেত্র, যেখানে সুশাসন, জলবায়ু, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং মানুষের অধিকার গভীরভাবে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। আর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও আর শুধু কোনো ঘটনার বিবরণ নয়; এটি সেই অদৃশ্য সংযোগগুলোকে দৃশ্যমান করে তোলার দায়িত্ব।