প্রকাশকাল: ০৯ মে ২০২৬
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেনো একসঙ্গে দুর্বল হয়ে পড়ছে, আর কেনো গণমাধ্যম ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে আর বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই গত ৯ মে বসেছিল দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও সুশাসন বিশ্লেষকদের এক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬–এর দ্বিতীয় দিনের প্রথম এই অধিবেশনে উঠে আসে শুধু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সংকট নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীর দুর্বলতার চিত্রও।
আলোচকদের মতে, স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত হওয়া আসলে রাষ্ট্রের ভেতরে জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য এবং গণতান্ত্রিক সহনশীলতার ধারাবাহিক অবক্ষয়েরই প্রতিফলন।
রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য ভেঙে পড়লে ঝুঁকিতে পড়ে গণমাধ্যম
ডেইলি স্টারের কনসালটিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কখনো আলাদা কোনো বিষয় নয়। রাষ্ট্রের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়লে সংবাদমাধ্যমও টিকে থাকতে পারে না। তাঁর ভাষায়, গত ষোলো বছরে নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভা—সবগুলো প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যাকে তিনি “জিরো সাম” (হার-জিতের খেলা) অবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে যাচ্ছে, যেখানে ভিন্নমতকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা হয় না; বরং ক্ষমতার পথে বাধা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো নিজের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চা না করলেও রাষ্ট্র ও নাগরিকদের কাছ থেকে নিঃশর্ত আনুগত্য প্রত্যাশা করে।
কামাল আহমেদ আরও বলেন, গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়ার জন্য শুধু রাষ্ট্রীয় চাপই দায়ী নয়। রাজনৈতিক প্রভাব, করপোরেট স্বার্থ এবং মালিকানার কেন্দ্রীভবনও সম্পাদকীয় স্বাধীনতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
দমন-পীড়নের চাপে সংকুচিত সংবাদমাধ্যম
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আলোচনায় তুলে ধরেন উদ্বেগজনক কিছু তথ্য। তাঁর মতে, ২০০৯ সাল থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রায় ৪৫ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১৩০০–এর বেশি। তিনি বলেন, শুধু শারীরিক হামলাই নয়, আইনি হয়রানিও এখন সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণের বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ বিভিন্ন আইনের আওতায় আড়াইশোর বেশি সাংবাদিক মামলার মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে সংবাদমাধ্যমের ভেতরে এক ধরনের স্থায়ী ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা আত্মনিয়ন্ত্রণমূলক সম্পাদনা বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্বল হচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক পরিসর আরও সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তোলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকরভাবে কাজ করছে। তাঁর মতে, প্রেস কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রেই স্বাধীনভাবে ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। কখনো কখনো এসব প্রতিষ্ঠান মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার বদলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সিদ্ধান্তকে বৈধতা দিতেও ব্যবহার করা হয়েছে।
ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থের চাপে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা
দৈনিক সমকালের সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী সেদিনের আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন — রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরকার অদৃশ্য চাপ কীভাবে সংবাদমাধ্যমের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় 'এসডি পাস' অনেক সময় শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ থাকে না; এটি অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বাছাইয়ের হাতিয়ারেও পরিণত হয়। কখনো কখনো নির্দিষ্ট সাংবাদিকদের নির্দিষ্ট বিট থেকে সরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ আসে, কারণ তাঁদেরকে রাজনৈতিকভাবে “উপযুক্ত” মনে করা হয় না। এসব নির্দেশ হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয় না, কিন্তু সংবাদমাধ্যমের ভেতরে এই চাপ খুব স্পষ্টভাবেই অনুভূত হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আলোচকরা বলেন, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এ ধরনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ আদালত, আইন প্রণয়ন তদারকি প্রতিষ্ঠান ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করা যায়। কিন্তু বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ায় আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার প্রায় নেই বললেই চলে।
রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের বাড়তি প্রভাব
বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬ এর দ্বিতীয় দিনের প্রথম এই অধিবেশনের আলোচনায় রাজনৈতিক ক্ষমতা, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও গণমাধ্যম মালিকানার সম্পর্ক নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বক্তাদের মতে, রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত করপোরেট গোষ্ঠীগুলো ধীরে ধীরে দেশের গণমাধ্যম খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে। অপ্রদর্শিত অর্থ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিনিয়োগের ফলে সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ জনগণের জবাবদিহির জায়গা না হয়ে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে এস আলম গ্রুপের দৈনিক প্রথম আলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার প্রসঙ্গও আলোচনায় উঠে আসে। বক্তারা বলেন, এই ঘটনা দেখায় যে গণমাধ্যমের মালিকানা নিয়ে লড়াই প্রায়ই বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে জড়িত থাকে। এর ফলে স্বাধীন সাংবাদিকতা আর্থিক ও নীতিগত—দুই দিক থেকেই চাপের মুখে পড়ে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও বাড়ছে চাপ
বিবিসির সাবেক সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার বলেন, সংবাদমাধ্যমের প্রতি বৈরিতা এখন শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই সরকারগুলো সমালোচনামূলক সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নিচ্ছে।
তবে তিনি বলেন, পার্থক্যটা তৈরি হয় প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিমত্তায়। অনেক দেশে আদালত, সংসদীয় জবাবদিহি কাঠামো ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অন্তত কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে। বাংলাদেশে সেই ভারসাম্য রক্ষাকারী কাঠামোগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে।
জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
কনফারেন্স এর বক্তারা বলেন, ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সালের সংসদীয় গণতান্ত্রিক সময়ে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য তুলনামূলক বড় পরিসর ছিল। তবে শুধু আইন পরিবর্তন করলেই গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরবে না। গণমাধ্যমকে আবারও মানুষের আস্থা অর্জন করতে হলে পেশাদারিত্ব, তথ্যের নির্ভুলতা, নৈতিক সাংবাদিকতা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সবশেষে আলোচনায় একটি বিষয়েই সবাই একমত হন—গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের আস্থা। একই সাথে, টিআইবি মনে করে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো বিচ্ছিন্ন ইস্যু নয়; এটি গণতান্ত্রিক সুশাসনের মৌলিক অংশ। সাংবাদিকতা দুর্বল হয়ে পড়লে মানুষ নির্ভরযোগ্য তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়, জবাবদিহি কমে যায় এবং অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার বিস্তার আরও সহজ হয়ে ওঠে।