প্রকাশকাল: ০৮ মে ২০২৬
“কতজন সাম্প্রতিক সময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছেন?”
রাজধানীর রেডিসন ব্লু হোটেলে আয়োজিত বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬-এর প্রথম প্লেনারি সেশনে উপস্থিত শত শত সাংবাদিক, সম্পাদক, শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যম গবেষকের সামনে প্রশ্নটি ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল। হলরুমজুড়ে তখন এক ধরনের নীরবতা। খুব বেশি হাত ওঠেনি।
কিছুক্ষণ পর আরেকটি প্রশ্ন করা হয়—“কতজন টেলিভিশন বা অনলাইনে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দেখেছেন?”
এবার দৃশ্যটা ভিন্ন। অনেক হাত উঠল একসঙ্গে।
দুই প্রশ্নের উত্তরের এই পার্থক্যটাই যেন পুরো আলোচনার মূল সুর তৈরি করে দেয়। মানুষ এখনো সত্য উদঘাটনের গল্প দেখতে চায়, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা সাংবাদিকতা দেখতে চায়। কিন্তু সেই সাংবাদিকতা তৈরি করার বাস্তবতা দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
রাজধানীর রেডিসন ব্লু হোটেলে আয়োজিত বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স ২০২৬-এ নলেজ ও স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হিসেবে যুক্ত ছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে টিআইবি’র আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম খুব সরাসরি ভাষায় বলেন, “সত্য অনুসন্ধান এখন সবচেয়ে ব্যয়বহুল একটি কাজ।”
তার ভাষায়, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এখন শুধু একজন রিপোর্টারের শ্রমে সীমাবদ্ধ নয়। এর জন্য প্রয়োজন সময়, দক্ষতা, আইনি সুরক্ষা, ডেটা বিশ্লেষণের সক্ষমতা, সম্পাদকীয় সমর্থন এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বিনিয়োগ। অথচ বাস্তবতা হলো—অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানই এখন এই ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি অনুসন্ধান শেষ করতে যেখানে মাসের পর মাস সময় প্রয়োজন, সেখানে অনেক নিউজরুম অর্থনৈতিক চাপের কারণে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কাজ থামিয়ে দিতে বাধ্য হয়। ফলে ধীরে ধীরে ঝুঁকিতে পড়ে জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতা।
সাবেক বিবিসি সাংবাদিক শাকিল আনোয়ারের সঞ্চালনায় আয়োজিত এই আলোচনায় অংশ নেন ‘ডেইলি স্টার’-এর সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম, কানাডার পত্রিকা ‘টরন্টো স্টার’-এর সাবেক সম্পাদক মাইকেল কুক, পাকিস্তানের পত্রিকা ‘ডন’-এর সম্পাদক জাফর আব্বাস এবং ‘যমুনা টিভি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিম আহমেদ।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সংকট: সময় ও টিকে থাকা
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সবসময়ই সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। একটি তথ্য যাচাই করতে যেমন ধৈর্য লাগে, তেমনি প্রয়োজন আইনি সতর্কতা, দক্ষ জনবল এবং সম্পাদকীয় সাহস। কিন্তু বর্তমান নিউজরুম কাঠামো ক্রমশ দ্রুতগতির কনটেন্ট উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সাংবাদিকদের প্রতিদিন একাধিক সংবাদ জমা দেওয়ার চাপ থাকে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
মিডিয়া হাউজগুলোর এই বাস্তব বিষয়গুলোই আলোচনার একটি অংশজুড়ে উঠে আসে। মাহফুজ আনাম বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমে চাপ সবসময় সরাসরি আসে না। বরং এটি ধীরে ধীরে তৈরি হয় মালিকানার কাঠামো, বিজ্ঞাপন নির্ভরতা, রাজনৈতিক চাপ এবং সেন্সরড সম্পাদকীয়তার ভেতর দিয়ে। অনেক সময় কোনো সংবাদ নিষিদ্ধ করা হয় না; বরং সেটি প্রকাশ করাটাই “ঝুঁকিপূর্ণ” হয়ে ওঠে।
আলোচনার মাঝে মাইকেল কুক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সংকটের কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই নিউজরুম ছোট হয়ে যাচ্ছে, বাজেট কমছে, অভিজ্ঞ অনুসন্ধানী সাংবাদিকের সংখ্যা কমে আসছে। তবে বাংলাদেশের মতো দেশে অর্থনৈতিক দুর্বলতার সঙ্গে রাজনৈতিক চাপ যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অর্থসংকটে থাকা একটি নিউজরুমকে প্রভাবিত করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে পড়ে।
মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামও আলোচনায় বারবার একটি বিষয় তুলে ধরেন—শুধু ভালো ইচ্ছা দিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বাস্তব উদ্যোগ।
যখন একটি প্রতিবেদন বদলে দেয় বাস্তবতা
কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও আলোচনায় ফিরে ফিরে এসেছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা। ফাহিম আহমেদ যমুনা টিভির ‘এলপি গ্যাস খাত’ নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের উদাহরণ তুলে ধরেন। গ্যাসের মূল্য কারসাজি ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিয়ম নিয়ে প্রচারিত সেই প্রতিবেদন শুধু আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং প্রশাসনিক পর্যায়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরপরই শুরু হয়েছিল নীতিগত আলোচনা, পরিবর্তন এসেছিল বাজার ব্যবস্থাপনাতেও। ফাহিম আহমেদের মতে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রকৃত শক্তি এখানেই—এটি শুধু তথ্য প্রকাশ করে না, জনজীবনে বাস্তব প্রভাবও তৈরি করতে পারে।
কনফারন্সের আলোচকরা বলেন, বড় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন হঠাৎ করে তৈরি হয় না। এর পেছনে থাকে প্রতিবেদকের সময়, ধৈর্য, সম্পাদকীয় প্রতিশ্রুতি এবং প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর চাপ মোকাবেলার সক্ষমতা।
আইন, ভয় ও অদৃশ্য চাপের মধ্যে সাংবাদিকতা
দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকদের বাস্তবতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পাকিস্তানের “ডন” পত্রিকার সম্পাদক জাফর আব্বাস বলেন, সাংবাদিকরা এখন শুধু আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নেই; তারা আইনি ও ব্যক্তিগত ঝুঁকির মধ্যেও কাজ করছেন। মানহানি মামলা, সাইবার আইন, দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া—এসব অনেক সময় ন্যায়বিচারের জন্য নয়, বরং সাংবাদিকদের ক্লান্ত করে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মামলাই তখন শাস্তিতে পরিণত হয়।
জাফর আব্বাসের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে যেতে সাংবাদিকরা অনেক সময় নিজেরাই নিজেদের সীমাবদ্ধ করতে শুরু করেন। সরাসরি কেউ কিছু না বললেও ভয় ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে যায়।
আলোচনায় উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বর্তমান সময়ে কিভাবে সেন্সরশিপের ধরন বদলে গেছে। এখন অনেক সময় কোনো সংবাদকে প্রকাশ করতে থামিয়ে দেওয়া হয় না; বরং সেটিকে ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে অসংখ্য বিভ্রান্তিমূলক পাল্টা তথ্য বা অপতথ্য, অনলাইন আক্রমণ, কৃত্রিম বিতর্ক এবং তথ্যের অতিরিক্ত চাপ।
তথ্যের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে সত্য
মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আগে সেন্সরশিপ মানে ছিল তথ্য চেপে রাখা। এখন সেটি অনেক বেশি জটিল। আজকের দিনে সত্যকে থামানো হয় না সবসময়; বরং তার চারপাশে এত বেশি বিভ্রান্তিকর নিউজ তৈরি করা হয় যে মানুষ মূল বিষয় থেকে সরে যায়। পাল্টা প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরিত্রহনন, অ্যালগরিদম-নির্ভর বিভ্রান্তি—সব মিলিয়ে একটি সত্যভিত্তিক অনুসন্ধানও খুব দ্রুত জনদৃষ্টির বাইরে চলে যায়।
এ বিষয়ে মাইকেল কুক বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন ঠিক করে দেয় কোন সংবাদ মানুষ দেখবে, কতক্ষণ দেখবে, এবং আদৌ গুরুত্ব দেবে কি না। এদিকে, মাহফুজ আনাম বাংলাদেশের উদাহরণ টেনে বলেন, এখানে অনেক সময় অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জবাব তথ্য দিয়ে দেওয়া হয় না; বরং সাংবাদিককেই আক্রমণের কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। এতে মূল প্রতিবেদনটি আড়ালে চলে যায়।
অনুসন্ধানের চাপ, মানসিক ক্লান্তি আর টিকে থাকার লড়াই
আলোচনায় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার দক্ষতা সংকটও গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, আধুনিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য এখন প্রয়োজন আর্থিক ফরেনসিক বিশ্লেষণ, ডিজিটাল ভেরিফিকেশন, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ এবং সোর্স সুরক্ষার মতো দক্ষতা। কিন্তু অধিকাংশ নিউজরুম এখনো সেই ধরনের প্রশিক্ষণ কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি।
সীমান্ত পেরিয়ে যৌথ অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে আলোচনায়। বক্তাদের মতে, বিভিন্ন দেশের নিউজরুম একসঙ্গে কাজ করলে অনুসন্ধানকে চেপে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
মাইকেল কুক সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়েও গুরুত্ব দেন। দুর্নীতি, সহিংসতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে অনেক সাংবাদিক মানসিক ক্লান্তি ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে পড়ে যান। অথচ এই বিষয়টি নিয়ে নিউজরুমে খুব কম আলোচনা হয়।
সত্যভিত্তিক সাংবাদিকতা কোন পথে?
প্রথম দিনের প্রথম প্লেনারি সেশন শেষে আলোচনাটি শুধু সাংবাদিকতা নিয়ে ছিল না; ছিল একটি দেশের গণতান্ত্রিক বাস্তবতা নিয়েও। বাংলাদেশে অনুসন্ধান করার মতো গল্পের অভাব নেই। অভাব হচ্ছে সেই পরিবেশের, যেখানে সাংবাদিকরা ভয় ছাড়াই কাজ করতে পারবেন, প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদে এই কাজকে সমর্থন দিতে পারবে, এবং সত্য প্রকাশ করাকে এখনো জনস্বার্থের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখা হবে।
“সত্যভিত্তিক সাংবাদিকতা কোন পথে?” এই প্রশ্নটি হয়তো সাংবাদিকদের একার নয়। প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক এবং সাধারণ মানুষ—সবাই মিলে সত্যভিত্তিক স্বাধীন সাংবাদিকতাকে টিকিয়ে রাখতে আমরা আসলে কতটা প্রস্তুত?