প্রকাশকাল: ০৩ মে ২০২৬
গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা গণতান্ত্রিক শাসনের অন্যতম ভিত্তি। সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও জবাবদিহিমূলক শাসন-ব্যবস্থার জন্য দেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন গণমাধ্যম থাকা অপরিহার্য। একটি স্বাধীন, বহুমাত্রিক ও পেশাদার গণমাধ্যমই তথ্যভিত্তিক আলোচনা নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক বাস্তবতায় এই আলোচনা আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির বিস্তার, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রবাহের গতি বাড়লেও, একই সঙ্গে বেড়েছে বিভ্রান্তিকর ও অপতথ্যের বিস্তার, রাজনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তাহীনতা। ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু “গণমাধ্যম স্বাধীন কি না”—সেটিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং প্রশ্ন হলো, এমন একটি পরিবেশ আদৌ তৈরি হয়েছে কি না, যেখানে সাংবাদিকরা নির্ভয়ে, পেশাগত স্বাধীনতা বজায় রেখে কাজ করতে পারেন।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে এ বছর টিআইবি ও ইউনেসকোর যৌথ আয়োজনে "Rebuilding Public Trust: Media Independence and Democratic Accountability in Bangladesh" শীর্ষক যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার শিরোনামেই লুকিয়ে আছে দেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সংকটের স্বীকৃতি। ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এই আলোচনায় এই বাস্তবতাগুলো সামনে উঠে আসে। আলোচনায় যোগ দিয়েছিলেন সরকারের নীতিনির্ধারক, সম্পাদক, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং উন্নয়ন অংশীদাররা। আলোচনার পরিধি ছিল বিস্তৃত, কিন্তু কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি একটাই — গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের যে আস্থা বছরের পর বছর ধরে ক্ষয় হয়েছে, তা ফিরিয়ে আনা সম্ভব কিনা এবং সম্ভব হলে কীভাবে।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আগে বুঝতে হবে সমস্যাটা ঠিক কোথায়। বাংলাদেশে গণমাধ্যমের সংকটকে অনেকেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ক্ষণস্থায়ী ফল বলে মনে করতে চান — ভাবেন, সরকার বদলালে পরিস্থিতিও বদলাবে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক গভীরে। দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানা মূলত মুষ্টিমেয় কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর হাতে, যারা গণমাধ্যমকে দেখেন প্রভাব বিস্তার ও মুনাফা। এছাড়াও, আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, তথ্যের সততা, জনআস্থা এবং কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা। টিআইবির এই পুরো আয়োজন জুড়েই একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—গণমাধ্যমের বর্তমান সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক সমস্যা নয়; এটি গভীরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত।
স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া জবাবদিহি অসম্ভব
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি তথ্য ও সম্প্রচার খাত–সম্পর্কিত প্রধান উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, “বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া জবাবদিহিমূলক শাসন সম্ভব নয়।” তার মতে, গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করতে হলে শুধু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেই হবে না; সাংবাদিকদের পেশাগত সক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, গণমাধ্যমকে কার্যকর রাখতে সরকার, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজ—সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আলোচনায় আস্থার সংকটকে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা গণতন্ত্রের জন্য মৌলিক; এটি দুর্বল হলে জবাবদিহির কাঠামোও দুর্বল হয়ে পড়ে।”তার মতে, বর্তমানে সাংবাদিকদের অনেকেই এমন এক বাস্তবতায় কাজ করছেন, যেখানে আত্মনিয়ন্ত্রণ অনেক সময় টিকে থাকার কৌশলে পরিণত হচ্ছে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত না হলে নাগরিকের তথ্য জানার অধিকারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
অর্থনৈতিক চাপে সংকুচিত সম্পাদনাগত স্বাধীনতা
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের আলোচনায় উঠে আসে গণমাধ্যমের অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিষয়টিও। বক্তারা বলেন, আর্থিক অনিশ্চয়তা ও বিজ্ঞাপন নির্ভরতা অনেক সময় সম্পাদনাগত স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করে। যখন কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক স্বার্থের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সংবাদ নির্বাচনের ক্ষেত্রও সংকুচিত হতে থাকে। এর প্রভাব পড়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সমালোচনামূলক প্রতিবেদন এবং ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপর। আলোচনার প্যানেল পর্বে দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ ক্রমেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করছে। তার মতে, “গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুর্বলতা অনেক সময় সম্পাদনাগত আপসের দিকে ঠেলে দেয়।” বিজ্ঞাপন নির্ভরতা, মালিকানাগত প্রভাব এবং ক্ষমতার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক—সব মিলিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
নিরাপত্তাহীনতার ভেতর সংবাদচর্চা
মালিকানাগত ও অর্থনৈতিক চাপের বাইরেও সাংবাদিকতার ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলে রেখেছে বিদ্যমান আইনি পরিবেশ। বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ধারাবাহিকতায় প্রণীত সাইবার সিকিউরিটি আইন এখনও পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি, গ্রেপ্তার এবং ডিভাইস জব্দের সুযোগ রাখছে। একই সঙ্গে এটি সাংবাদিকদের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ফলে এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে আত্মনিয়ন্ত্রণ আর ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; বরং অনেক সাংবাদিকের জন্য তা টিকে থাকার কৌশলে পরিণত হচ্ছে। আলোচনায় বক্তারা মনে করেন, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপের কারণে অনেক সাংবাদিক সংবেদনশীল বিষয় এড়িয়ে চলতে বাধ্য হন। ফলে আত্মনিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে পেশাগত বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে ১৩০ জনের বেশি সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে রয়েছে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগও। এর মধ্যে অন্তত পাঁচজন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে।
এই সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছেন বাস্তব মানুষ—এমন সাংবাদিক, যাদের পেশাগত সিদ্ধান্ত, তথ্যসূত্র এবং অনুসন্ধানী কাজ এখন ক্রমশ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। কারণ তারা জানেন, একটি সমালোচনামূলক প্রতিবেদন কিংবা কোনো আলোচনায় অংশগ্রহণও ফৌজদারি মামলার ভিত্তি হয়ে যেতে পারে। নতুন সরকারের সময়েও এই ধরনের অভিযোগ ও মামলার ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকা কেবল আইনি ব্যর্থতার ইঙ্গিত নয়; বরং এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত অবস্থানের প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।
গণমাধ্যমে আস্থার সংকট গণতন্ত্রকেও দুর্বল করে
আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে জনআস্থার প্রশ্নটি। বক্তারা মনে করেন, রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও নাগরিকদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হলে শুধু সাংবাদিকতাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; দুর্বল হয়ে পড়ে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির কাঠামোও। ড. সুসান ভাইজ বলেন, “সাংবাদিকদের তাদের কাজ সঠিকভাবে করতে হলে শারীরিক ও পেশাগত—দুই ক্ষেত্রেই নিরাপদ বোধ করতে হবে।” তার মতে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে স্বাধীন সাংবাদিকতা টেকসই হতে পারে না এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকার। আলোচনায় আরও উঠে আসে, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপতথ্যের বিস্তার গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমিয়ে দিচ্ছে। ফলে শুধু সংবাদমাধ্যম নয়, সামগ্রিক গণতান্ত্রিক আলোচনাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বক্তারা মনে করেন, বিশ্বাসযোগ্য তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত না হলে সমাজে বিভাজন, বিভ্রান্তি এবং অবিশ্বাস আরও বাড়বে।
গণমাধ্যম সংস্কারে এখন প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ
বাংলাদেশে নিযুক্ত জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লটজ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাধীন গণমাধ্যমের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, শক্তিশালী গণমাধ্যম একটি দেশের জবাবদিহিমূলক কাঠামোকে কার্যকর করে। তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেন, তথ্যের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষায় বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (হিউম্যান রাইটস, ডেমোক্রেসি অ্যান্ড জেন্ডার ইকুয়ালিটি) পাওলা কাস্ত্রো নাইডারস্টাম বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকতার বিষয় নয়; এটি মানবাধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষার অন্যতম প্রধান শর্ত। তিনি মনে করেন, সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত না হলে নাগরিক অংশগ্রহণও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের আলোচনার সার্বিক বার্তা ছিল স্পষ্ট—গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো প্রতীকী প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে আইনি সংস্কার, অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, পেশাগত নিরাপত্তা এবং তথ্যের সততা—সবকিছুকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে এই প্রশ্নের ওপর—গণমাধ্যম কি নির্ভয়ে সত্য বলার পরিবেশ পাবে, নাকি চাপ, অনিশ্চয়তা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেই আটকে থাকবে।