ERF Training

অর্থনীতি খাতের সাংবাদিকবৃন্দের নিবিড় প্রশিক্ষণ: সরকারি ক্রয়চুক্তিতে স্বচ্ছতার সন্ধানে টিআইবি ও ইআরএফ এর মেলবন্ধন

প্রকাশকাল: ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫

গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী হলো সংবাদমাধ্যম, আর সেই পাহারায় শাণিত অস্ত্র হলো নিখুঁত ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য। যখন একজন সংবাদকর্মীর হাতে থাকে জটিল তথ্যের গূঢ় রহস্যভেদের চাবিকাঠি, তখন 'স্বচ্ছতা' কেবল একটি শব্দে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা পরিণত হয় দুর্নীতি প্রতিরোধের এক অমোঘ হাতিয়ারে। সরকারি ক্রয়খাতের বিশাল অংকের অর্থ যেখানে দুর্নীতির চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে, সেখানে তথ্যের শুদ্ধতা আর বিশ্লেষণের ক্ষুরধার লেখনীই পারে জনস্বার্থ রক্ষা করতে যা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন গণমাধ্যমকর্মীদের, বিশেষত, অর্থনীতি বিটে কর্মরত সাংবাদিকবৃন্দের সক্ষমতা বৃদ্ধি। গত ১৪ ডিসেম্বর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর উদ্যোগে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)-এর সদস্যদের জন্য আয়োজিত এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় ধ্বনিত হলো সেই অঙ্গীকারের সুর।

ধানমন্ডিস্থ টিআইবি কার্যালয়ে দিনব্যাপী আয়োজিত এই কর্মশালার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘উন্মুক্ত ডেটা এবং সরকারি ক্রয়চুক্তিতে স্বচ্ছতা’। দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমগুলোর ৪০ জন অর্থনীতি বিটের সাংবাদিক এই কর্মশালায় অংশ নেন। সরকারি ক্রয়ের বিশাল যজ্ঞে জনগণের করের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ডেটা বা তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার গুরুত্ব অপরিসীম। সরকারি ক্রয়খাতের সংখ্যাবহুল জটিলতাকে কীভাবে সাধারণ মানুষের বোধগম্য এবং কার্যকর প্রতিবেদনে রূপান্তর করা যায়, এবং এই খাতের দুর্নীতির স্বরূপ উন্মোচনে সাংবাদিকের করণীয় কি সেই বিষয়টি কেন্দ্র করে এই আয়োজন আবর্তিত হয়।

টিআইবির ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন বিশেষজ্ঞ কে এম রফিকুল আলম ও রিফাত রহমান এবং আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম নিপুণভাবে তুলে ধরেন সরকারি ক্রয়চুক্তির জটিল গোলকধাঁধা। প্রশিক্ষণে ড্যাশবোর্ড বিশ্লেষণ, ডেটা এক্সট্রাকশন এবং রিয়েল কেস স্টাডির মাধ্যমে দেখানো হয় কীভাবে দুর্নীতির অদৃশ্য সূচকগুলো শনাক্ত করা যায়। বিশেষ করে রাজনৈতিক সংযোগ, যোগসাজশের ধরন এবং সরকারি ক্রয়ের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ পর্যবেক্ষণের কৌশলগুলো ছিল সাংবাদিকদের জন্য এক নতুন দিশা।

প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকরা সেশনগুলোর উপযোগিতা নিয়ে পেশাগত উন্নয়নের জায়গা থেকে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। একজন প্রশিক্ষণার্থী সংবাদমাধ্যমের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে আক্ষেপের সুরে বলেন, “অনেক সময় গণমাধ্যমগুলো নিয়োগ দিয়েই দায় সারে, দক্ষতা বৃদ্ধিতে নজর দেয় না। টিআইবির এই সময়োপযোগী উদ্যোগ প্রতি ছয় মাস অন্তর আয়োজিত হলে আমরা তথ্যের আধুনিক প্রবাহের সাথে তাল মেলাতে পারব।” আরেকজন প্রশিক্ষণার্থী দৃঢ় কণ্ঠে জানান, এই প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান সরকারি ক্রয়খাতের অনিয়ম উন্মোচনে ‘ইন-ডেপথ’ বা গভীর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরিতে এক শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

অনুষ্ঠানে টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা ড. সুমাইয়া খায়েরের কণ্ঠে ঝরে পড়ে আশাবাদের সুর। তিনি বলেন, “নবীন ও প্রবীণ সাংবাদিকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ আমাকে অভিভূত করেছে। উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার হলো অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি। আপনাদের প্রতিটি বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন টিআইবির দুর্নীতিবিরোধী লড়াইকে আরও বেগবান করবে।”

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে তথ্যের অপরিহার্যতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “দুর্নীতি প্রতিরোধে টিআইবি একা কোনো দ্বীপ নয়; বরং সমাজ ও রাষ্ট্রকে সাথে নিয়ে আমাদের এই পথচলা। বর্তমান বিশ্ব ডেটানির্ভর, আর আমরাও তথ্যভিত্তিক অধিপরামর্শে বিশ্বাসী। সরকারি ক্রয়খাতের তথ্য বিশ্লেষণে সাংবাদিকদের দক্ষ করে তোলা আমাদের সামগ্রিক লক্ষ্যপূরণেরই একটি অংশ। সংবাদমাধ্যম হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের প্রধান সেনানী। দুর্নীতির চিত্র উন্মোচনেও ডেটার ব্যবহার অনস্বীকার্য। সেই বিবেচনায় গণমাধ্যমকর্মীদের ডেটাভিত্তিক সাংবাদিকতায় দক্ষ করে তুলতে, বিশেষ করে সরকারি ক্রয়চুক্তিসমূহের ডেটা বিশ্লেষণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এই প্রশিক্ষণ প্রভূত ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশাবাদি।”

তার সাথে সুর মিলিয়ে ইআরএফ-এর সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম এই আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীগুলো সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। এই প্রশিক্ষণ অর্থনীতি বিটের সাংবাদিকদের জন্য এক অমূল্য পাথেয় হিসেবে কাজ করবে, যা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মানকে করবে আরও সমৃদ্ধ।”

সমাপনী অধিবেশনে ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালা এক আবেগী ও যৌক্তিক বয়ান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “এই প্রশিক্ষণ সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী ক্ষুধার উদ্রেক করবে এবং দিনশেষে উপকৃত হবে সাধারণ নাগরিক কারণ সরকারি ক্রয়চুক্তিতে দুর্নীতি এমন একটি বিষয় যা সাংবাদিকদের আলোকপাত ব্যতীত অনেকাংশেই গোপন থেকে যায়। প্রতিটা সরকারি বেচাকেনা মানে আপনার আমার টাকা। করদাতাদের টাকা থেকেই কিন্তু সরকারি ক্রয়চুক্তি সম্পাদিত হয়, তাই এখানে নয়ছয় হলে আসলে আমাদের সবার সম্পদই নয়ছয় হচ্ছে।“ এই বিষয়গুলো সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে সাংবাদিকদের সক্ষমতা অধিকতর বৃদ্ধির জন্য তিনি ভবিষ্যতে ইআরএফ এবং টিআইবির আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমাপনী বক্তব্যে ইআরএফ সভাপতির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে ঘোষণা করেন, “অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রশ্নে ইআরএফ এর সদস্য সকল গণমাধ্যমকর্মীর পাশে থাকবে টিআইবি। যে কোনো প্রয়োজনে আমরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।”


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি