প্রকাশকাল: ১২ ডিসেম্বর ২০২৪
তথ্য এখন আর শুধু জ্ঞানের উৎস নয় এটি ক্ষমতার প্রতীক। দেশের নানা প্রান্তে মানুষ এখন তথ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রশ্ন করছে জানছে দাবি তুলছে। এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ এর মাধ্যমে। আর সেই আইনের বাস্তব রূপ দেখা গেছে নভেম্বর ২০২৪ জুড়ে সচেতন নাগরিক কমিটি সনাক আয়োজিত তথ্য মেলাগুলোতে।
সিলেটের ব্যস্ত রাস্তায় হোক বা খাগড়াছড়ির পাহাড়ঘেরা শহরে এসব তথ্য মেলা সরকারি সেবা সম্পর্কে সচেতন ও কৌতূহলী নাগরিকদের কাছে এক নতুন আশার আলো হয়ে উঠেছে।
সিলেটে মেলার উদ্বোধনকালে সরকারি কর্মকর্তারা তথ্য অধিকার আইনকে প্রশাসনিক জবাবদিহির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরেন। মেলায় অংশ নেয় সরকারি ও বেসরকারি বহু প্রতিষ্ঠান যারা দুই হাজারের বেশি নাগরিককে সরাসরি সেবা প্রদান করে। এটি দেখিয়ে দেয় যে তথ্যের অবাধ প্রবাহ সেবার মান উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি হতে পারে।
ফরিদপুরে আয়োজনটি ছিল উদ্ভাবনী ও অংশগ্রহণমূলক। টিআইবির ইয়ুথ এনগেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট ইয়েস সদস্যরা নেতৃত্ব দেন সচেতনতায় এবং সহায়তা করেন নাগরিকদের তথ্য অধিকার প্রয়োগে। কুইজ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বাড়ে উৎসাহ আর প্রায় সাত শতাধিক নাগরিক প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে বাড়ি ফেরেন।
প্রত্যেকটি জেলাই এই মেলাকে নিজেদের মতো করে রূপ দিয়েছে। সাভারে শুধু তথ্য সরবরাহ নয় ছিল গণশুনানি কুইজ এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন। শ্রীমঙ্গলে দুর্নীতিবিরোধী স্বাক্ষর অভিযান ও কার্টুন প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে তথ্য আদানপ্রদান এক সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়।
এই আয়োজনগুলো হয়ে উঠেছে ক্ষমতায়নের উন্মুক্ত মঞ্চ যেখানে নাগরিকরা সরাসরি প্রশ্ন তুলতে সেবা সম্পর্কে জানতে এবং আগ্রহের তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছেন। যে তথ্য একসময় আমলাতান্ত্রিক দেয়ালের আড়ালে ছিল তা এখন মেলার মাধ্যমে নাগরিকের নাগালে এসেছে।
স্থানীয় প্রশাসকরা এ যাত্রায় শুধু পর্যবেক্ষক নন বরং স্বচ্ছতার সক্রিয় চ্যাম্পিয়ন। জেলা প্রশাসকরা ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেছেন যে তথ্যের অবাধ প্রবাহ দুর্নীতি প্রতিরোধ ও সুশাসন নিশ্চিতে কতটা জরুরি। পিরোজপুরের মেলায় পরিষ্কার বার্তা ছিল তথ্যই দুর্নীতির প্রতিষেধক।
তথ্য মেলাগুলো শুধু তথ্য প্রদানের চ্যানেল নয় এগুলো হয়ে উঠেছে এক গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্র যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে জন্ম নিচ্ছে নতুন চিন্তা ও প্রত্যাশা। কুইজ প্রতিযোগিতা গণশুনানি কার্টুন প্রদর্শনী স্বাক্ষর অভিযান সব মিলিয়ে এগুলো এক উৎসবমুখর নাগরিক অংশগ্রহণের রূপ নিয়েছে।
কুষ্টিয়ায় বিআরটিএ সেরা সেবাপ্রদানকারী হিসেবে স্বীকৃতি পায় আর বরিশালে জেলা শিক্ষা অফিস প্রশংসিত হয় জনবান্ধবতা ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করায়।
ইয়েস সদস্যরা এসব আয়োজনের প্রাণভোমরা। মাদারীপুরে তারা নাগরিকদের তথ্যের আবেদন লিখতে সহায়তা করেন প্রক্রিয়া বোঝান এবং অধিকার জানাতে উদ্বুদ্ধ করেন। কিশোরগঞ্জে মেলায় এক হাজারেরও বেশি মানুষ সেবা সংক্রান্ত তথ্য পান। সেখানকার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের গণশুনানিতে তোলা সমস্যার উত্তর দেয় কর্তৃপক্ষ এবং সেবার মান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেয়।
ময়মনসিংহে বিআরটিএ পাসপোর্ট অফিস জেলা রেজিস্ট্রার ও শিক্ষা অফিস মেলায় অংশ নিয়ে তথ্য প্রদান করে এবং নাগরিকদের প্রশ্নের জবাব দেয়।
বাংলাদেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এসব আয়োজন প্রমাণ করেছে নাগরিক সম্পৃক্ততার অসাধারণ সম্ভাবনা। তথ্যই সমাজের চেহারা বদলে দিতে পারে এবং তথ্য মেলাগুলো সেই পরিবর্তনের গতিপথ নির্ধারণ করছে। উন্মুক্ত তথ্যের শক্তিকে হাতিয়ার করে নাগরিকরা এখন গড়ে তুলছেন জবাবদিহিমূলক দুর্নীতিমুক্ত একটি ভবিষ্যৎ।