প্রকাশকাল: ০৩ নভেম্বর ২০২৪
বরগুনার এক সরকারি দপ্তরে সকাল থেকেই ভিন্ন এক দৃশ্য। সরকারি কর্মকর্তা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি একসঙ্গে বসেছেন একই টেবিলে। পরিচয়ের ভেদাভেদ নেই, তাদের উদ্দেশ্য একটাই, দুর্নীতিমুক্ত, জনবান্ধব ও কার্যকর সরকারি সেবা নিশ্চিত করা। এই চিত্র শুধু বরগুনায় নয়। সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দেশের নয়টি জেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন কর্মশালা, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি খাত একসঙ্গে বসে কাজ করেছে সমাধান খুঁজতে। এটি কেবল একটি প্রকল্প নয়, বরং সরকারি সেবায় দীর্ঘদিনের দুর্নীতির অবসান ঘটাতে এক বাস্তব ও সাহসী পদক্ষেপ।
ভেঙে পড়ছে দুর্নীতির দেয়াল, গড়ে উঠছে নতুন সংযোগ
দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি সরকারি সেবা খাতকে জর্জরিত করেছে। নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য দেয়াল। এই কর্মশালাগুলো সেই দেয়াল ভাঙার প্রতীক হয়ে উঠেছে। জেলা প্রশাসন ও সচেতন নাগরিক কমিটি বা সনাকের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মশালাগুলোতে সরকারি, বেসরকারি, সুশীল সমাজ ও সাধারণ নাগরিক সবাই একত্রে বসে পরিকল্পনা করেছেন সেবার মান উন্নয়নে। ৩৮৫টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ২৯টি বেসরকারি সংস্থার সক্রিয় অংশগ্রহণ এই প্রচেষ্টাকে একটি বিস্তৃত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপ দিয়েছে।
এই কর্মশালাগুলো কেবল আলোচনার জায়গা নয়। এখানে গড়ে উঠেছে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে বাস্তবভিত্তিক ও যৌথ পরিকল্পনার ভিত্তি।এই কর্মশালার শক্তি এর অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোয়। যেখানে:
- সরকারি কর্মকর্তারা দিয়েছেন নীতিগত দিকনির্দেশনা ও প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা
- বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা এনেছেন বাস্তব দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তা
- সুশীল সমাজ তুলে ধরেছে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও জনসম্পৃক্ততা
- সাধারণ নাগরিকরা জানিয়েছেন তাঁদের প্রত্যাশা ও মতামত
টিআইবির সিভিক এনগেজমেন্ট বিভাগের কোঅর্ডিনেটর কাজী শফিকুর রহমান বলেন, "আধুনিক সুশাসনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একত্রে কাজ করতেই হবে, এতে জনগণের আস্থা ফিরবে।" তার সহকর্মী মো. আতিকুর রহমান বলেন, "পরিবর্তনের জন্য চাই সর্বস্তরের অংশগ্রহণ। সরকারি, বেসরকারি এবং সুশীল সমাজকে একসঙ্গে নিয়েই সামনে এগোতে হবে।"
পরিকল্পনা নয় শুধু, বাস্তবায়নই সাফল্যের চাবিকাঠি
এই কর্মশালাগুলোর বড় সাফল্য এর বাস্তব পরিকল্পনায়। নীলফামারী, খুলনা, বগুড়ার মতো জেলাগুলোর অংশগ্রহণকারীরা কেবল আলোচনা করেননি, বরং হাতে-কলমে এমন পরিকল্পনা তৈরি করেছেন যা বাস্তবে প্রয়োগযোগ্য এবং স্থানীয় পর্যায়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ তৈরি করছে।
টিআইবির ক্লাস্টার কোঅর্ডিনেটর মো. ফিরোজ উদ্দিন বলেন, "যখন আমরা সরকারি কাঠামোর নাগাল ও বেসরকারি খাতের সক্ষমতাকে একত্র করি, তখনই সত্যিকারের জনবান্ধব সেবা ব্যবস্থা তৈরি সম্ভব হয়।"
সাফল্যের ভিত্তি হিসেবে কর্মশালায় চিহ্নিত কিছু উপাদান-
i. যৌথ পর্যবেক্ষণ ও তদারকি কমিটি গঠন;
ii. অভিন্ন কর্মক্ষমতা সূচক নির্ধারণ;
iii. নাগরিক মতামতের জন্য নিয়মিত প্রতিক্রিয়া চ্যানেল;
iv. সরকারি-বেসরকারি খাতের মধ্যে প্রযুক্তিগত সহায়তা বিনিময়
v. নৈতিক নেতৃত্বে সমন্বিত কমিটি গঠন
সমন্বয় কঠিন, কিন্তু সম্ভাবনা উজ্জ্বল
এই অংশীদারিত্বের পথ নিঃসন্দেহে জটিল। এখানে নতুন চিন্তা, কাঠামো এবং মানসিকতার প্রয়োজন রয়েছে। তবে অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা বলছে, যখন দায়িত্ব ভাগ হয়, প্রভাব আরও জোরালো হয়। একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, "দুর্নীতি শুধু প্রাতিষ্ঠানিক নয়, এটি সামাজিক সংকটও। তাই প্রতিরোধের পথও হতে হবে সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক।"
এই কর্মশালাগুলো শেষ হয়েছে একটি বাস্তব মডেল রেখে, যা স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবায় পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা হতে পারে। এই উদ্যোগের বার্তা স্পষ্ট, সততা, দক্ষতা ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে আমরা একটি দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে পারি।
'নতুন বাংলাদেশ' এখন কেবল স্বপ্ন নয়, বরং অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এক বাস্তব সম্ভাবনা। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব আর কোনো বিকল্প নয়, বরং ভবিষ্যতের একমাত্র পথ।