তথ্য অধিকার সম্মেলন ২০২৬

প্রকাশিত তথ্য কখন জবাবদিহির হাতিয়ার হয়ে ওঠে?

প্রকাশকাল: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জনস্বার্থের তথ্য পেতে একজন নাগরিককে কেন বারবার আবেদন করতে হবে? যে তথ্য জনসমক্ষে থাকার কথা, সেটি নিয়মিত হালনাগাদ করে সহজে খুঁজে পাওয়ার মতো করে প্রকাশ করাই তো প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। কিন্তু ওয়েবসাইটে তথ্য তুলে দিলেই কি সেই দায়িত্ব শেষ? জনগণ যদি তা খুঁজে না পায়, বুঝতে না পারে কিংবা কাজে লাগাতে না পারে, তাহলে তথ্য প্রকাশিত হয় ঠিকই, জবাবদিহি তৈরি হয় না।

“আন্তর্জাতিক তথ্য জানার অধিকার” দিবস উপলক্ষে ঢাকায় আয়োজিত ‘তথ্য অধিকার সম্মেলন ২০২৬’-এ ঘুরেফিরে এসেছে এসব প্রশ্ন। তথ্য অধিকার ফোরাম আয়োজিত দিনব্যাপী এ সম্মেলনে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, তথ্য অধিকারকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা আলোচনা করেন। তথ্য অধিকার ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনামের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সম্মেলন শুরু হয়।

উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কার্যকর তথ্য অধিকার ব্যবস্থার জন্য শুধু আইন ও প্রতিষ্ঠান থাকাই যথেষ্ট নয়; জনগণ যেন সেই অধিকার বাস্তবে ব্যবহার করতে পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য তথ্য কমিশনে নিরপেক্ষ নিয়োগ, তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিধানগুলোর পর্যালোচনা এবং তথ্য পাওয়ার পথে আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, নাগরিককে জানতে হবে কীভাবে তথ্য চাইতে হয় এবং তথ্য দিয়ে কীভাবে জবাবদিহির প্রশ্ন তুলতে হয়! একইভাবে, সরকারি প্রতিষ্ঠানকেও তথ্য দেওয়াকে অনুগ্রহ নয়, নিয়মিত দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। তথ্য অধিকার আইনটি তখনই জনগণের কাজে দেবে, যখন নাগরিক তথ্য চাইতে ও ব্যবহার করতে পারবেন এবং প্রতিষ্ঠানসমূহও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য নিজ উদ্যোগে প্রকাশ করবে।

উদ্বোধনী পর্ব শেষে প্রকাশ করা হয় ‘বাংলাদেশ তথ্য অধিকার জরিপ ২০২৬: ফলাফল ও করণীয়’ প্রতিবেদন। এরপর দিনের আলোচনা এগিয়ে চলে তথ্য অধিকারের ব্যবহারিক দিকগুলোর ওপর আলোকপাতের মধ্য দিয়ে। চারটি প্ল্যানারি অধিবেশনের একটি ছিল ‘ই-গভর্ন্যান্স ও স্বতঃপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের গুরুত্ব’। সেই অধিবেশনের আলোচনা শুধু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তথ্য সীমাবদ্ধ রাখার মধ্যে থেমে থাকেনি। অধিবেশনের মূল প্রশ্নই ছিল - ডিজিটাল ব্যবস্থা নাগরিককে সময়মতো প্রয়োজনীয় তথ্য দিচ্ছে কী না এবং সেই তথ্য তিনি সহজে বুঝতে ও ব্যবহার করতে পারছেন কী না?

“গোপনীয়তা যত বেশি, দুর্নীতির সুযোগও তত বড়” - এ বিষয়টি তুলে ধরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, স্বতঃপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ সরকারি প্রতিষ্ঠানকে গোপনীয়তার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে উন্মুক্ততার চর্চায় নিয়ে যেতে পারে। সরকারি প্রতিষ্ঠান জনগণের সম্পদ পরিচালনা করে। সেই সম্পদ কোথায় ও কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা জানার অধিকার তাই জনগণের রয়েছে।

এছাড়াও, প্রকাশিত তথ্য কীভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারে, টিআইবির কাজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন ড. জামান। তিনি বলেন, “নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে টিআইবি কয়েকটি নির্বাচনে তাঁদের আয় ও সম্পদের পরিবর্তন তুলে ধরতে পেরেছে। একইভাবে, ছয় লাখের বেশি সরকারি ক্রয়চুক্তি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাত্র ৫ শতাংশ ঠিকাদার ৬০ শতাংশের বেশি চুক্তি পেয়েছেন। এসব তথ্য সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় কাজের কেন্দ্রীভূত অবস্থার একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে তুলে ধরেছে।“

তবে তথ্য প্রকাশ জবাবদিহির শুরু, শেষ নয়। প্রকাশিত তথ্য থেকে অসংগতি বা অনিয়মের ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে; এরপর সেই তথ্য যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদারকি ও প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে টিআইবির কাজের উদাহরণ দিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান আরো বলেন, “প্রকাশিত তথ্য যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে তা প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধান ও পরবর্তী পদক্ষেপের ভিত্তি হতে পারে।“

ডিজিটাল ব্যবস্থায় তথ্য নাগরিকের কাজে লাগতে হলে তা সহজে পাওয়া, নিয়মিত হালনাগাদ এবং ব্যবহারযোগ্য হওয়া জরুরি। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. সাদিয়া শারমিন বলেন, “সরকারি ডিজিটাল ব্যবস্থায় স্বতঃপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ নিয়মিত চর্চার অংশ হলে নাগরিককে একই তথ্যের জন্য বারবার আবেদন করতে হবে না। তবে শুধু তথ্য আপলোড করলেই হবে না; তা এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে জনগণ সহজে খুঁজে, বুঝে ও ব্যবহার করতে পারে।“

আবার অনলাইনে তথ্য আছে মানেই তা সবার কাছে পৌঁছে গেছে, এমনটি ধরে নেওয়ারও সুযোগ নেই। এই বিষয়ে। বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম বজলুর রহমান বলেন, “দেশের জনগণের একটি বড় অংশের ডিজিটাল সুবিধা এখনো সীমিত। তাই তথ্য কোন মাধ্যমে এবং কীভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যাঁদের জন্য তথ্য, তাঁদের ব্যবহারযোগ্য মাধ্যমে সেটি পৌঁছানো না গেলে অনলাইনে তথ্যের পরিমাণ বাড়বে, কিন্তু নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়বে না।“

আলোচনার বিভিন্ন দিক মিলিয়ে আইসোশ্যালের নির্বাহী চেয়ারপারসন ও অধিবেশনের সঞ্চালক ড. অনন্য রায়হান বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও উন্মুক্ত তথ্য তখনই অর্থবহ, যখন নাগরিক সেই তথ্য বুঝতে পারেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন এবং সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। অধিবেশনে আরও অংশ নেন ‘নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড’-এর ডেপুটি টিম লিডার ক্যাথারিনা কোনিগ।

আলোচনা শেষে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, তথ্য কতটা প্রকাশিত হচ্ছে, তার পাশাপাশি দেখতে হবে সেটি কার কাছে পৌঁছাচ্ছে এবং কী কাজে লাগছে। তথ্য যতটা সম্ভব উন্মুক্ত রাখা এবং খুব প্রয়োজন ছাড়া কিছু গোপন না করার নীতি তখনই কাজে দেবে, যখন জনগণ প্রকাশিত তথ্য খুঁজে পাবে, বুঝতে পারবে এবং তা ব্যবহার করে প্রশ্ন তুলতে পারবে! আর সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুত থাকলেই জানার অধিকার সত্যিকার অর্থে জবাবদিহির হাতিয়ার হয়ে উঠবে।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি