প্রকাশকাল: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দুর্নীতি দমনে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সাফল্য অর্জনে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারে পারস্পরিক সহযোগিতা ও পরিপূরক ভূমিকা অব্যাহত রাখবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গত ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সোমবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয়ে নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ও কমিশনারবৃন্দের সঙ্গে টিআইবির সৌজন্য সাক্ষাৎ ও শুভেচ্ছা বিনিময় সভায় এ প্রত্যয় করেন সংস্থা দুটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
সভায় সূচনা বক্তব্যে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি প্রতিরোধে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে ২০০৪ সালে দুদক প্রতিষ্ঠায় টিআইবির অনবদ্য ভূমিকা ছিলো। দুদক আইনের খসড়াও টিআইবি তৈরি করেছিলো। দুদকের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই নীতিগত ও কৌশলগত সহায়তায় টিআইবির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, যা এখনো চলমান। টিআইবি একদিকে যেমন দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক উৎকর্ষ অর্জনে কারিগরি সহায়ত প্রদানে সচেষ্ট থাকবে, তেমনি জনআস্থা বৃদ্ধিতে দুদকের ঘাটতি তুলে ধরে গঠনমূলক সমালোচনাও অব্যাহত রাখবে।
দুদকের চেয়ারম্যান বিচারপতি এ. কে. এম. আসাদুজ্জামান বলেন, দুদক ও টিআইবি একে অপরের পরিপূরক। সংস্থা দুটির কাজের উদ্দেশ্য এক। আর সেটি হলো- সমাজ থেকে দুর্নীতি হ্রাস করে নাগরিকদের জন্য একটি স্বচ্ছ সমাজব্যবস্থা তৈরি করা। তবে দুদকের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, সক্ষমতায় ঘাটতি আছে। তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে দুদক অনেক কিছুই করতে পারে না। টিআইবির মতো প্রতিষ্ঠান ও জনগণের সহযোগিতা না পেলে দুদক কিছুই ঠিক করতে পারবে না। দুদক চেষ্টা করছে জনআস্থা তৈরি করতে, যাতে মানুষ মনে করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদক তাদের পাশে আছে। এসময় তিনি অর্থ পাচার এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনতে টিআইবির সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। দুদক ও টিআইবির মধ্যে চলমান সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী প্রত্যাশিত সকল যৌথ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথাও জানান তিনি।
টিআইবি দুদকের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে এককভাবে একটি এবং দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্নীতি দমনে ক্রিয়াশীল অন্যান্য সরকারি সংস্থাসমূহের সাথে তুলনামূলক বিশ্লেষণভিত্তিক আরেকটিসহ দুদকের সক্ষমতা ও কার্যক্রম বিষয়ে দুইটি মূল্যায়ন গবেষণা করেছে জানিয়ে টিআইবির উপদেষ্টা- নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের বলেন, ‘দুদক চাইলে বর্তমান নেতৃত্বের কাজের সুবিধার জন্য সেগুলো নিয়ে অধিপরামর্শ করতে পারে টিআইবি। এটি দুদকের বর্তমান অবস্থা ও করণীয় সম্পর্কে একটি ভিত্তি হতে পারে, যার আঙ্গিকে বর্তমান নেতৃত্ব দুদককে আরো গতিশীল করতে করণীয় নির্ধারণ করতে পারবে।’ এ বিষয়ে দুদক চেয়ারম্যান ইতিবাচক সাড়া দেন এবং এজন্য আলাদা একটি ফোরাম করে তার মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আশা প্রকাশ করেন।
সভায় দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানে গুণগত মান উন্নয়ন এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে মাঠপর্যায়ে প্রত্যক্ষ প্রভাব তৈরিতে গুরুত্ব দিয়ে দুদক ও টিআইবি অনতিবিলম্বে নিম্নলিখিত যৌথ কার্যক্রম পরিচালনায় একমত হয়।
- দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ: টিআইবি নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী দুদকের বাছাইকৃত অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাদের নিয়ে ডিজিটাল ফরেনসিক ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিষয়ে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের আয়োজন করবে। এই প্রশিক্ষণে অভিযোগ বাছাই, কৌশলগত তদন্ত পরিকল্পনা ও মৌলিক হিসাববিজ্ঞানে দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ থাকবে।
- যৌথ গণশুনানি: চলমান সমঝোত স্মারক অনুযায়ী জনভোগান্তি কমাতে নিয়মিত যৌথ গণশুনানি আয়োজনে একমত হয় উভয় প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে যথানিয়মে আলোচনা করে কার্যক্রম বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করা হয়।
- দুর্নীতিবিরোধী দিবস উদযাপন: আগামী ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উভয় সংস্থার যৌথ অংশীদারিত্বে উদযাপনের সুযোগ খতিয়ে দেখে উদ্যোগ গ্রহণের প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।
সভায় উভয় প্রতিষ্ঠানের এই সুনির্দিষ্ট যৌথ কার্যক্রমের অঙ্গীকার দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যকে আরও গতিশীল ও ত্বরান্বিত করবে এবং পেশাদারি সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জনগণকেন্দ্রিক নানা যৌথ প্রয়াস দুদকের প্রতি জনআস্থা আরো বাড়িয়ে তুলবে জানিয়ে টিআইবির পক্ষ থেকে দুদককে দ্রুততম সময়ে নিম্নলিখিত উদ্যোগসমূহ গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়। সেগুলো হলো-
- হটলাইন: দুদকের হটলাইন ১০৬-এর কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে সক্ষমতা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং এর পরিধি বৃদ্ধি করা।
- সংস্কার উদ্যোগ: কমিশনের প্রতি সর্বসাধারণের আস্থা পুনরুদ্ধারে এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তা নিশ্চিতে দৃশ্যমান কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং দুদক সংস্কার কমিশনের যেসব সুপারিশ সংস্থাটি এককভাবে বাস্তবায়নে সক্ষম, সেগুলো দ্রুত কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ।
- ফাঁদ মামলা: ফাঁদ মামলার মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম বৃদ্ধি ও অব্যাহত রাখা।
এসময় দুদকের পক্ষ থেকে দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারগণ জানান, যে তারা এ বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক এবং ইতিবাচক। দুদক এক্ষেত্রে নিম্নলিখিত কর্মকান্ড ও উদ্যোগের বিষয়ে আলোচনা ও প্রত্যাশা ব্যক্ত করে-
- ভূমি নামজারির মতো সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র বাছাই করে মাইক্রো লেভেলে টিআইবির গবেষণা ও পলিসি ব্রিফ ব্যবহার করে আরো বিস্তারিত গবেষণা করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহকে দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর পলিসি পরামর্শ প্রদান করা।
- দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বিস্তারিত যাচাই-বাছাই করে দুদকের সক্ষমতা বাড়াতে টিআইবির সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করা।
- প্রাতিষ্ঠানিক দূর্বলতা অতিক্রম করে কমিশনের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করার জন্য নাগরিক সমাজের অংশীদারিত্ব ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় বাহ্যিক কারিগরি সমর্থন গ্রহণ অব্যাহত রাখা।
সভায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক, উপদেষ্টা- নির্বাহী ব্যবস্থাপনা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, সিভিক এনগেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক ফারহানা ফেরদৌস, আউটরিচ ও কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এবং একই বিভাগের উপসমন্বয়ক জাফর সাদিক। দুদকের পক্ষে চেয়ারম্যান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন কমিশনার (তদন্ত) ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, কমিশনার (অনুসন্ধান) ড. মোঃ সাজ্জাদ হোসেন ভুঁইয়া, সচিব মোঃ সাইদুর রহমান খান, মহাপরিচালক (প্রশাসন) আবু হেনা মোস্তফা জামান, মহাপরিচালক (বিশেষ তদন্ত) মীর মোঃ জয়নুল আবেদিন শিবলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।