প্রকাশকাল: ১৪ জুন ২০২৬
সকালে যখন অনেক শিশু স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়, তখন আরেক দল শিশু শহরের ডাম্পসাইট, সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন কিংবা রাস্তার পাশে প্লাস্টিক, কাচ আর ধাতুর টুকরো খুঁজে বেড়ায়। তাদের হাতে বই নয়, থাকে বর্জ্যের বস্তা; দিনের শুরু হয় শ্রেণিকক্ষে নয়, ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশে। প্রশ্ন হলো—এমন বাস্তবতা কি অনিবার্য? নাকি এটি এমন একটি সমস্যা, যা কার্যকর নীতি, জবাবদিহি এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে বদলে দেওয়া সম্ভব?
বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে শিশুশ্রম এখনও সেই কঠিন বাস্তবতারই একটি প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২ অনুযায়ী দেশে প্রায় ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু শ্রমে নিয়োজিত, যার মধ্যে ১০ লাখেরও বেশি শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত। বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ সেই ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর অন্যতম। আইন ও নীতিতে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিস্তার, দুর্বল নজরদারি এবং বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে এই খাতে শিশুশ্রম এখনও উদ্বেগজনক বাস্তবতা হয়ে রয়েছে।
কিন্তু এই বাস্তবতা বদলাবে কীভাবে? শুধু আইন প্রণয়ন করলেই কি শিশুশ্রম বন্ধ হবে, নাকি প্রয়োজন স্থানীয় পর্যায়েও জবাবদিহি, নজরদারি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলা? টিআইবি মনে করে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে শিশুশ্রম নির্মূল করতে হলে সমস্যার মূল কারণগুলোকে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। অপ্রাতিষ্ঠানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ভেতরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতা এবং নাগরিক সচেতনতা—সবকিছুকেই একই সঙ্গে শক্তিশালী করতে হবে।
এই পরিবর্তন একদিনে আসবে না। তবে প্রতিটি নীতি, প্রতিটি জবাবদিহির দাবি এবং প্রতিটি স্থানীয় উদ্যোগ সেই পরিবর্তনের পথকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। টিআইবির এই কর্মসূচিও সেই পথচলারই অংশ—যেখানে লক্ষ্য শুধু শিশুশ্রম কমানো নয়, এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ বর্জ্যের স্তূপে নয়, বিকশিত হবে শিক্ষা, নিরাপত্তা ও সম্ভাবনার আলোয়।
এই লক্ষ্য সামনে রেখেই, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ঘোষিত World Day Against Child Labour 2026-এর বৈশ্বিক প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে টিআইবি দেশের সকল সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর মাধ্যমে "বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শিশুশ্রমকে লাল কার্ড" কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। র্যালি ও পৌর প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি ছিল সেই বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ, যার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারক, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে শিশুশ্রম নির্মূলে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
টিআইবি মনে করে, শিশুশ্রম নির্মূলে শুধু জাতীয় পর্যায়ের নীতিগত সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়; স্থানীয় সরকার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যুক্ত প্রতিষ্ঠান, সেবা প্রদানকারী সংস্থা এবং নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই পৌর প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান ছিল শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নয়; বরং স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ, জবাবদিহি জোরদার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে শিশুশ্রম প্রতিরোধে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান। যেনো কোনো শিশুকে জীবিকার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নামতে না হয়। এই উদ্যোগের সাফল্য শুধু কতটি সুপারিশ বাস্তবায়িত হলো, তা দিয়ে মাপা যাবে না। সত্যিকারের সাফল্য হবে সেদিন, যেদিন জীবিকার খোঁজে কোনো শিশুকে আর বর্জ্যের স্তূপে নামতে হবে না।