দুর্নীতিবিষয়ক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ফেলোশিপ ২০২৫

নির্ভীক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: জনগণের প্রতি সাংবাদিকদের দায়িত্ব

প্রকাশকাল: ০২ এপ্রিল ২০২৬

২০১২ সাল থেকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রদত্ত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ফেলোশিপ দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের অন্যতম শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রতি বছর এর মাধ্যমে দুর্নীতিবিষয়ক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির জন্য বাছাইকৃত সাংবাদিকদের আর্থিক প্রণোদনা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শদাতা বা মেন্টর এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদান করা হয়। ২০২৫ সালে প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাঁচজন সাংবাদিক জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা থেকে এমন কিছু প্রতিবেদন তৈরি করেছেন যেগুলো বাংলাদেশের সবচেয়ে গভীরে প্রোথিত দুর্নীতির স্বরূপ তুলে ধরেছে। পিরোজপুরের ভুয়া সেতু থেকে শুরু করে সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের চুরি পর্যন্ত নানা বিষয় উঠে এসেছে এসব প্রতিবেদনে।

এ বছর মনোনীত ফেলোরা ব্যক্তিগত ও পেশাদার ঝুঁকি নিয়ে একাধিক দুর্নীতির গোপন নকশা উন্মোচন করেছেন। আজ টিআইবির ঢাকা কার্যালয়ে সেই পাঁচজন বিজয়ীর মধ্যে সনদ ও ক্রেস্ট বিতরণ করা হয়। তাদের প্রস্তুতকৃত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো:

ডেইলি সান পত্রিকার সিনিয়র স্টাফ করেসপনডেন্ট রাশেদুল হাসান এর প্রতিবেদনটি ছিল পৌরসভা পর্যায়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম সংক্রান্ত। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৫টির মধ্যে ৪টি পৌরসভা ব্যয়বহুল সমন্বিত বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট ব্যবহার করছে না যার ফলে শত শত কোটি টাকা অপচয় হয়েছে এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য নিষ্কাশন বনভূমি ও জলাশয় দূষিত করে চলেছে।

প্রতিবেদনের লিংক:

‘পৌরসভাগুলোতে উন্নত প্রক্রিয়াকরণ প্ল্যান্ট ও যানবাহন বহরে কোটি কোটি টাকা খরচ করা হলেও দুর্বল পরিকল্পনার কারণে সেগুলো একেবারে অকেজো হয়ে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বসুরহাটে স্থাপনাগুলো তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে আর খালগুলো আবর্জনায় ভরে গেছে; গাজীপুরে একটি প্ল্যান্টে যাওয়ার কোনো রাস্তাই নেই; এবং সিলেটে এগারোটি দামি ট্রাকের জন্য আছেন মাত্র একজন চালক। এই সমন্বয়হীনতা গুরুত্বপূর্ণ স্যানিটেশন অবকাঠামোকে দামি 'শোপিসে' পরিণত করেছে, যা যে দূষণ রোধ করার জন্য তৈরি হয়েছিল তা নিরসনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ,’ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন এবং প্রতিবেদনগুলো যথাযথভাবে প্রকাশ ও সার্বিক সহায়তার জন্য টিআইবি এবং ডেইলি সান কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

জাগোনিউজ২৪-এর স্টাফ করেসপনডেন্ট মুহাম্মদ সালাহ উদ্দিন সরকারি হাসপাতালের সরঞ্জাম ক্রয়ের একটি অবৈধ চক্র উন্মোচন করেছেন। বিনামূল্যে দেওয়া ডায়াগনস্টিক মেশিনকে ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করে বাজারমূল্যের পাঁচগুণ দামে রিএজেন্ট বিক্রি করে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার বাজেট থেকে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনটিতে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনের লিংক:

সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘এটি একটি দীর্ঘ যাত্রা ছিল। সোর্স তৈরি করতে গিয়ে এবং একজন তথাকথিত 'অপরাধীর' পরামর্শে এই প্রতিবেদনের ধারণাটি আমার মাথায় আসে। আমার মনে হচ্ছে, গত ১২ বছরে আমি যে সাংবাদিকতা করেছি সেটা আসলে কিছুই ছিল না; এই একটি প্রতিবেদনেই আমি আমার সর্বোচ্চটুকু ঢেলে দিয়েছি।’ তিনি তাঁর মেন্টরের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান এবং বলেন, "টিআইবিকে ধন্যবাদ জানাই। আপনারা সাংবাদিকতার জন্য যে গাইডেন্স দেন, সেটাই প্রকৃত সাংবাদিকতা। এটা অব্যাহত থাকলে আমরা এবং দেশ উভয়েই উপকৃত হব।’

চ্যানেল ২৪-এর বিশেষ প্রতিবেদক মোঃ ইমদাদুল হক এর প্রতিবেদন অনুযায়ী একজন সাবেক সংসদ সদস্যের ছত্রছায়ায় থাকা ঠিকাদাররা পিরোজপুরে ২০০টি সেতুর জন্য প্রতারণামূলকভাবে ৩৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। অথচ, এই সেতুগুলো বাস্তবে নির্মিতই হয় নি!

প্রতিবেদনের লিংক:

স্টার নিউজ-এর স্টাফ করেসপনডেন্ট মোহাম্মদ ওমর ফারুক উন্মোচন করেছেন কিভাবে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি ফায়ারিং রেঞ্জ অপ্রকাশিত নগদ অর্থের বিনিময়ে সংরক্ষিত মধুপুর শালবনের ২৮০ একর জমি অবৈধভাবে ইজারা দিয়েছে।

প্রতিবেদনের লিংক:

ফারুক বলেন, ‘এই স্টোরিটিতে প্রচুর পরিমাণে এবং অত্যন্ত সুসংগঠিত ডেটা ছিল। আমার বিশ্বাস ছিল, প্রতিবেদনটি যদি নিচ্ছিদ্রভাবে এবং তথ্যসমৃদ্ধ করে তৈরি করা যায়, তবে কোনো সমস্যা হবে না। নির্বাচনের আগের সময়টাকে আমরা একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়েছি। স্টোরিটি প্রচার হওয়ার পর আমি জানতে পেরেছি যে, এটি নিয়ে আইএসপিআর এর অভ্যন্তরে আলোচনা হয়েছে। তারা কিছুটা বিব্রত বোধ করেছেন এবং প্রতিবেদনটির নেপথ্যে কারা আছে, তা নিয়েও তারা খোঁজখবর নিয়েছেন। আমরা সবাই মিলে একটি মানসম্মত প্রতিবেদন করার এই সুযোগটি গ্রহণ করেছি। আমাদের নতুন টেলিভিশন চ্যানেল হিসেবে আমরা এই ধরণের চ্যালেঞ্জিং কাজ করতে এবং ঝুঁকি নিতে আগ্রহী। সেই পথে টিআইবির এ ধরনের উদ্যোগ সত্যিই আমাদের কাছে প্রশংসনীয় এবং আমরা ভবিষ্যতে এ ধরণের কাজের সাথে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে চাই।’

দৈনিক সমকালের সিনিয়র স্টাফ করেসপনডেন্ট দেলোয়ার হোসেনের সিরিজ প্রতিবেদন অনুযায়ী সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলোতে কর্মকর্তারা শিশুদের উপস্থিতির হিসাব বাড়িয়ে দেখিয়ে খাদ্য ভর্তুকি আত্মসাৎ করেছেন। যার কারণে শিশুরা সঠিক পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

প্রতিবেদনের লিংক:

এই ফেলোশিপে আবেদনের সুযোগ ছিল প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কর্মরত পূর্ণকালীন সাংবাদিকদের জন্য, যাদের কমপক্ষে তিন বছরের পেশাদার অভিজ্ঞতা আছে এবং যারা ইতিপূর্বে অন্তত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন।

ফেলোশিপ বিজয়ীদের অভিনন্দন জানিয়ে জ্যোষ্ঠ সাংবাদিক ও মেন্টর শাহনাজ মুন্নী বলেন, ‘২৭টি প্রস্তাবনা থেকে মাত্র পাঁচটি বিষয়কে বেছে নেওয়া ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে আমরা যে তিনজন মেন্টর ছিলাম আমরা কিন্তু প্রস্তাব দেওয়া ২৭টি রিপোর্টেরই প্রত্যেক আবেদনকারীর সরাসরি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আমরা জানার চেষ্টা করেছিলাম যে, রিপোর্টার বিষয়টি নিয়ে কতটুকু ভেবেছেন, কীভাবে অনুসন্ধান করবেন এবং তার পরিকল্পনা কী। নানা প্রশ্নের মাধ্যমে আমরা যাচাই করেছি এবং যে রিপোর্টগুলো থেকে ভালো ও ব্যতিক্রমী কিছু আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে হয়েছে, সেই অনুযায়ী আমরা পাঁচটি বিষয় চূড়ান্ত করেছি। সফলভাবে তাদের প্রতিবেদনগুলো তৈরি ও প্রকাশের জন্য আমি তাদের সবাইকেই অভিনন্দন জানাচ্ছি।’

তাঁর বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে এ বছরের ফেলোশিপের আরেকজন মেন্টর এবং 'পতাকা নিউজ'-এর সম্পাদক তৌহিদুর রহমান ফেলোদের প্রতিবেদনগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তবে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই প্রকৃত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়। তিনি দেশের গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান এবং টিআইবিকে সাংবাদিকদের জন্য প্রাথমিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান। "এতে সাংবাদিক ও মেন্টর উভয়ের কাজই সহজ হবে এবং প্রতিবেদনের মান অনেক ভালো হবে," বলেন রহমান।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ফেলোশিপ জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলায় টিআইবির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। প্রতি বছর ফেলোরা কেবল অর্থায়নই পান না, বরং অভিজ্ঞ অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের সম্পাদকীয় পরামর্শ, পেশাদার নেটওয়ার্কে প্রবেশের সুযোগ এবং টিআইবির পরিচিতির আওতায় কাজ করার ফলে বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা লাভ করেন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই ধারা অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে বলেন ফেলোশিপ প্রোগ্রামটি ভবিষ্যতে কেবল অব্যাহতই থাকবে না, বরং সক্ষমতা অনুযায়ী এটি আরও সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে শক্তিশালী করা এবং এটি যাতে বিকশিত হতে পারে সে পরিবেশ তৈরি করা টিআইবির মূল দায়িত্বগুলোর একটি। একা কাজ করে টিআইবি সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্য পূরণ করতে পারে না। ভবিষ্যতে টিআইবি ফেলোদের জন্য প্রয়োজনভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার বিষয়টি বিবেচনা করবে। পাশাপাশি প্রকাশিত প্রতিটি প্রতিবেদনের জন্য নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ফলোআপ নিশ্চিত করা হবে।’


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি