ঝুঁকিতে সংস্কারের গতি: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধ্যাদেশ প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় ঘাটতি দেখছে টিআইবি

প্রকাশকাল: ১২ জানুয়ারি ২০২৬

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অভূতপূর্ব রক্তক্ষয় এবং নজিরবিহীন আত্মত্যাগের বিনিময়ে পতন ঘটেছিল কর্তৃত্ববাদী শাসনের। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্র-জনতার মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, দুর্নীতিমুক্ত এবং বৈষম্যহীন 'নতুন বাংলাদেশ' গড়ার শক্ত ভিত্তি তৈরি করা।

একটি দায়বদ্ধ প্রশাসন, সুশাসন, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন, জুলাই সনদ এবং তার চেতনার ভিত্তিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে।

রাষ্ট্রীয় এই রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় টিআইবি শুরু থেকেই সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। সংস্থাটি নিয়মিত বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছে এবং খসড়া আইনগুলো পর্যালোচনা করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরাছে। টিআইবি মনে করে, জনমানুষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির জোরালো দাবির মুখে এই সংস্কার প্রক্রিয়া একটি ঐতিহাসিক সময়ে শুরু হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য এরই মধ্যে শতাধিক অধ্যাদেশ জারির মতো বড় পদক্ষেপ নিয়েছে।

এতদসত্ত্বেও টিআইবির বিশ্লেষণে এক ভিন্ন চিত্রও উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সুপারিশ আইনি কাঠামোতে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং জনগণের তদারকির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, সেখানে বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।

প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে মিশ্র চিত্র

পর্যালোচনার শুরুতেই দেখা যায়, কিছু সংস্কার উদ্যোগে আশার আলো রয়েছে। যেমন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এখতিয়ার বাড়ানো, তদন্তের সময়সীমা নির্দিষ্ট করা এবং আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রদানের বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দেয়।

অপ্রাপ্তির জায়গাটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করার মতো কিছু বিধান এই অর্জনগুলোকে ম্লান করে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চূড়ান্ত ক্ষমতা এখনো নির্বাহী বা আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর হাতে রয়ে গেছে। এটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্বার্থের সংঘাত তৈরির পথ প্রশস্ত করতে পারে বলে টিআইবি আশঙ্কা করছে।

প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিয়ে সংশয়

সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে দুদক, পুলিশ কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এখনো স্বচ্ছতার অভাব দেখছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, অধ্যাদেশগুলোতে এমন কিছু বিধান রাখা হয়েছে যা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে এবং তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল করতে পারে।

এরই ধারাবাহিকতায় প্রস্তাবিত পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। সংস্থাটি মনে করে, এটি একটি স্বাধীন ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ার পরিবর্তে প্রশাসনিক আধিপত্যকেই আরও পাকাপোক্ত করছে। ফলে পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যটি অধরাই থেকে যাচ্ছে।

পাশাপাশি, ডিজিটাল পরিসরে সাইবার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং জাতীয় তথ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো সময়োপযোগী হলেও এগুলোতে অনেক অস্পষ্টতা রয়েছে। টিআইবি সতর্ক করেছে যে, এসব বিধানের অপব্যবহার হতে পারে। এর ফলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হওয়া এবং যথাযথ সুরক্ষা ছাড়াই নাগরিকদের ওপর নজরদারির ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অভাব

আইন তৈরির পদ্ধতির ক্ষেত্রে অধ্যাদেশ তৈরির প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। সংস্থাটি বলছে, হাতেগোনা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অংশীজনদের সাথে কার্যকর আলোচনা ছাড়াই অধ্যাদেশগুলো পাস করা হয়েছে। অনেক সময় খসড়াগুলো জনগণের মতামতের জন্য খুব অল্প সময় দেওয়া হয়েছে অথবা সবার একমত হওয়া সুপারিশগুলো শেষ মুহূর্তে বাদ দিয়ে আইন চূড়ান্ত করা হয়েছে। টিআইবি মনে করে এই ধরনের একতরফা পদ্ধতি সংস্কার প্রক্রিয়ার প্রতি জনআস্থা কমিয়ে দিতে পারে। এটি পুরো প্রক্রিয়ার দীর্ঘমেয়াদি বৈধতাকেও সংকটের মুখে ফেলতে পারে।

সুসংগত ও সমন্বিত সংস্কার কৌশলের আহ্বান

কৌশলগত দিক থেকে সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে এখনো সমন্বিত বা স্পষ্ট পরিকল্পনার অভাব দেখছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, অগ্রাধিকারগুলো অনেক ক্ষেত্রেই পদ্ধতিগত পরিকল্পনার বদলে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে ঠিক করা হচ্ছে। এছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাত এখনো সংস্কারের আওতার বাইরে রয়ে গেছে এবং ‘অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য’ অনেক সুপারিশের অগ্রগতিও অত্যন্ত সামান্য।

উত্তরণের পথ

এমতাবস্থায়, সংস্কার প্রক্রিয়াকে এর ঘোষিত লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি:

  • আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
  • সংস্কারের মূল সুপারিশগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা।
  • প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা রক্ষায় আপসহীন হওয়া।
  • একটি সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন রোডম্যাপ তৈরি করা।

একটি গভীর পর্যবেক্ষণ হলো, জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল ঘটিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতার চর্চার ধরন এখনো বদলায়নি। টিআইবির পর্যালোচনা স্পষ্ট বলছে যে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সেই পুরোনো সীমিত সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থই রক্ষা করছে। আমলাতন্ত্র হয়তো কৌশলে এমন এক সরকারকে নিয়ন্ত্রণে রাখছে যারা এই লড়াইয়ের মূল চেতনা পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি।

এই প্রেক্ষিতে বলা যায় বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তরুণদের অসামান্য আত্মত্যাগের বিনিময়ে সংস্কারের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তার মর্যাদা রক্ষা করা এখন জাতীয় দায়। অভ্যুত্থানের সেই স্বপ্নগুলো পুরোনো অভ্যাসের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়ার আগেই সংস্কারের কাজগুলোকে দৃশ্যমান এবং কার্যকর করতে হবে।

তাই টিআইবি মনে করে কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও আইনি ও পদ্ধতিগত যে ঘাটতি রয়ে গেছে, তা পূরণ না করলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল আসবে না। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার ব্যবস্থা এবং জনস্বার্থ রক্ষার মাধ্যমেই কেবল প্রকৃত সংস্কার সম্ভব।


অন্যান্য ওয়েব স্টোরি