প্রকাশকাল: ২৯ মার্চ ২০২৬
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তথ্য জানার অধিকার কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং নাগরিকদের জন্য এটি একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই অধিকার এখনও দুর্বল। এই কারণগুলোর পেছনে রয়েছে মূলত দীর্ঘদিন যাবৎ তথ্য কমিশনের অকার্যকরতা, সংস্কার প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজের সীমিত সম্পৃক্ততা এবং এমন একটি বিদ্যমান আইনি কাঠামো যা রাজনৈতিক দলগুলোকে জনজবাবদিহিতার বাইরে রেখেছে।
বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করে, তথ্য অধিকার ফোরাম ০৮ মার্চ টিআইবি কার্যালয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। এতে নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ, আইন বিশেষজ্ঞ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতে আন্দোলনরত কর্মীরা একত্রিত হয়ে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ -এর জরুরি সংস্কারের দাবি জানান এবং আইনের উদ্দেশ্য ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ক্রমবর্ধমান অসঙ্গতি তুলে ধরেন। টিআইবি তথ্য অধিকার ফোরাম-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ প্রণয়নের ১৬ বছর পরও রাজনৈতিক দলগুলোকে আইনের আওতায় “কর্তৃপক্ষ” হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে রাজনৈতিক দলসমূহ- যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও জাতীয় নীতি প্রণয়নসহ জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে- তাদের আর্থিক তথ্য, অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া বা প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রবিষয়ক কোন তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশে আইনগতভাবে বাধ্য নয়। এই সীমাবদ্ধতা একটি অস্বচ্ছতার সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছে এবং জবাবদিহি ব্যবস্থা দুর্বল করছে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রেখে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সীমিত পর্যায়ে স্বচ্ছতার বিষয়টি এখন যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, যা উদ্বেগজনক। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তথ্য অধিকার-সংক্রান্ত অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান তথ্য কমিশনের দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিতি একটি স্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে প্রায় দেড় বছর ধরে এই তথ্য কমিশন গঠন করা হয়নি, ফলে এক হাজারেরও বেশি অভিযোগ অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে আছে এবং নাগরিকরা এর কোন কায©কর প্রতিকার পাচ্ছেন না।
সম্প্রতি প্রস্তাবিত সংশোধনী অধ্যাদেশটিও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে। তথ্য অধিকার ফোরাম-এর আহ্বায়ক এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, পরামর্শ প্রক্রিয়ায় দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো খসড়া প্রস্তাবে প্রতিফলিত হয়নি। তিনি প্রস্তাবিত সংশোধনী সংসদে উপস্থাপনের আগে আরও বিস্তৃত আলোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।
আলোচনায় এমআরডিআই-এর নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর একটি বিশদ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে রয়েছে—তথ্যের সংজ্ঞায় “নোটশিট” অন্তর্ভুক্ত করা, ধারা ৭ পুনর্বিবেচনা করা, এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সরকারি চুক্তি বা লাইসেন্সের আওতায় পরিচালিত বেসরকারি সংস্থা, এবং নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোকে আইনের আওতায় আনা।
আলোচনার মূল বিষয় ছিল জরুরি সংস্কার এবং শক্তিশালী জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এর কেন্দ্রে ছিল রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনার দাবি। সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, তথ্যের অধিকার মূলত সত্য জানার অধিকার এবং কোনো প্রতিষ্ঠানই জবাবদিহিতার বাইরে থাকতে পারে না। রাজনৈতিক দলগুলো জনসম্পদ ব্যবহার করে, জনগণের অর্থায়নে পরিচালিত নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নির্ধারণ করে। তাদেরকে স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখা একটি কাঠামোগত অসঙ্গতি তৈরি করে, যা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত দাবিগুলো তথ্য অধিকারকে শক্তিশালী করার জন্য একটি সুসংগঠিত ও নীতিগত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে। এর মধ্যে রয়েছে—অবিলম্বে তথ্য কমিশন গঠন, সংশোধনী অধ্যাদেশটি অংশগ্রহণমূলক আলোচনার মাধ্যমে অর্থবহভাবে পুনর্বিবেচনা করা এবং তথ্য অধিকার আইনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে রাজনৈতিক দলগুলোকে এর আওতায় আনা। এগুলো কোনো ব্যতিক্রমী দাবি নয়, বরং বাংলাদেশে একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য অধিকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অত্যাবশ্যক পদক্ষেপ।