স্থানীয় উদ্যোগ থেকে জাতীয় আন্দোলন: নাগরিক সম্পৃক্ততায় শক্তিশালী হচ্ছে দুর্নীতিবিরোধী প্রয়াস

প্রকাশকাল: ১৮ জুন ২০২৬

স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ কেবল নীতি, আইন বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ প্রক্রিয়ায় সচেতন, সংগঠিত ও সক্রিয় নাগরিক সমাজের ভূমিকা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূল পর্যায়ে নাগরিকদের সক্রিয় সম্পৃক্ততাকে সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করছে। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের মে মাসে সাভার, ঝিনাইদহ, পিরোজপুর, রাজবাড়ী, মধুপুরসহ টিআইবির ৪৫টি সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এলাকায় আয়োজিত মতবিনিময় সভাগুলো হয়ে ওঠে নাগরিক-নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের অগ্রগতি, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়ে সম্মিলিত ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসর।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত কার্যক্রমের ধরন ও বাস্তবতা ভিন্ন হলেও আলোচনায় উঠে আসে একটি অভিন্ন লক্ষ্য—জনজীবনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসনের চর্চা শক্তিশালী করা। অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের এলাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দেখান, নাগরিকদের সক্রিয় সম্পৃক্ততা কীভাবে জনসেবার মানোন্নয়ন, সমস্যার সমাধান এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সনাক, ইয়ুথ এনগেজমেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট (ইয়েস) এবং অ্যাকটিভ সিটিজেনস গ্রুপ (এসিজি) দীর্ঘদিন ধরে টিআইবির মূল্যবোধ ও লক্ষ্যকে স্থানীয় পর্যায়ে বাস্তব রূপ দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। সামাজিক নজরদারি, জনসংলাপ, সচেতনতা বৃদ্ধি, অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম এবং বিভিন্ন জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে তারা নাগরিকদের মধ্যে দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছে। তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে বারবার উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি—নাগরিকরা যখন কেবল সেবাগ্রহীতা না হয়ে পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হয়ে ওঠেন, তখন প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষেও জনগণের প্রত্যাশা উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ কারণেই মতবিনিময় সভাগুলো কেবল কার্যক্রম পর্যালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং বিভিন্ন এলাকার প্রতিনিধিরা তাঁদের সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও শেখার অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে আলোচনা করেছেন কীভাবে নাগরিক সম্পৃক্ততাকে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করা যায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, ভূমি প্রশাসন কিংবা অন্যান্য জনসেবামূলক খাতে পরিচালিত স্থানীয় উদ্যোগগুলো কীভাবে বৃহত্তর জাতীয় পর্যায়ে জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করছে, সেই বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।

আলোচনায় অংশ নেওয়া সনাক নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন, দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে হলে নাগরিকদের ধারাবাহিক অংশগ্রহণ, কমিউনিটির মালিকানাবোধ এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে হবে। তাঁদের মতে, টেকসই পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন নাগরিকরাই নিজেদের এলাকার সমস্যা চিহ্নিত করা, সমাধানের দাবি তোলা এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকবেন।

তরুণদের অংশগ্রহণও এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে আসে। ইয়েস ও এসিজির সদস্যরা জানান, দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি, সামাজিক জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং জনস্বার্থভিত্তিক উদ্যোগে তরুণদের সম্পৃক্ততা ক্রমেই বাড়ছে। এর ফলে শুধু বর্তমান কার্যক্রমই শক্তিশালী হচ্ছে না; একই সঙ্গে গড়ে উঠছে এমন একটি নতুন প্রজন্ম, যারা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের মূল্যবোধকে ধারণ করে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে আগ্রহী।

বিভিন্ন জেলার আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসে—দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান গড়ে তুলতে হলে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নয়, নাগরিকদেরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ের অভিজ্ঞতা বিনিময়, নাগরিক নেতৃত্বের বিকাশ এবং জনসম্পৃক্ত উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন অংশগ্রহণকারীরা। এই আলোচনার সূত্র ধরেই রাজবাড়ীর মতবিনিময় সভায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সুশাসনে অর্থবহ পরিবর্তন আনতে কেবল প্রতিষ্ঠানগত উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নাগরিকদেরও জবাবদিহি দাবি করতে হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে হবে এবং জনসেবার মান ও কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে সক্রিয় থাকতে হবে। তিনি বলেন, আইন, নীতি ও সংস্কার গুরুত্বপূর্ণ হলেও সচেতন ও সক্রিয় নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ছাড়া সেগুলোর কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, তৃণমূল পর্যায়ে গড়ে ওঠা নাগরিক নেটওয়ার্ক এবং ধারাবাহিক নাগরিক সম্পৃক্ততা দুর্নীতি নিয়ে বিচ্ছিন্ন উদ্বেগকে একটি বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে পারে। নাগরিক, কমিউনিটি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সংযোগ গড়ে তুলতে পারলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শুদ্ধাচার সমাজের স্বাভাবিক প্রত্যাশায় পরিণত হবে।

সভাগুলোর শেষে অংশগ্রহণকারীরা দুর্নীতিবিরোধী শপথ গ্রহণ করেন। তাঁরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা, অনিয়মের প্রতিবাদ করা এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির পক্ষে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। অনেকের কাছেই এটি ছিল কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি নাগরিক আন্দোলনের প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করার মুহূর্ত।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও সুদৃঢ় করার প্রয়োজনীয়তা এখনও রয়ে গেছে। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সনাক, ইয়েস ও এসিজির সদস্যদের কার্যক্রম, স্থানীয় নাগরিকদের অংশগ্রহণ এবং তরুণদের ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা ইঙ্গিত দেয় যে, তৃণমূল থেকে গড়ে ওঠা এই নাগরিক উদ্যোগগুলো ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সামাজিক শক্তিতে রূপ নিচ্ছে।

সেই অর্থে এসব মতবিনিময় সভা কেবল কার্যক্রম পর্যালোচনার আয়োজন নয়। বরং এগুলো এমন একটি চলমান প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে নাগরিকরা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখছেন, একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন এবং স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় আরও দৃঢ় করছেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সনাক, ইয়েস ও এসিজির সদস্যদের কার্যক্রমে প্রতিফলিত হচ্ছে টিআইবির সেই বিশ্বাস, যেখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠাকে কেবল নীতিগত দাবি নয়, বরং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে এগিয়ে নেওয়া একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে দেখা হয়। স্থানীয় পর্যায়ের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগগুলো যখন একটি অভিন্ন লক্ষ্য ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে যুক্ত হয়, তখন সেগুলো বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের শক্তিতে পরিণত হয়।

বিভিন্ন জেলার অভিজ্ঞতা ও আলোচনার মধ্য দিয়ে অংশগ্রহণকারীরা উপলব্ধি করেন যে, জনস্বার্থে নাগরিকদের ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা না থাকলে অনেক ইতিবাচক উদ্যোগও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই আলোচনায় নাগরিক নেতৃত্বের বিকাশ, তরুণদের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক জবাবদিহির চর্চা আরও বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পায়। এ প্রসঙ্গে টিআইবির সিভিক এনগেজমেন্ট বিভাগের কো-অর্ডিনেটর মো. আতিকুর রহমান নাগরিক উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করার ওপর জোর দেন। একই বিভাগের কো-অর্ডিনেটর কাজী শফিকুর রহমান বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সচেতন, সংগঠিত ও সক্রিয় নাগরিক সমাজের বিকল্প নেই; কারণ নাগরিকদের সম্মিলিত অংশগ্রহণই জবাবদিহির দাবিকে শক্তিশালী করে এবং সুশাসনের সংস্কৃতিকে আরও গভীর করে।

তৃণমূল থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগগুলোর সামনে অর্জন যেমন রয়েছে, তেমনি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগও রয়ে গেছে। তবে মতবিনিময় সভাগুলোর আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা, প্রত্যয় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একটি বিষয় স্পষ্ট করে—পরিবর্তনের দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়, নাগরিকদেরও। আর সেই দায়িত্ব পালনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ ক্রমেই আরও সংগঠিত, সচেতন ও সক্রিয় হয়ে উঠছেন। সভাগুলোর শেষে গৃহীত দুর্নীতিবিরোধী শপথও ছিল সেই সম্মিলিত অঙ্গীকারের প্রতীক। এটি শুধু ব্যক্তিগত প্রতিশ্রুতি নয়; বরং একটি যৌথ বিশ্বাসের প্রকাশ—স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সেই অর্থে এসব মতবিনিময় সভা কোনো সমাপ্তি নয়; বরং তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত একটি নাগরিক-নেতৃত্বাধীন দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের চলমান যাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।