দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর পাল্টাপ্রশ্ন

“শুট দ্য মেসেঞ্জার” প্রবণতার দৃষ্টান্ত ও মুক্ত গণমাধ্যম এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারের প্রতি হুমকি: টিআইবি

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

ঢাকা, ২৫ আগস্ট ২০২৬: টেকনোক্র‍্যাট কোটায় দ্বৈত নাগরিকত্বধারীর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ সংবিধানসম্মত নয়। এ বিষয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা না করে পদ গ্রহণও প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ জনস্বার্থে পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে সংবাদকর্মীরা যখন এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছেন, প্রতিমন্ত্রী তার সরাসরি উত্তর না দিয়ে পাল্টাপ্রশ্ন করেছেন। সংশ্লিষ্ট তথ্য জানতে চাওয়াকে তিনি যেভাবে ক্ষোভ ও বিদ্বেষমূলকভাবে চ্যালেঞ্জ করেছেন, তাকে পতিত কর্তৃত্ববাদী আমলের মতো “শুট দ্য মেসেঞ্জার” চর্চার দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একইসঙ্গে, মুক্ত গণমাধ্যম, স্বাধীন সাংবাদিকতা, বাক্‌স্বাধীনতা ও জনগণের তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার খর্ব করার এমন আত্মঘাতী প্রয়াস পরিহারের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্কের মূল বিষয়-দ্বৈত নাগরিকত্ব সম্পর্কে নিজের অবস্থান সুস্পষ্ট করারও আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বিদেশি নাগরিকত্ব রয়েছে, এমনকি সংশ্লিষ্ট দেশের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘টেকনোক্র‍্যাট কোটায় দ্বৈত নাগরিকত্বধারীর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ অসাংবিধানিক। সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য নন-এমন ব্যক্তিকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে। অন্যদিকে, ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জনকারী বা সেই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকারকারী ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য। একইসঙ্গে ৬৬(২ক) অনুচ্ছেদে দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টিও সুস্পষ্ট। ফলে দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল থাকা অবস্থায় টেকনোক্র‍্যাট কোটায় তাঁর নিয়োগ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ বিষয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজের অবস্থান প্রকাশ না করে প্রতিমন্ত্রীর পদ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি নিজেকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। অথচ বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জনস্বার্থে প্রকাশের লক্ষ্যে সংবাদকর্মীরা যখন সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছেন, তখন প্রতিমন্ত্রী তার সরাসরি উত্তর দেননি। বরং তিনি “কে নিউজ করছে” এবং “কার এত জ্বালা” বলে পাল্টাপ্রশ্ন করেছেন, যা পতিত কর্তৃত্ববাদী আমলের “শুট দ্য মেসেঞ্জার” চর্চারই প্রতিফলন। সংবাদটি কে করেছে বা কে প্রশ্ন তুলেছে, তা এখানে মূল বিষয় নয়। মূল প্রশ্ন হলো, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তাঁর বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল ছিল কি না। এমন একটি সুস্পষ্ট সাংবিধানিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া তাঁর দায়িত্ব।’

ড. জামান বলেন, ‘রক্তক্ষয়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জবাবদিহিমূলক সুশাসনের প্রত্যাশায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এ ধরনের বিষয়ে প্রশ্ন করার এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকার আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়সহ বিভিন্ন অবস্থান থেকেও স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার বারবার ব্যক্ত করা হয়েছে। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় পদে থাকা কোনো ব্যক্তি তথ্যভিত্তিক ও সরাসরি জবাব দেবেন - এমনটাই প্রত্যাশিত। সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্নের উত্তর এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ প্রকাশের মাধ্যমে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন। তা না করে তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রতিবেদনকারী গণমাধ্যম ও প্রশ্ন উত্থাপনকারী সংবাদকর্মীদের প্রতি ক্ষোভ ও বিদ্বেষমূলক পাল্টাপ্রশ্ন একজন প্রতিমন্ত্রীর জন্য শোভনীয় নয়; বরং অনৈতিক ও উদ্বেগজনক। বিষয়টি সরকারের জন্যও বিব্রতকর। এমন প্রতিক্রিয়া মুক্ত গণমাধ্যম, বাক্‌স্বাধীনতা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী। একজন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় পদধারীর কাছ থেকে বৈধ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের জবাবে এ ধরনের আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া শুধু সংশ্লিষ্ট সংবাদকর্মীদের ওপর অযৌক্তিক ও অযাচিত চাপ সৃষ্টি করে না, স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্যও হুমকিস্বরূপ। এতে ক্ষমতাসীন বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অস্বস্তিকর বিষয়ে প্রশ্ন করাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। সংবাদকর্মীদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা “চিলিং ইফেক্ট” সৃষ্টির আশঙ্কাও বাড়ে। সর্বোপরি, এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণের তথ্য জানার অধিকার।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘বিষয়টি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় পদকে কেন্দ্র করে। তাই এর আন্তর্জাতিক মাত্রা এবং বাংলাদেশের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিব্রতকর বিতর্কের ঝুঁকিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এ পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে অবিলম্বে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ও প্রামাণ্য তথ্য প্রকাশ ও তাঁর নিয়োগের সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি। সাংবিধানিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রশ্নকারী সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা মুক্ত গণমাধ্যম ও জনগণের তথ্য জানার অধিকার খর্ব করার সামিল।’

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সরকারের অন্য কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সমমর্যাদার দায়িত্বশীল ব্যক্তির দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্ন থাকলে, স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক জবাবদিহির স্বার্থে তাঁদের ক্ষেত্রেও একইভাবে অবস্থান ও প্রামাণ্য তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

গণমাধ্যম যোগাযোগ:
মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম
পরিচালক, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন
মোবাইল: ০১৭১৩-১০৭৮৬৮
ই-মেইল: tauhidul@ti-bangladesh.org


অন্যান্য প্রেস বিজ্ঞপ্তি