সরকারের ১০০ দিন আশাজাগানিয়া হলেও জবাবদিহিমূলক কাঠামো ও দুর্নীতি প্রতিরোধে নির্দিষ্ট পথরেখার ঘাটতি উদ্বেগজনক: টিআইবি

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

ঢাকা, ০৭ জুন ২০২৬: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকারের ১০০ দিনের কার্যক্রমে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে শীর্ষ পর্যায় থেকে কিছু ইতিবাচক সদিচ্ছার প্রকাশ ঘটলেও, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহিমূলক কাঠামো শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে পিছু হঠার ইঙ্গিতও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আজ টিআইবির ধানমণ্ডি কার্যালয়ে আয়োজিত “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন” র্শীষক পর্যবেক্ষণ প্রকাশকালে এই মন্তব্য করে সংস্থাটি। সরকারের ১০০ দিনে জাতীয় সংসদ, বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ, স্থানীয় সরকার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধ, মানবাধিকার সংরক্ষণ, তথ্য অধিকার ও তথ্য প্রকাশ, গণমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কার্যক্রমের ওপর পর্যবেক্ষণ করে সংস্থাটি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান এবং রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মোঃ সহিদুল ইসলাম। আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় পর্যবেক্ষণটি উপস্থাপন করেন সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মোঃ জুলকারনাইন এবং রিসার্চ ফেলো রাজিয়া সুলতানা।

পর্যবেক্ষণ ফলাফলে সরকারের বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ উঠে এসেছে। সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা বাতিল; প্রধানমন্ত্রীর চলাচলে ভিভিআইপি প্রটোকল ও বিমানবন্দরে আনুষ্ঠানিকতা সীমিত করা; ব্যক্তিগত সফরে সরকারি সুবিধা নিলে নিজের ব্যয় পরিশোধের নির্দেশনা জারি; সরকারি কর্মচারীদের সকাল ৯টায় উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা; অন্তবর্তীকালীন সরকারের ধারাবাহিকতায় বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে তিনটি দেশের সাথে চুক্তি এবং একটি দেশে পাচারকৃত সম্পদ জব্দ; এবং তিন ধাপে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সদিচ্ছার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সংসদের প্রথম অধিবেশনে ২,৫০৯টি প্রশ্নের মধ্যে ১,৭৭৮টির উত্তর প্রদান এবং ২৮০ জন সংসদ সদস্যের আলোচনায় অংশগ্রহণও একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিলক্ষিত হয়েছে।

সার্বিক বিবেচনায় সরকারের ১০০ দিন আশাজাগানিয়া ও সম্ভাবনাময় উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কিছু প্রশংসনীয়, অভূতপূর্ব ও নতুন ধারার নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত দেখা যাচ্ছে। তবে এরফলে নতুন ধারায় সরকার পরিচালিত হচ্ছে বা হবে এমন মনে করা কঠিন। সরকারের কিছু পদক্ষেপ ও কর্মকাণ্ড বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ও ৩১ দফা রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার ও জুলাই অভ্যুত্থানের অভিষ্ট, বিশেষ করে সুশাসিত, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, যা জনগণের জন্য গভীর উদ্বেগের।’

তিনি আরও বলেন, ‘অন্তবর্তী সরকারের আমলে প্রণীত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে প্রথম সংসদীয় অধিবেশনে ৯৭টি অধ্যাদেশ সরাসরি আইনে পরিণত করা হলেও বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশসমূহ রহিত বা অধিকতর যাচাইয়ের নামে স্থগিত করা হয়েছে। এ অধ্যাদেশগুলো জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহির সুযোগ সৃষ্টি করেছিলো। অন্যদিকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করবে এমন বিতর্কিত অধ্যাদেশসমূহ অংশীজনদের প্রত্যাশা উপেক্ষা করে পাস করা হয়েছে, যা সরকারের মৌলিক প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বিপরীত।’

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে দুদক, মানবাধিকার ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে শীর্ষ পদে নিয়োগ বন্ধ রাখা কিংবা পুনঃগঠন না করে স্থবির করে রাখা, পূর্বের দলীয়করণের চর্চায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ, উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে এমপিদের পরিদর্শন কক্ষ প্রতিষ্ঠার নামে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে বাস্তবে অধিকতর অকার্যকর করার সিদ্ধান্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ, এমনকি বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন দলীয় বিবেচনায় পুনর্গঠন উদ্বেগজনক। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রতিশ্রুতি ও চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও “মব সংস্কৃতি”, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও “এবার আমাদের পালা”- সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি এবং ধর্মান্ধ শক্তির সহিংসতা প্রতিরোধে প্রশাসনের ব্যর্থতাও উদ্বেগের কারণ। আমরা প্রত্যাশা করি, সরকার এ বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিবে এবং সুশাসিত, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠায় সহায়ক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পূরণে সচেষ্ট হবে।’

টিআইবির পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, সংসদের প্রথম অধিবেশনে বেশিরভাগ সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন না করায় নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি ব্যহত হচ্ছে এবং গঠিত বিশেষ কমিটিগুলোতে ক্ষমতাসীন জোটের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখা হয়েছে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে সরকারি দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতাদের ভিন্নমুখী বক্তব্য জনমনে সংশয় তৈরি করছে। এ ছাড়া বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতার প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ও বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং এই সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার মাধ্যমে সরকার পিছু হটার ইঙ্গিত দিয়েছে।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন মামলা, সরকারি দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে করা মামলা দ্রুত প্রত্যাহার করা এবং সমান্তরালভাবে সাংবাদিক ও ভিন্নমতের কর্মীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের ও জামিন স্থগিত করার পুরোনো সংস্কৃতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনে মেরিটোক্রেসির ঘোষণা দেওয়া হলেও বাস্তবে প্রশাসনের শীর্ষপদে দলীয় অনুগত অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং বদলি-পদোন্নতিতে দলীয় বিবেচনার চর্চা বহাল থাকায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

পর্যবেক্ষণে আরো উল্লেখ করা হয়, ব্যাংক ও আর্থিক খাতে তদারকি শক্তিশালী করার অঙ্গীকার থাকলেও, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গ্রুপের সাথে সম্পৃক্ত এবং ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক রেজুলেশন আইন ২০২৬- এর মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারীদের কোনো জবাবদিহি ছাড়াই মালিকানায় ফেরার সুযোগ দিয়ে মূলত চিহ্নিত লুটেরাদের পুনর্বাসনের বিতর্কিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের পূর্বের অসাধু চর্চা বহাল রয়েছে।

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে মোট ১৩০টি ঘটনায় ১৮৮ জন সাংবাদিক হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার, ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা এবং ৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬-এর বিতর্কিত ধারার অপব্যবহারের মাধ্যমে বাকস্বাধীনতা লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের ওয়েবসাইট পরিবর্তনের সময় অন্তবর্তী সরকারের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি ও তথ্য-উপাত্ত অনলাইন থেকে সরিয়ে আর্কাইভ করা স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে।

পর্যবেক্ষণে সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে উঠে আসে, মার্চ ও এপ্রিল ২০২৬- এর মধ্যে দেশে ২৯৪টি ছিনতাই, ৬০৫টি খুন, ১৯৬টি অপহরণ এবং ৩,৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও ঢাকা, কুষ্টিয়া ও সিলেটে ঐতিহ্যবাহী মাজার ও বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাসহ দেশজুড়ে ৬৯ থেকে ৮০টি মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যাতে ৩১ থেকে ৪২ জন নিহত হয়েছেন। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় বিভিন্ন হাট-বাজার ও পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও নিয়ন্ত্রণ বদল অব্যাহত রয়েছে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর চাঁদাবাজিকে “সমঝোতা” হিসেবে উল্লেখ করার বিতর্কিত বক্তব্য এই অপরাধকে আরও উৎসাহিত করেছে। এ ছাড়া, স্বাস্থ্য খাতের হাম সংকট মোকাবিলায় ও দুর্নীতি প্রতিরোধেও কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তিমূলে নির্বাচিত সরকারের প্রতি বৈষম্যবিরোধী চেতনা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী ইশতেহারসহ সকল প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জোর তাগিদ জানায় টিআইবি।

গণমাধ্যম যোগাযোগ:
মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম
পরিচালক, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন
মোবাইল: ০১৭১৩-১০৭৮৬৮
ই-মেইল: tauhidul@ti-bangladesh.org

এ সম্পর্কিত গবেষণা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ


অন্যান্য প্রেস বিজ্ঞপ্তি