নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম, পেশী, পুরুষতান্ত্রিক ও সংখ্যাগরিষ্ঠতন্ত্র শক্তির পুরাতন ধারা অব্যাহত রয়েছে ; সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অপরিণামদর্শী পদক্ষেপের ফলে গণভোট নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি: টিআইবি

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

ঢাকা, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম, পেশী, পুরুষতান্ত্রিক ও সংখ্যাগরিষ্ঠতন্ত্র শক্তির পুরাতন ধারা অব্যাহত থাকাসহ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অপরিণামদর্শী পদক্ষেপের ফলে গণভোট নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। শুরুতে সুস্থ প্রতিযোগিতার লক্ষণ দেখা গেলেও, ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা সহিংসতাপূর্ণ নির্বাচনি কার্যক্রমের পুরাতন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বজায় রেখেছেন। ফলে নির্বাচনে দল ও জোটের মধ্যে সংঘাত, আন্তঃদলীয় কোন্দল, ক্ষমতার জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সহিংসতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ টিআইবির ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে ‘‘প্রাক-নির্বাচন এবং গণভোট পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ” উপস্থাপন উপলক্ষ্যে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান; উপদেষ্টা, নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম। প্রতিবেদনটির একাংশ উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মোঃ মাহ্ফুজুল হক।

টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্বাচনি সহিংসতার পাশাপাশি পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির ঘোষিত নির্বাচনবিরোধী তৎপরতার ফলে অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি রয়েছে। পূর্বের ন্যায় রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীরা নির্বাচনে অর্থ, ধর্ম ও পেশী, পুরুষতান্ত্রিক ও সংখ্যাগরিষ্ঠতন্ত্র শক্তির ব্যবহার শুধু অব্যাহতই রাখেননি, বরং অর্থ ও ধর্মের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচনি আচরণ বিধি ভেঙ্গে রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণা অব্যাহত ছিলো, যা নির্বাচন কমিশনের কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতি তুলে ধরেছে। জুলাই সনদে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের অঙ্গীকারের পরও বাস্তবে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারীদের উপেক্ষা করা হয়েছে। এ ছাড়া তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী হত্যাকা-ের শিকার; দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক কর্মী এবং প্রতিপক্ষের উপর হামলা, গুলিবর্ষণ, হত্যাকা- অব্যাহত; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্লিপ্ততা ও তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েগেছে। তা ছাড়া, নির্বাচন কমিশনের অব্যবস্থাপনার কারণে কমিশনের ওয়েবসাইটে নিবন্ধনের জন্য আবেদনকারী ১৪ হাজার গণমাধ্যমকর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য কিছু সময়ের জন্য ফাঁস যা গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষার জন্য হুমকি সৃষ্টি হয়েছে।

পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী অনুমোদিত সময়ের আগেই রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচারণা এবং সকল সম্ভাব্য প্রার্থী দেওয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২ (ধারা ৩ ও ৪) ভঙ্গ করে দেয়াল, খুঁটি, যানবাহন এবং বিভিন্ন স্থাপনায় পোস্টার ও প্রচারণা সামগ্রী লাগানো শুরু করে। অর্থাৎ সকল প্রার্থী কর্তৃক কোনো না কোনো নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে। প্রচারণার জন্য অনুমোদিত সময়ের আগেই দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। ইতিমধ্যে ৩৩.৮ শতাংশ প্রার্থীর নির্বাচনি ব্যয়সীমা অতিক্রম করেছে; প্রার্থীদের এই ব্যয়সীমা অতিক্রান্তের হার গড়ে ১ কোটি ১৯ লক্ষ ৬১ হাজার ৩১০ টাকা (৪ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত)। প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটারদের প্রভাবিত করতে নগদ অর্থ প্রদানের অভিযোগ উঠেছে। একইসঙ্গে, নির্বাচনি প্রচারণাসম্পর্কিত তথ্য প্রচারে একটি দলের প্রাধান্য, যা মোট সময়ের প্রায় ৬৭.২৫ শতাংশ এবং গণভোটের প্রচারণায় (৭.৫৬ শতাংশ) অল্প সময় ব্যয় করেছে বিটিভি। এ ছাড়া, নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে একটি আসনে দুই দলের সংঘর্ষে একজনের প্রাণহানি এবং উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে বরিশাল বিভাগে তফশিল ঘোষণার পূর্ববর্তী সময়ে সংঘর্ষের হার ৩০.৯ শতাংশ এবং পরবর্তী সময়ে ৪৩.৮ শতাংশ, রাজশাহী বিভাগে যথাক্রমে ২২.২ শতাংশ ও ১৫.৫ শতাংশ এবং ঢাকা বিভাগে এই সংঘর্ষের হার যথাক্রমে ২২.৩ শতাংশ ও ১২.৩ শতাংশ। পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সর্বোচ্চ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বরিশাল বিভাগে এবং সর্বনিন্ম সিলেটে।

অন্যদিকে গণভোটের বিষয়ে দেখা গেছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলসমূহের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে গণভোট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের দোদুল্যমানতা ও উভয়পক্ষের সন্তুষ্টি প্রত্যাশী অধ্যাদেশ প্রণয়ন, যা শুরুতেই গণভোটের বিষয় ও প্রশ্ন নিয়ে ধোঁয়াশা, বিভ্রান্তি ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অধ্যাদেশ প্রণয়ন ও গণভোট এবং ‘‘হ্যাঁ’’ ভোটের পক্ষে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়ায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে কোনো প্রকার গঠনমূলক পরামর্শ বা সমন্বয়ের সুযোগ নেয়া হয়েছে কিনা তা জানা যায়নি। সরকারের প্রচারণা কার্যক্রম শুরু হওয়ার ১৮ দিন পর সরকারি কর্মচারীদের গণভোটের পক্ষে প্রচার সম্পর্কে যে নির্দেশনা নির্বাচন কমিশন দিয়েছিল তা কতটুকু সুচিন্তিত, আইনসম্মত ও গঠনমূলক, এসব প্রশ্নের কারণে আরও অধিকতর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। প্রজ্ঞাপন জারির আগে গণভোট অধ্যাদেশ প্রণেতা হিসেবে সরকারের সাথে নির্বাচন কমিশন আলোচনার সুযোগ নিলে তার স্বাধীন ভূমিকার চর্চা প্রশ্নবিদ্ধ হতো না, বরং অযাচিত বিভ্রান্তি পরিহার করা সম্ভব হতো।

সার্বিক নির্বাচনি পরিস্থিতি সম্পর্কে টিআইবির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘অধিকাংশ প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণার খরচ নির্ধারিত ব্যয়সীমা অতিক্রম করেছে, পাশাপাশি প্রচারণায় ধর্মীয় বিষয়বস্তুর অপব্যবহার জোরালোভাবে দৃশ্যমান, যা বাংলাদেশের মূল্যবোধের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং সার্বিকভাবে নারীর সমান অধিকারের ধারণা ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে। অন্যদিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, ভিন্ন ধর্মীয়, জাতিগত, লৈঙ্গিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিচয়ে পরিচিত বা প্রতিবন্ধকতার শিকার ভোটারদের নিরাপত্তা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করে তাদের ভোটে অংশগ্রহণের পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ ঝুঁকিগ্রস্ত হয়েছে।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘অনলাইন ও অফলাইন প্রচরণাসহ নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি স্তরে দল এবং প্রার্থীরা আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘনসহ বিবিধ অনিয়ম করলেও নির্বাচন কমিশন সক্ষমতার ঘাটতির কারণে এড়িয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেমন মেটা বা গুগল এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত সমন্বয় হয়নি। প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রার্থীরা প্রচারণা চালালেও সেই বিতর্কিত কন্টেন্টসমূহ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না, কারণ এখানে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত।’

নির্বাচনকালীন সকল অংশীজনের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে ড. জামান আরও বলেন, ‘অতীতে মানুষ ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোও ভুক্তভোগী। অতীত এই অভিজ্ঞতা স্মরণ রেখে নির্বাচনকে নির্বাচন হিসেবে গণ্য করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে জনগণের রায় মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। এই চেতনা যদি আমাদের নেতৃবৃন্দÑমাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত ধারণ করেন, তাহলে আমরা বিশ^াস করি নির্বাচন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে হবে। একইসঙ্গে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, নারী-শিশু ও প্রতিবন্ধী নির্বিশেষে সকল ভোটারগণ যাতে ভয়-ভীতি, নিরাপত্তা শঙ্কার ঊর্ধ্বে উঠে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন, সরকার, রাজনৈতিক দলসমূহ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যার ওপর যে দায়িত্ব আছে, সেগুলো সঠিকভাবে পালন করবেÑএই প্রত্যাশা করছি।’

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থান প্রদত্ত ম্যান্ডেট অনুযায়ী জুলাই সনদের ওপর গণভোটে ‘‘হ্যাঁ’’ রায় অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন সরকারের দায়িত্ব। এ ভূমিকা পালনে নির্বাচন কমিশন একমত না হওয়ার কোনো আইনগত বা যৌক্তিক ভিত্তি ছিলো না। তবে তফসিল ঘোষণার পর থেকে যেহেতু সরকারি কর্মচারীগণ আইনত নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্বাধীন, সরকার তার কর্মচারীদের গণভোটে ‘‘হ্যাঁ’’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা যৌক্তিক হওয়া সত্ত্বেও নির্দেশনা প্রদানের আগে নির্বাচন কমিশনের সম্মতি না নিয়ে কমিশনের এখতিয়ারে অহেতুক হস্তক্ষেপ করেছে। এ হস্তক্ষেপের কারণে বা অন্য যে বিবেচনায় হোক নির্বাচন কমিশন এক্ষেত্রে আইনের ভুল ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে নি®প্রয়োজনীয় ও বিতর্কিত পদক্ষেপ নিয়েছে। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি এনজিও এবং ব্যাংকসহ বিভিন্ন অংশীজনের ওপর অযাচিতভাবে সিদ্ধান্তÍ চাপিয়ে দিয়ে সরকার নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সার্বিকভাবে সরকার ও নির্বাচন কমিশন ঐতিহাসিক গণভোট আয়োজনে নিজেদের প্রত্যাশিত ভূমিকা সুষ্ঠু ও সুচারুভাবে পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।’

গণভোটের মূল ভিত্তি রক্তাক্ষরে রচিত জুলাই সনদের সিংহভাগ প্রস্তাবে, বিশেষ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতি প্রতিরোধ, মানুষের রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, লিঙ্গ ও বিভিন্ন বৈচিত্র্য নির্বিশেষে সকল মানুষের সমঅধিকারের প্রত্যয় টিআইবির দীর্ঘকালের গবেষণা ও অধিপরামর্শ-প্রসূত প্রত্যাশার প্রতিফলিত হওয়ায় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে টিআইবির অবস্থান ঘোষণা করেন।

গণমাধ্যম যোগাযোগ:
মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম
পরিচালক, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন
মোবাইল: ০১৭১৩-১০৭৮৬৮
ই-মেইল: tauhidul@ti-bangladesh.org


অন্যান্য প্রেস বিজ্ঞপ্তি