সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
ঢাকা, ১৪ অক্টোবর ২০২৬: ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের ব্যাপক ঘাটতি, নীতিমালার দুর্বল প্রয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে খাতটি অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অনিয়ন্ত্রিত পক্ষের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। “আন্তর্জাতিক ই-বর্জ্য দিবস” উপলক্ষ্যে আজ রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে টিআইবি ও WEEE Society Bangladesh-এর যৌথ আয়োজনে একটি দিনব্যাপী সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। “বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুশাসন: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা” শীর্ষক এই সেমিনারে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। সংস্থাটি সতর্ক করে জানায়, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও আইনের যথাযথ প্রতিপালন নিশ্চিত করা না গেলে ক্রমবর্ধমান ই-বর্জ্যের সংকট দেশের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনবে।
সেমিনারের উদ্বোধনী পর্বে উপস্থিত ছিলেন প্রধান অতিথি ড. মোঃ সাইমুম পারভেজ, যিনি প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ সহকারী। আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এবং WEEE Society Bangladesh-এর চেয়ারপার্সন সুমন আহমেদ সাবির। সেমিনারে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সুশাসন বিষয়ক গবেষণার মূল তথ্য তুলে ধরেন টিআইবির রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আব্দুলাহ্ জাহীদ ওসমানী । উপস্থাপনায় উঠে আসে, দেশে কী পরিমাণ ই-বর্জ্য উৎপন্ন ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হচ্ছে, তার কোনো জাতীয় ইনভেন্টরি বা তথ্যভাণ্ডার নেই। উৎপাদিত ই-বর্জ্যের প্রায় ৯৭ শতাংশই কোনো প্রশাসনিক তদারকি ছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে।
ই-বর্জ্য সংকট মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধান অতিথি ড. মোঃ সাইমুম পারভেজ বলেন, ‘বর্তমান পরিবেশগত সংকট কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বর্তমান সরকার সুশাসন ও পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে থ্রি-আর (3R) নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। পাশাপাশি জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং হাব ও ম্যাটেরিয়াল রিকভারি সেন্টার স্থাপনেরও লক্ষ্য রয়েছে।’ বৈদ্যুতিক যানবাহন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিস্তারের ফলে সৃষ্ট ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ উৎসাহিত করার ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে যেকোনো নীতিমালায় সব অংশীজনের মতামতের যথাযথ প্রতিফলন নিশ্চিত করার কথাও বলেন।
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সুশাসনের ঘাটতি আর সঠিক নীতিমালার কার্যকর প্রয়োগ না থাকার কারণেই ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি আজ অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অনিয়ন্ত্রিত খাতের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত সুশাসন ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের অংশ হিসেবে টিআইবি এই খাতকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রতিটি অংশীজনের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা এবং অবৈধ লেনদেন রোধ করা জরুরি। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও টেকসই সুশাসন কাঠামোর আওতায় আনাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’
টিআইবির পরিবেশ ও জলবায়ু অর্থায়ন বিভাগের কো-অর্ডিনেটর ড. নাবিল হক এর সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনাগুলোয় পরিবেশ অধিদপ্তর, টেলিকম ও আইএসপি খাতের প্রতিনিধিসহ বিশেষজ্ঞ ও খাতসংশ্লিষ্টরা অংশ নেন। তাঁরা নিজ নিজ খাতের বাস্তব চিত্র ও সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন।সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ এবং বিটিআরসির নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার হার অত্যন্ত কম। এর কারণ তদারকির দুর্বলতা ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা। এছাড়া নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পুরোনো ও পুনঃব্যবহারযোগ্য ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম আমদানি হচ্ছে। অনুমোদিত পরিমাণের চেয়ে বেশি ই-বর্জ্য রপ্তানি এবং নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সঠিক বেসলাইন তথ্য বা ইনভেন্টরি না থাকায় তদারকি প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছে। টেলিকম ও আইএসপি খাতের প্রতিনিধিরা জানান, নেটওয়ার্ক অপ্টিমাইজেশন ও সরঞ্জাম পুনঃব্যবহারের সুযোগ থাকলেও মাঠপর্যায়ে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা নেই। জাহাজভাঙা শিল্প থেকে আসা বিপুল পরিমাণ ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের তীব্র ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তাঁরা। আলোচকেরা পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিটিআরসির মধ্যকার দ্বৈততা দূর করার ওপর জোর দেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় আনা এবং উৎপাদকের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার কথাও বলেন তাঁরা।
বিদ্যমান এই বিশৃঙ্খলা নিরসনে টিআইবি বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: জাতীয় ই-বর্জ্য ইনভেন্টরি প্রণয়ন করা; বর্ধিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা (ইপিআর) নিশ্চিত করা; পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিটিআরসিসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সমন্বয় জোরদার করা এবং বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
গণমাধ্যম যোগাযোগ:
মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম
পরিচালক, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন
মোবাইল: ০১৭১৩-১০৭৮৬৮
ই-মেইল: tauhidul@ti-bangladesh.org