বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নীতিগত দুর্বলতাকে সম্ভাবনায় রূপান্তরে সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান টিআইবির

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

চট্টগ্রাম, ২১ মে ২০২৬: বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বর্তমানে চরম নীতিগত দুর্বলতা ও প্রায়োগিক অরাজকতার শিকার বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আজ চট্টগ্রামে আয়োজিত এক অংশীজন সেমিনারে সম্প্রতি প্রকাশিত “বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়” শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরার সময় এই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সংস্থাটি জানায় দেশে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক পণ্য থেকে উৎপন্ন বিষাক্ত ই-বর্জ্যরে পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়লেও এর সঠিক ব্যবস্থাপনায় নীতিনির্ধারণী স্থবিরতা ও সুশাসনের তীব্র ঘাটতি বিদ্যমান।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), চট্টগ্রামের সহযোগিতায় আয়োজিত এই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, সনাক চট্টগ্রামের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো: দেলোয়ার হোসেন মজুমদার, টিআইবির পরিবেশ ও জলবায়ু অর্থায়ন বিভাগের কো-অর্ডিনেটর ড. নাবিল হক এবং রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট আব্দুলাহ্ জাহীদ ওসমানী। সেমিনারে গবেষণা প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য ও সুপারিশসমূহ তুলে ধরেন আব্দুল্লাহ্ জাহীদ ওসমানী। উপস্থপনায় উঠে আসে, বর্তমানে দেশে উৎপাদিত মোট ই-বর্জ্যরে প্রায় ৯৭ শতাংশই কোনো ধরনের প্রশাসনিক তদারকি ছাড়াই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপায়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে; যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ও নিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়ার আওতায় আসছে মাত্র ৩ শতাংশ বর্জ্য। ড. নাবিল হক এর সঞ্চালনায় সেমিনারে অংশগ্রহণকারীরা গবেষণায় উঠে আসা ফলাফল ও সুপারিশ সংক্রান্ত আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণ করেন। সেমিনারে পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়, বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কাস্টম হাউজের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের নেতৃবৃন্দ, জাহাজভাঙা শিল্পের প্রতিনিধিবৃন্দ, স্থানীয় সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীবৃন্দ এবং তারা নিজ নিজ খাতের বাস্তব চিত্র ও সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন।

ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার অপরিহার্য হলেও মেয়াদোত্তীর্ণ এসব পণ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা না করলে দেশ অচিরেই এক ভয়ংকর সংকটের সম্মুখীন হবে মন্তব্য করে সেমিনারে সনাক চট্টগ্রামের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো: দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, ‘বর্তমানে দেশে ই-বর্জ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত এবং এর পুনর্ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে হয়ে থাকে। এর ফলে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ঘটছে এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি চরম আকার ধারণ করছে। তাই ই-বর্জ্যরে ঝুঁকিকে শুধু পরিবেশ বা স্বাস্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শ্রমিক নিরাপত্তা, নগর ব্যবস্থাপনা এবং সুশাসনের একটি সমন্বিত ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না, এর বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে হবে। একইসঙ্গে নিরাপদ পুনর্ব্যবহার পদ্ধতি চালু, উৎপাদকদের আইনি জবাবদিহির আওতায় আনা এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহ খাতগুলোকে সরকারি তদারকির মাধ্যমে সুশৃঙ্খল করা অত্যন্ত জরুরি।’

ই-বর্জ্যের ঝুঁকি নিরসনে সরকারি-বেসরকারি অংশীজনের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশেই নয় সারা বিশ্বব্যাপী ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অগ্রগতি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। বৈশ্বিকভাবে প্রতিনিয়ত যে পরিমাণ ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, তার এক চতুর্থাংশেরও কম অংশ যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থাপনা বা রিসাইক্লিংয়ের আওতায় আসে। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের শুধু সচেতন হলেই চলবে না। সচেতনতা অবশ্যই প্রয়োজনীয়, তবে কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের দায়বদ্ধতা এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এই দুটি বিষয়ের সঠিক সমন্বয়ের মাধ্যমেই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। সকল অংশীজনের সম্মিলিত সচেতনতা এবং কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ই-বর্জ্যের সংকটকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করে একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।’

গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১-এ বিভিন্ন অংশীজনের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হলেও এর বাস্তবায়ন নগণ্য। ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী ও আমদানিকারকদের মাধ্যমে ই-বর্জ্য সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপন, তহবিল গঠন, জনসচেতনতা কার্যক্রমের কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে আসা পুরাতন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বিক্রয় বা ব্যবহার বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি, সোলার প্যানেল, ব্যাটারি চালিত খেলনা, ড্রোন ইত্যাদি থেকে সৃষ্ট ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো পরিকল্পনা এখন পর্যন্ত গ্রহণ করা হয়নি।

বিদ্যমান এই অরাজকতা নিরসনে টিআইবি ১২ দফা সুপারিশ পেশ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ই-বর্জ্য বিধিমালা ও বাসেল কনভেনশনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে অবৈধ আমদানি ও রপ্তানি বন্ধ করা; তদারকি সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ছাড়পত্র ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া ডিজিটাল করার মাধ্যমে দুর্নীতি বন্ধ করা; বিটিআরসি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমস্বয়ে ‘ওয়ান-স্টপ’ সেবা চালু করে তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা; এবং সোলার প্যানেল ও ইলেকট্রিক যানবাহনের বর্জ্য মোকাবিলায় দ্রুত একটি দীর্ঘমেয়াদী ‘ই-বর্জ্য রোডম্যাপ’ প্রণয়ন করা।

গণমাধ্যম যোগাযোগ:
মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম
পরিচালক, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন
মোবাইল: ০১৭১৩-১০৭৮৬৮
ই-মেইল: tauhidul@ti-bangladesh.org


অন্যান্য প্রেস বিজ্ঞপ্তি