স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে খসড়া আইন ২০২৬-এর ২৪ দফা সংশোধনের আহ্বান এইচআরএফবি ও টিআইবির

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি

ঢাকা,০২ জুলাই ২০২৬: জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী সরকার ১৭ মে ‘‘জাতীয় মানবাধিকার আইন, ২০২৬’’- এর একটি খসড়া প্রণয়ন করে ‘‘আইন ও বিচার বিভাগের’’ ওয়েবসাইটে প্রকাশের মাধ্যমে সর্বসাধারণের মতামত সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। খসড়াটিতে কয়েকটি নতুন ধারা যুক্ত হয়েছে, যা ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারিকৃত অধ্যাদেশের তুলনায় কিছু ক্ষেত্রে উন্নততর সম্ভবনা সৃষ্টি করেছে। তবে খসড়া আইনটিতে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা সরকারি প্রভাবমুক্ত একটি প্রকৃত স্বাধীন ও কার্যকর জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘকাল লালিত জনআকাঙ্খার পরিপন্থী এবং প্যারিস নীতিমালা ও আর্ন্তজাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এক্ষেত্রে হিউম্যান রাইটস ফোরাম (এইচআরএফবি) ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত খসড়া আইনটির যেসব ধারা কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে উদ্বেগজনক ও কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিতের পথে অন্তরায় হতে পারে, সে বিষয়ে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরাসহ গুরুত্বসহকারে সংশোধনের জন্য সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছে-

স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা (ধারা ৩)

পর্যবেক্ষণ: জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর এ সংশ্লিষ্ট ধারা থেকে “কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা হইবে যাহা সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীনে হইবে না” বাক্যাংশটি খসড়া আইন থেকে বাদ দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ কর্তৃক কমিশনকে করায়ত্তের সুযোগ সৃষ্টি; যা প্যারিস নীতিমালার ‘একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান গঠন এবং স্বাধীনভাবে এর দায়িত্ব পালন করার’ নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

সুপারিশ-১: খসড়া আইনের ধারা ৩(২)-এ “কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা হবে, যা সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের আওতাধীন থাকবে না”- এরূপ বিধান যুক্ত করতে হবে।

কমিশনের কার্যাবলী: অনুসন্ধান, পরিদর্শন ও তদন্তের ক্ষমতা (ধারা ১৩)

পর্যবেক্ষণ: বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী, গোয়েন্দা ও নজরদারি সংস্থা এবং সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য আটকস্থল, যেখানে গুমসহ বিভিন্ন নির্যাতনের জন্য আটককৃত ব্যক্তিদের রাখার সম্ভাবনা রয়েছে, এমন স্থানসমূহের নিয়মিত অনুসন্ধান, পরিদর্শন ও তদন্ত করা এবং এইরূপ স্থান ও অবস্থার উন্নয়নের জন্য সরকারের নিকট প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করা, এ সকল স্থান আইনবহির্ভূত হলে তা বন্ধ করা ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ করা ইত্যাদি বিষয় খসড়া আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় অন্তর্ভুক্ত না করা।

সুপারিশ-২: খসড়া আইনের ধারা ১৩-তে “সকল আইন প্রয়োগকারী, গোয়েন্দা ও নজরদারি সংস্থা এবং সামরিক বাহিনীর সম্ভাব্য আটকস্থল, যেখানে গুমসহ বিভিন্ন নির্যাতনের জন্য আটককৃত ব্যক্তিদের রাখার সম্ভাবনা রয়েছে, এমন স্থানসমূহের নিয়মিত অনুসন্ধান, পরিদর্শন ও তদন্ত করা এবং এইরূপ স্থান ও অবস্থার উন্নয়নের জন্য সরকারের নিকট প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা এবং এসকল স্থান আইনবহির্ভূত হলে, তা বন্ধ করা ও দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সরকারের নিকট সুপারিশ করার বিধান যুক্ত করতে হবে।

শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের অনুসন্ধান ও তদন্তের এখতিয়ার (ধারা ২০)

পর্যবেক্ষণ:

  • ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে অন্তর্ভুক্ত শৃঙ্খলা বাহিনী বা এর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন অনুসন্ধান ও তদন্ত করা এবং অনুসন্ধান বা তদন্ত শেষে শাস্তির পরিমাণ, ক্ষতিপূরণ বা প্রশাসনিক আদেশ, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করার ক্ষমতা বাদ দেওয়া।
  • খসড়া আইনে শৃঙ্খলা-বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশনের অনুসন্ধান ও তদন্তের এখতিয়ার সংকুচিত করে শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট বাহিনী প্রধান বা সরকারের নিকট হতে প্রতিবেদন চাওয়া এবং উক্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বাহিনী প্রধান বা সরকারের নিকট সুপারিশ প্রদানের মধ্যে সীমিত করা।
  • আইনের এই ধারা মূলত ২০০৯ সালের আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার হুবহু প্রতিস্থাপন, যা প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

সুপারিশ-৩: খসড়া আইনের ধারা ২০ বাতিল করে কমিশনকে “শৃঙ্খলা বাহিনী বা এর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ও তদন্ত করা; এবং অনুসন্ধান বা তদন্ত শেষে শাস্তির পরিমাণ, ক্ষতিপূরণ বা প্রশাসনিক আদেশ, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ প্রদান” করার ক্ষমতা সংবলিত বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

অভিযোগ তদন্ত ও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের এখতিয়ার (ধারা ১৬)

পর্যবেক্ষণ: ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে “অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্য হলে তাকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আদালত বা ট্রাইব্যুনাল বা, ক্ষেত্রমতে, কমিশনের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে এবং এক্ষেত্রে সরকার বা সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে না” এমন বিধান থাকলেও ২০২৬ সালের খসড়া আইনে এ বিষয়ক সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকা।

সুপারিশ-৪: খসড়া আইনের ধারা ১৬-তে “অভিযুক্ত ব্যক্তি সরকারি কর্মচারী বা শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্য হলে তাকে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে আদালত বা ট্রাইব্যুনাল বা, ক্ষেত্রমত, কমিশনের পূর্বানুমতি গ্রহণ করতে হবে এবং এক্ষেত্রে সরকার বা সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতির প্রয়োজন হবে না”- এরূপ বিধান যুক্ত করতে হবে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আমলে নেওয়া (ধারা ১৬)

পর্যবেক্ষণ:

  • খসড়া আইনে কোনো অভিযোগ দায়ের বা তথ্য প্রাপ্তির পরবর্তী ১৫ (পনেরো) দিনের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনার ‘স্বীয় বিবেচনায়’ উক্ত অভিযোগ আমলে নেওয়ার উপযুক্ত মনে করলে একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করার বিধান যুক্ত করার ফলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বা রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো অভিযোগকে আমলে নেওয়া বা না নেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি
  • গণমাধ্যম বা অন্য উৎসে মানবাধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কিত প্রকাশিত তথ্য স্বপ্রণোদিত হয়ে আমলে নেওয়া এবং কমিশন বিষয়টি আমলে না নিলে করণীয় কী, তা এই ধারায় সুস্পষ্ট করা হয়নি।
  • সুপারিশ-৫: খসড়া আইনের ধারা ১৬-তে “কোনো অভিযোগ প্রাপ্ত হলে অথবা গণমাধ্যমসহ অন্য যে কোনো মাধ্যম হতে মানবাধিকার লঙ্ঘন-সম্পর্কিত তথ্যের ভিত্তিতে কমিশন অনুসন্ধান বা তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে”- এরূপ ধারা যুক্ত করতে হবে।
  • সুপারিশ-৬: “গণমাধ্যম বা অন্য উৎস থেকে প্রাপ্ত মানবাধিকার লঙ্ঘন-সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশিত হলে এবং কমিশন বিষয়টি আমলে না নিলে, তার কারণ লিপিবদ্ধ করে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে”- এরূপ সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত করতে হবে।
  • অভিযোগ গ্রহণ (ধারা ১৫)

    পর্যবেক্ষণ: খসড়া আইনে নারী, শিশু, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধিতাসহ ব্যক্তি এবং প্রান্তিক বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীদের ঝুঁকি ও সংবেদনশীলতা বিবেচনায়, তাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ গ্রহণ সহজীকরণে কোনো বিশেষ বিধান রাখা হয়নি।

    সুপারিশ-৭: ঝুঁকি ও স্পর্শকাতর/সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নারী, শিশু, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধিতাসহ ব্যক্তি এবং প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও প্রতিকারে বিশেষ বা পৃথক “সেল” গঠন করার বিধান যুক্ত করতে হবে। সেইসাথে দুর্গম ও প্রান্তিক এলাকায় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ গ্রহণে নির্দিষ্ট সময় অন্তর কমিশন কর্তৃক সংশ্লিষ্ট এলাকায় “মোবাইল টিম” প্রেরণের বিধান যুক্ত করতে হবে।

    মধ্যস্থতা ও সমঝোতাকারীর নিয়োগের পদ্ধতি এবং ক্ষমতা নির্ধারণের প্রবিধান জারির এখতিয়ার (ধারা ১৮)

    পর্যবেক্ষণ: খসড়া আইনে অভিযোগ মধ্যস্থতা ও সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা ও সমঝোতাকারীর নিয়োগের পদ্ধতি এবং ক্ষমতা প্রবিধান দ্বারা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, যা কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব করার ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।

    সুপারিশ-৮: খসড়া আইনের ধারা ১৮(৩)-এ মধ্যস্থতা ও সমঝোতাকারীর নিয়োগের পদ্ধতি এবং ক্ষমতা প্রবিধান দ্বারা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে ‘‘সরকারের অনুমোদন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা’’ সংবলিত বিধান বাতিল করতে হবে।

    কমিশনার নিয়োগ বাছাই কমিটি গঠন (ধারা ৭)

    পর্যবেক্ষণ: খসড়া আইনে কমিশনার নিয়োগ বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে স্পীকার, দুইজন মন্ত্রী, একজন সরকারি দলের সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে অন্তর্ভুক্ত করার ফলে কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি দলের তথা নির্বাহী বিভাগের আধিপত্য বা প্রভাব প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার কমিশনকে নিয়ন্ত্রণ, কমিশনের নিয়োগ-প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হওয়া ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করবে।

    সুপারিশ-৯: জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুসারে বাছাই কমিটির সদস্য হিসেবে “প্রধান বিচারপতি কর্তৃক মনোনীত আপীল বিভাগের একজন বিচারক (যিনি বাছাই কমিটির সভাপতি), সরকারি দল ও বিরোধী দল কর্তৃক মনোনীত জাতীয় সংসদের দুই জন সংসদ সদস্য; বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন কর্তৃক মনোনীত বাংলাদেশের স্বীকৃত কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ও মানবাধিকার বিষয়ে গবেষণার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন অধ্যাপক; জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি বা তদকর্তৃক মনোনীত মানবাধিকার বিষয়ে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন সাংবাদিক প্রতিনিধি; রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত মানবাধিকার সংরক্ষণ বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন নাগরিক প্রতিনিধি এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্য হতে তাদের অধিকার রক্ষায় কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই মনোনয়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি, মানবাধিকার রক্ষায় নিয়োজিত ফোরাম/সংস্থা/প্লাটফরম এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করে এমন ফোরাম/সংস্থা/প্লাটফরম নিকট থেকে সম্ভাব্য সদস্যদের তালিকা আহ্বান করবেন।

    সুপারিশ-১০: নিয়োগ-প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে ধারা ৭ (১)-এ উল্লিখিত বাছাই কমিটির সদস্যের ক্ষেত্রে ‘‘দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত’’ শব্দগুলো যুক্ত করতে হবে।

    চেয়ারপার্সন ও কমিশনার বাছাই প্রক্রিয়া (ধারা ৮)

    পর্যবেক্ষণ:

    • খসড়া আইনে চেয়ারপার্সন ও কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছপ্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে বাছাইপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দাখিলকৃত দরখাস্ত যাচাই-বাছাইয়ে নির্ধারিত নৈর্ব্যক্তিক মানদণ্ড, নাম-পরিচয়সহ প্রাথমিকভাবে বাছাইকৃত প্রার্থীদের তালিকা এবং রাষ্ট্রপতির নিকট সুপারিশকৃত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয়সহ তালিকা ইত্যাদি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করার বিধান যুক্ত করা হয়নি।
    • ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে থাকা বাছাই কমিটি কর্তৃক সংক্ষিপ্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার বিধানটি নতুন খসড়া থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

    সুপারিশ-১১: খসড়া আইনের ধারা ৮-এ স্বচ্ছপ্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে বাছাইপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দাখিলকৃত দরখাস্ত যাচাই-বাছাইয়ের নৈর্ব্যক্তিক মানদণ্ড, নাম-পরিচয়সহ প্রাথমিকভাবে বাছাইকৃত প্রার্থীদের তালিকা, এবং রাষ্ট্রপতির নিকট সুপারিশকৃত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয়সহ তালিকা ইত্যাদি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা বিষয়ক এই উপ-ধারা যুক্ত করতে হবে।

    সুপারিশ-১২: বাছাই কমিটি কর্তৃক সংক্ষিপ্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করার বিধান যুক্ত করতে হবে।

    চেয়ারপার্সন ও কমিশনারগণের নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অযোগ্যতা (ধারা ৬)

    পর্যবেক্ষণ:

    • খসড়া আইনে একজন সরকারি কর্মচারীকে স্বীয় পদে চাকরিরত থাকা অবস্থায় ছুটি নিয়ে কমিশনার হিসেবে নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি; যা স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত ও নিরপেক্ষভাবে কমিশনের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্তরায় এবং প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
    • এ ছাড়া এই ধারায় ‘কমিশনার নিয়োগে যোগ্যতার মানদণ্ড হিসেবে পেশাগত জীবনে দলনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার রক্ষা, সততা ও শুদ্ধাচার পালনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, এমন ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি উপেক্ষিত।
    • প্রস্তাবিত আইনে চেয়ারপার্সন ও কমিশনারদের বয়সসীমা উল্লেখ নেই।

    সুপারিশ-১৩: খসড়া আইনে [ধারা ৬(৩) (গ)] উল্লিখিত একজন সরকারি কর্মচারীকে স্বীয় পদে চাকরিরত থাকা অবস্থায় ছুটি নিয়ে কমিশনার হিসেবে নিয়োগের সুযোগ সংবলিত বিধান বাতিল এবং একইসঙ্গে কমিশনার নিয়োগের যোগ্যতা হিসেবে “পেশাগত জীবনে দলনিরপেক্ষতা, মানবাধিকার রক্ষা, সততা ও শুদ্ধাচার পালনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, এমন ব্যক্তিকে নিয়োগ করা হবে” এমন ধারা যুক্ত করতে হবে।

    সুপারিশ-১৪: কমিশনারদের বয়সসীমা সর্বনিম্ন ৩৫ থেকে সর্বোচ্চ ৭৫ বছর করতে হবে।

    চেয়ারপার্সন ও কমিশনারগণের অপসারণ (ধারা ৯)

    পর্যবেক্ষণ: খসড়া আইনে বলা হয়েছে সুপ্রীম কোর্টের একজন বিচারক যেরূপ পদ্ধতিতে অপসারিত হতে পারেন, সেরূপ পদ্ধতি ব্যতীত চেয়ারম্যান বা কোনো কমিশনারকে অপসারণ করা যাবে না এবং সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এতদুদ্দেশ্যে চেয়ারম্যান ও কমিশনারগণের জন্য অনুসরণীয় আচরণবিধি প্রণয়ন করবে। তবে খসড়ায় কী কারণে তাদের অপসারণ করা হবে, কোন পদ্ধতিতে তদন্ত করা হবে, তা সুস্পষ্ট করা হয়নি।

    সুপারিশ-১৫: খসড়া আইনে চেয়ারপার্সন ও কমিশনারগণের অপসারনের পদ্ধতি আরও সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ করতে হবে। একইসঙ্গে, কমিশনের চেয়ারপারসন কিংবা কমিশনারগণকে অপসারণের ক্ষেত্রে যুক্তিযুক্ত কারণ সুস্পষ্ট করতে হবে এবং তদন্ত পদ্ধতি ও তদন্ত কর্তৃপক্ষও সুনির্দিষ্ট করতে হবে।

    কমিশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ (ধারা ৩১)

    পর্যবেক্ষণ:

    • খসড়া আইনে কমিশনের লিখিত অনুরোধের ভিত্তিতে এবং কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে, কমিশনের মোট জনবলের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি বা সরকারি কর্মচারীকে, কমিশনে, প্রেষণে নিয়োগের বিধান যুক্ত করার ফলে কমিশনের স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা বা প্রভাবমুক্ত বা সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ত তদন্ত কার্যক্রম নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ঝুঁকি সৃষ্টি, যা প্যারিস নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
    • কমিশনের এই ধরনের পদে নিয়োগ-প্রক্রিয়াও সর্বদা সবার জন্য উন্মুক্ত, স্পষ্ট, স্বচ্ছ, স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত, ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হতে হবে, এমন বিধান খসড়া আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

    সুপারিশ-১৬: খসড়া আইনের ধারা ৩১-এ “প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি বা সরকারি কর্মচারীকে কমিশনে বা কমিশনের তদন্ত দলে প্রেষণে নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা ১০ শতাংশ হবে, এবং এক্ষেত্রে কী কারণে কমিশন বা কমিশনের তদন্ত দলে সরকারী কর্মচারীদের প্রেষণে নিয়োগ করা হচ্ছে, তা প্রকাশ করতে হবে। কোনো সরকারি কর্মচারীরকে প্রেষণে নিয়োগের ক্ষেত্রে কমিশনের দ্বিমত থাকলে কমিশন এ ধরনের নিয়োগ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে পারবে এবং এই ধরনের পদে নিয়োগ প্রক্রিয়াও সর্বদা সবার জন্য উন্মুক্ত, স্পষ্ট, স্বচ্ছ, যোগ্যতার ভিত্তিতে হতে হবে”- এরূপ বিধান যুক্ত করতে হবে।

    কমিশন গঠনে বহুত্ববাদী প্রতিনিধিত্ব (ধারা ৫)

    পর্যবেক্ষণ:

    • ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে কমিশনারগণের মধ্যে কমপক্ষে এক জন ‘‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর’’ বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং কমপক্ষে দুইজন নারী কমিশনার রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও খসড়া আইনে কমিশনার হিসেবে ‘‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’’ বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী এবং নারীদের অন্তর্ভুক্তির বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। একইসঙ্গে, নারীদের অন্তর্ভুক্তির বাধ্যবাধকতার যে বিধান রাখা হয়েছিলো, তার পরিবর্তে ‘‘যোগ্য প্রার্থী’’ প্রাপ্তির শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যা কমিশনকে ‘‘পুরুষতান্ত্রিক’’ ও ‘‘সংখ্যাগরিষ্ঠতান্ত্রিক’’ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে।
    • প্যারিস নীতিমালায় জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান গঠনে মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রসারে সম্পৃক্ত (নাগরিক সমাজের) সামাজিক শক্তিগুলোর বহুত্ববাদী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতের নীতির সঙ্গে এই ধারা সাংঘর্ষিক।

    সুপারিশ-১৭: খসড়া আইনের ধারা ৫-এ কমিশনের চেয়ারপারসন ও কমিশনারগণ নিয়োগের ক্ষেত্রে কমপক্ষে একজন ‘‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর’’ বা প্রতিবন্ধিতাসহ ব্যক্তি ও জেন্ডার বৈচিত্র্যসহ অন্যান্য সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য, এবং কমিশনে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করতে কমপক্ষে দুইজন নারী কমিশনার রাখার সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত করতে হবে।

    কমিশনের কার্যালয় প্রতিষ্ঠা ও সম্প্রসারণের এখতিয়ার (ধারা ৪)

    পর্যবেক্ষণ: ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে ঢাকায় কমিশনের প্রধান কার্যালয়সহ প্রতিটি বিভাগে বিভাগীয় কার্যালয় এবং কমিশনের প্রয়োজনে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কার্যালয় স্থাপনের এখতিয়ার প্রদান করা হলেও খসড়া আইনে ঢাকার বাইরে বিভাগীয় পর্যায়ে কমিশনের কার্যালয় স্থাপনের বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়া এবং কমিশনের কার্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্ব অনুমোদন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা যুক্ত করা।

    সুপারিশ-১৮: খসড়া আইনের ধারা ৪-এ “কমিশনের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় হবে এবং প্রতি বিভাগে এর বিভাগীয় কার্যালয় থাকবে এবং কমিশন প্রয়োজনে, জেলা, উপজেলা ও ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় অন্য যে কোনো স্থানে কার্যালয় স্থাপন করতে পারবে”- এরূপ বিধান যুক্ত করতে হবে এবং কার্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে সরকারের পুর্বানুমোদন গ্রহণের বাধ্যবাধকতা বাতিল করে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সুসংহত করতে হবে।

    কমিশনের কার্যাবলী (ধারা ১৩)

    পর্যবেক্ষণ:

    • খসড়া আইনে সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সংস্কৃতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে কমিশনের সুনির্দিষ্ট প্রতিরোধমূলক ভূমিকা যেমন, বিভিন্ন অংশীজনদের (নাগরিক সমাজ বা এনজিওর) সাথে সম্পৃক্ততা, জনসচেতনতা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা ইত্যাদি বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত না করা।
    • এ ছাড়া অনগ্রসর ও ঝুঁকিপূর্ণ (ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী, প্রতিবন্ধীতাসহ ব্যক্তি, জেন্ডার বৈচিত্র্যসহ নারী, শিশু, কৃষক, শ্রমিক ইত্যাদি) জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিতকরণ, বাস্তবায়ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও এর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কোনো কাঠামোগত ব্যবস্থা না রাখা।
    • ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে থাকা কমিশনের সুনির্দিষ্ট কার্যাবলীর মধ্যে থেকে মানবাধিকার সংরক্ষণে নিয়োজিত ব্যক্তিদের সুরক্ষা প্রদানের বিষয়টি বাদ দেওয়া হয়েছে।
    • কমিশনকে নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে লাভজনক কোনো ব্যবসা হতে আয় করার বিধান দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এক্ষেত্রে কোন ধরনের কার্যাবলী বা ব্যবসা সেটা পরিষ্কার করা হয়নি, যা স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টির ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের কার্যক্রম কমিশনের মূল উদ্দেশ্য অর্জনকে ব্যাহত করতে পারে।

    সুপারিশ-১৯: খসড়া আইনের কমিশনের কার্যাবলীর মধ্যে (ধারা ১৩) নিম্নোক্ত বিষয়গুলো যুক্ত করতে হবে-

    • ১৯.১ মানবাধিকার নিয়ে কর্মরত নাগরিক সমাজ বা এনজিও- এর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা;
    • ১৯.২ মানবাধিকার রক্ষা-সম্পর্কিত শিক্ষা কার্যক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তা করা;
    • ১৯.৩ মানবাধিকারের বিষয়ে প্রচারণা করা;
    • ১৯.৪ আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানের সঙ্গে সংবিধান বা আপাতঃ বলবৎ কোনো আইন বা প্রস্তাবিত নতুন আইন পর্যালোচনা করা এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো বিধান থাকলে, তা সংশোধন, পরিবর্তন ও পরিমার্জনের জন্য সরকারের নিকট সুপারিশ করার ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।
    • ১৯.৫ অনগ্রসর ও ঝুঁকিপূর্ণ (ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী, প্রতিবন্ধীতাসহ ব্যক্তি, জেন্ডার বৈচিত্র্যসহ নারী, শিশু, কৃষক, শ্রমিক ইত্যাদি) জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিতকরণ, বাস্তবায়ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও এর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুনির্দিষ্ট কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে।
    • ১৯.৬ মানবাধিকার সংরক্ষণে নিয়োজিত ব্যক্তিদের (Human rights defenders) সুরক্ষা প্রদানে পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং মানবাধিকার প্রয়োগের লক্ষ্যে কর্মরত সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণভাবে নাগরিকদের পরামর্শ ও সহায়তা প্রদান করা; একইসঙ্গে মানবাধিকার সংরক্ষণে বিভিন্ন বিষয়ে মানবাধিকার কমিশন নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের পরামর্শ গ্রহণ করবে।
    • ১৯.৭ খসড়া আইনের কমিশনের কার্যাবলীর মধ্যে থেকে কমিশনকে নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে লাভজনক কোনো ব্যবসা হতে আয় করার অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় ধারা [ধারা ১৩ (ট)] বাদ দিতে হবে।

    কমিশনের কার্যাবলির বার্ষিক প্রতিবেদন (ধারা ২৬)

    পর্যবেক্ষণ: জনপ্রতিনিধি স্তরে মানবাধিকার সম্পর্কিত সচেতনতা বৃদ্ধি ও মানবাধিকার সুরক্ষায় সংসদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের বিষয় খসড়া আইনে যুক্ত করা হয়নি।

    সুপারিশ-২০: কমিশনের জবাবদিহি ও অধিকতর কার্যকরতা নিশ্চিতে বার্ষিক প্রতিবেদন জাতীয় সংসদের স্পিকারের মাধ্যমে সরাসরি সংসদে উপস্থাপনের জন্য সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত করতে হবে। সেইসাথে প্রতিবেদন মূল্যায়ন এবং কমিশনের পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সহিত অন্তর্ভুক্তিমূলক মতবিনিময় সভার পাশাপাশি গণশুনানী আয়োজনের বিধান যুক্ত করতে হবে।

    কমিশনের আর্থিক স্বাধীনতা (ধারা ৩৬)

    পর্যবেক্ষণ:

    • ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে বার্ষিক বরাদ্দ নির্ধারণের আগে সরকারকে কমিশন প্রদত্ত নিজস্ব বাজেট প্রস্তাব প্রদান এবং সরকারকে তা বিবেচনা করার বাধ্যবাধকতা রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা হলেও খসড়া আইনে কমিশনের বাজেট একতরফাভাবে সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে।
    • নির্বাহী হস্তক্ষেপ থেকে সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রদান করার জন্য ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে সংবিধানের ৮৮ নং অনুচ্ছেদের অধীনে কমিশনারগণের প্রদেয় পারিশ্রমিক ও ভাতাদি সংযুক্ত তহবিলের উপর দায়যুক্ত ব্যয় হিসেবে পরিশোধের বিধান থাকলেও খসড়া আইনে তা সম্পূর্ণরূপে বাতিল; খসড়া আইনে এর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা এবং পদ্ধতিগত সুরক্ষাব্যবস্থা না রেখে বাজেটের পরিমাণ এবং কমিশনারদের পারিশ্রমিক উভয়ের ওপরই নির্বাহী বিভাগের পূর্ণ স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।

    সুপারিশ-২১: খসড়া আইনের ধারা ৩৬(১) সংশোধন করে “সরকার প্রতি অর্থবছরে কমিশনের ব্যয়ের জন্য কমিশন হতে প্রাপ্ত প্রস্তাব তার অনুকূলে সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত ব্যয় হিসেবে বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করবে এবং অনুমোদিত ও নির্ধারিত খাতে উক্ত বরাদ্দকৃত অর্থ হতে ব্যয় করার ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন গ্রহণ করা কমিশনের জন্য আবশ্যক হবে না।”- এরূপ বিধান যুক্ত করতে হবে।

    সুপারিশ-২২: খসড়া আইনে কমিশনের ওপর নির্বাহী হস্তক্ষেপ থেকে সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রদানের জন্য ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের ন্যায় “সংবিধানের ৮৮ নং অনুচ্ছেদের অধীনে কমিশনারগণের প্রদেয় পারিশ্রমিক ও ভাতাদি সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায়যুক্ত ব্যয় হিসেবে পরিশোধের” বিধান সংযুক্ত করতে হবে।

    মানবাধিকার কমিশন তহবিল (ধারা ৩৫)

    পর্যবেক্ষণ: ধারা ৩৫(৪) এর দফা (গ), (ঘ), (ঙ) ও (চ) - এ উল্লেখিত কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত অনুদান ও অন্য কোনো উৎস হইতে প্রাপ্ত অর্থ গ্রহণের অস্পষ্ট ও বিস্তৃত বিধানের ফলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেইসাথে সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হওয়ায় রাষ্ট্রীয় তহবিল প্রাপ্তির সুযোগ থাকার পরেও কমিশনের ওপর তহবিল সংগ্রহের মতো অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় দায়িত্বের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

    সুপারিশ-২৩: কমিশনের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে তহবিল সংগ্রহ সংশ্লিষ্ট “অন্য কোনো” অস্পষ্ট ও বিস্তৃত বিধান বাতিল করতে হবে।

    বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা (ধারা ৪০)

    পর্যবেক্ষণ: খসড়া আইনে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা সরকারকে প্রদান করা হয়েছে, যা কমিশনের স্বাধীনতাকে খর্ব করে; এর মাধ্যমে সরকার কর্তৃক কমিশনের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

    সুপারিশ-২৪: খসড়া আইনে কমিশনের স্বাধীনতাকে সম্মুন্নত রাখার জন্য খসড়া আইনের ধারা ৪০ সংশোধন করে “এই অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, কমিশন, রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, প্রবিধান প্রণয়ন করতে পারবে। তবে শর্ত থাকে যে, প্রবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত, কমিশন লিখিত আদেশ দ্বারা যে পদ্ধতি নির্ধারণ করবে, কমিশন তার কার্য নির্বাহের ক্ষেত্রে উক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করবে” - এরূপ ধারা যুক্ত করতে হবে।

    পরিতাপের বিষয়, একদিকে সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মানবাধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার করেছে, সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার কোনো প্রচেষ্টা আলোচ্য খসড়ায় যেমন প্রতিফলিত হয়নি। তেমনিভাবে যে অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে বিগত কর্তৃত্ববাদী সময়ে দেশবাসী, এখনকার সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের প্রায় সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীগণ গেছেন, সেই অভিজ্ঞতার থেকেও আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেছেন বলে মনে হচ্ছে না। তাই বিগতসময়ের অভিজ্ঞতা ও ইশতেহারে ঘোষিত অঙ্গীকার অনুযায়ী আলোচ্য খসড়াটির যে সকল বিতর্কিত ধারাসমূহের ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হয়েছে, তা যথাযথভাবে বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর ও স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠায় সরকার আন্তরিক হবে"এই প্রত্যাশা করছি।

    * হিউম্যান রাইটস ফোরাম (এইচআরএফবি)- এর সদস্য সংস্থাসমূহ:

    • আইন ও সালিশ কেন্দ্র (ASK)
    • অ্যাসিড সারভাইর্ভাস ফাউন্ডেশন (ASF)
    • বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (BLAST)
    • বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ (BMP)
    • অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ALRD)
    • নিজেরা করি
    • নাগরিক উদ্যোগ
    • মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (MSF)
    • বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম
    • কাপেং ফাউন্ডেশন
    • ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স (BTS)
    • বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (BILS)
    • কর্মজীবী নারী
    • বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী অধিকার আন্দোলন (BDERM)
    • বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (BSWS)
    • স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্ট
    • ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)
    • মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (MJF)
    • নারীপক্ষ
    • ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অব ডিজ্যাবলড পিপলস অর্গানাইজেশন (NADPO)

    ফোরামটির সচিবালয়ের দায়িত্ব পালন করে থাকে আইন ও সালিশ কেন্দ্র