সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
ঢাকা, ২২ জানুয়ারি ২০২৬: অর্থ, পেশীশক্তি এবং ধর্মান্ধতার কাছে নারী প্রতিনিধিত্ব জিম্মি হওয়ার কারণে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে জুলাই সনদে প্রস্তাবিত ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা কোনো রাজনৈতিক দলই পূরণ করতে না পারায় হতাশা প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া দ্বৈত নাগরিকত্বের তথ্য, আয়, সম্পদ, ঋণ ও দায় বিবরণী কতটা সঠিক এবং আয় ও সম্পদ কতটা বৈধ উপায়ে অর্জিত তা যাচাইয়ের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। হলফনামায় প্রার্থীরা নিজেদের অর্জিত সম্পদ কতোটা দেখিয়েছেন, পুরোটা দেখিয়েছেন কি-না কিংবা দেশে বা বিদেশে সম্পদ আহরণের তথ্য গোপন করেছেন কিনা- তা যাচাই যেমন অনিবার্য, তেমনি যে আয় ও সম্পদ অর্জনের তথ্য হলফনামা বিশ্লেষণে পাওয়া যাচ্ছে তা বৈধ আয়ের সঙ্গে কতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ- এ বিষয়সমূহ যাচাইসাপেক্ষে জবাবদিহি নিশ্চিতের উদ্যোগ নিতে নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও রাজস্ব বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।
“নির্বাচনী হলফনামায় প্রার্থী পরিচিতি” বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ ও “নো ইওর ক্যান্ডিডেট” বা কেওয়াইসি ড্যাশবোর্ড উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে টিআইবির পক্ষ থেকে এ মন্তব্য করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের উপসমন্বয়ক জাফর সাদিক, সহসমন্বয়ক ও ড্যাশবোর্ড প্রস্তুতকারী রিফাত রহমান এবং কে. এম. রফিকুল আলম। প্রতিবেদন উপস্থাপনা করেন টিআইবির আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া বাধ্যতামূলক এবং হলফনামার সঙ্গে বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণও দাখিল করতে হয়। এবারের নির্বাচনে ২১জন প্রার্থী বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং তা ত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন হলফনামায়। কিন্তু টিআইবির নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা সত্ত্বেও কমপক্ষে দুজন প্রার্থী দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি হলফনামায় উল্লেখ করে করেননি। টিআইবির হস্তগত হওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা বৃটিশ নাগরিক ছিলেন। আরেকজন প্রার্থীর ঘোষিত নির্ভরশীলের নামে ২০১৩ সালে যুক্তরাজ্যে কেনা ১.৪ মিলিয়ন পাউন্ড বা (২১০ কোটি টাকা) মূল্যের বাড়ির সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে যা উক্ত প্রার্থীর হলফনামায় উল্লেখ করা হয়নি। নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী বাড়িটি কেনার ক্ষেত্রে শেল কোম্পানির আশ্রয় নেয়া হয়েছিলো, যার মূল মালিকানা কোম্পানির নিবন্ধন দেখানো হয়েছে আরব আমিরাতের দুবাইতে। আবার, একজন প্রার্থী বিদেশে তার নিজের কোনো সম্পদের তথ্য না দিলেও স্ত্রীর নামে দুবাইতে ফ্ল্যাটের মালিকানা রয়েছে। একজন প্রার্থী বিদেশে ৩টি ফ্ল্যাটের মালিকানা থাকার ঘোষণা দিলেও সংখ্যাটি কমপক্ষে তিনগুণ এবং বিনিয়োগের সম্ভাব্য পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। আরেকজন প্রার্থী বিদেশে নিজস্ব মালিকানায় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকার কথা স্বীকার না করলেও অনুসন্ধানে মোট ১১টি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। যার মধ্যে আটটিই বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যুক্ত। একজন প্রার্থীর করস্বর্গে (Tax heaven country) কোম্পানির নিবন্ধন থাকার পুরোনো তথ্য অনেকটাই প্রকাশিত থাকলেও এ বিষয়ে হলফনামায় কোনো ঘোষণা দেখা যায়নি।
হলফনামায় দাখিলকৃত তথ্য যাচাই করার সক্ষমতা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই, থাকলেও তার পূর্ণ ব্যবহার করা হয় না মন্তব্য করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রার্থীদের দাখিলকৃত হলফনামার তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের ব্যপক তারতম্য দেখা গেছে। হলফনামার মাধ্যমে যে তথ্য প্রদান করা হয় তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন আছে। তথ্য গোপন করা হয়েছে কি-না, প্রদর্শিত সম্পদ বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাকি দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত এবং দাখিলকৃত আয় বা সম্পদের বিপরীতে প্রদেয় করের পরিমাণ বাস্তবসম্মত কিনা- এই তিনটি বিষয় অনুসন্ধান করা জরুরি। তাতে করে জনগণের কাছে স্পষ্ট হবে তারা নির্বাচনে কেমন প্রার্থী পেতে যাচ্ছেন। কিন্তু এই তিনটির কোনোটিই কার্যত হয় না। আমরা আশা করি, নির্বাচন কমিশনসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ বিষয়গুলো যাচাই করে সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।’
টিআইবির হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। যাতে চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা ১৯৮১ জন, এবং তাদের প্রায় ১৩ শতাংশ স্বতন্ত্র। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রার্থীদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রার্থী মোট প্রার্থীর ৩৬ শতাংশের বেশি, বিগত ৫টি নির্বাচনের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। প্রতিবারের মতো এবারও নারী প্রার্থীদের অংশগ্রহণের হার নগণ্য এবং জুলাই সনদে প্রস্তাবিত ৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা কোনো রাজনৈতিক দলই পূরণ করতে পারেনি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘ইসলামপন্থী দলগুলোর প্রার্থীতা ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ ইসলামপন্থী দলের একজনও নারী প্রার্থী নেই। সার্বিকভাবে দলীয় প্রার্থীদের মধ্যে নারীদের হার মাত্র ৩.৩৮ শতাংশ, অথচ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে এই হার ১০ শতাংশ। অর্থাৎ যোগ্য এবং আগ্রহী নারী প্রার্থী নেই বলে রাজনৈতিক দলগুলো যে যুক্তি তোলে, তা ভিত্তিহীন। ইসলামপন্থী দলগুলো তো বটেই, বিএনপিসহ মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা-কেন্দ্রিক জোট রাজনীতির কারণে নারীরা মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছে। নির্বাচনে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে দলগুলোর ব্যর্থতার পেছনে রয়েছে অর্থ, পেশীশক্তি এবং ধর্মান্ধতার মতো রাজনৈতিক চালিকাশক্তি। এ সব আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই এমন মন্তব্য করা মোটেও অমূলক হবে না- নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ ও সংসদের নারী প্রতিনিধিত্বের প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতিকে ভূলুন্ঠিত করা হয়েছে।’
গণমাধ্যমের এক প্রশ্নের জবাবে ড. জামান বলেন, ‘অর্থ, পেশীশক্তি এবং ধর্মকে পুঁজি করে রাজনীতিকে কুক্ষিগত করার প্রচেষ্টারত শক্তির কারণে ক্রমাগত সুস্থ রাজনীতির সম্ভাবনা সংকুচিত হচ্ছে। ঋণখেলাপী ব্যবসায়ীদের বৈধতা দেওয়া নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্বের বরখেলাপ। মূলত কমিশনের সৎ সাহসের অভাবে ঋণখেলাপীদের মনোনয়ন অনুমোদন করা হয়েছে, যা নিন্দনীয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে খেলাপী ঋণের চর্চায় যারা শীর্ষে ছিল তারাই সংসদসহ রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ স্তর দখল করে কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করেছিল। এবারের নির্বাচিত সংসদেও যদি এ ধরনের চর্চা অব্যাহত থাকে, তা হবে চূড়ান্ত হতাশার। আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে নীতিকাঠামো পরিবর্তন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি থাকবে না-কি, নজিরবিহীন ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সম্ভাবনার বাস্তবায়ন হবে, সেটিই এখন বড়ো প্রশ্ন।’
প্রার্থীদের পেশা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৪৮ শতাংশের বেশি প্রার্থী মূল পেশা বিবেচনায় ব্যবসায়ী। আইন ব্যবসা ও শিক্ষকতা পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন যথাক্রমে ১২.৬১ এবং ১১.৫৬ শতাংশ প্রার্থী। রাজনীতিকে পেশা হিসেবে দেখিয়েছেন ১.৫৬ শতাংশ প্রার্থী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্যের ভিত্তিতে কোটিপতির সংখ্যা ৮৯১ জন। অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের মোট মূল্যের ভিত্তিতে ২৭ জন প্রার্থীর সম্পদ রয়েছে শত-কোটি টাকার ওপর। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর সাড়ে ২৫ শতাংশেরই কোনো না কোনো ঋণ বা দায় আছে। প্রার্থীদের সর্বমোট ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকার বেশি। সর্বশেষ পাঁচ নির্বাচনের মধ্যে এবার ঋণ বা দায়গ্রস্ত প্রার্থী সবচেয়ে কম হলেও, মোট ঋণের পরিমাণে তা সবচেয়ে বেশি। এরমধ্যে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে বর্তমানে মামলা আছে ৫৩০ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে, যা মোট প্রার্থীর ২২.৬৬ শতাংশ। আর অতীতে মামলা ছিলো ৭৪০ জন বা ৩১.৬৪ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে। এবার সকল দলের প্রার্থীদের ঘোষিত সর্বমোট নির্বাচনী ব্যয় ৪৬৩.৭ কোটি টাকা, প্রার্থী প্রতি গড় ব্যয় সাড়ে ২২ লাখ টাকা। ঘোষিত সবচেয়ে বেশি ব্যয় বিএনপির- মোট ১১৯.৫ কোটি টাকা, দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মোট ব্যয় ৮০.৬ কোটি টাকা। হলফনামা বিশ্লেষণে আরো দেখা যায়, ২৫৯ প্রার্থীর তুলনায় তাদের স্বামী-স্ত্রী /নির্ভরশীলদের অস্থাবর সম্পদ বেশি, ১১৮ প্রার্থীর তুলনায় তাদের স্বামী-স্ত্রী/নির্ভরশীলদের দালান বা ফ্ল্যাট সংখ্যা বেশি এবং ১৬৪ প্রার্থীর তুলনায় তাদের স্বামী-স্ত্রী/নির্ভরশীলদের জমির পরিমাণ বেশি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যাতে ভোটাররা তাদের নিজ আসনে থাকা প্রার্থীদের মধ্যে তুলনামূলক বিচারের মাধ্যমে সঠিক প্রার্থী বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। একইসঙ্গে হলফনামায় প্রদত্ত তথ্য পর্যাপ্ত কি-না বা বাস্তবতার সঙ্গে কতোটা সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশেষ করে প্রার্থীদের বৈধ আয় ও সম্পদের হিসাব যথাযথ কিনা কিংবা দেশে-বিদেশে নামে বেনামে অর্জিত সম্পদের তথ্য গোপন করা হয়েছে কি-না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যেমন- নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট ও রাজনৈতিক দলসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ স্ব স্ব এখতিয়ার অনুযায়ী ঘোষিত তথ্য পরীক্ষার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করাও টিআইবির এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। প্রতিবেদনের পাশাপাশি ইন্টারঅ্যাকটিভ ড্যাশবোর্ডটিও তৈরি করা হয়েছে।
ড্যাশবোর্ডের লিংক: https://www.ti-bangladesh.org/kyc । এর মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল প্রার্থীর সার্বিক, আসন ও দলভিত্তিক তুলনামূলক চিত্র দেখা যাবে।
গণমাধ্যম যোগাযোগ:
মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম
পরিচালক, আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন
মোবাইল: ০১৭১৩-১০৭৮৬৮
ই-মেইল: tauhidul@ti-bangladesh.org