• header_en
  • header_bn

 

Corruption increases poverty and injustice. Let's fight it together...now

 

ইয়েস সম্মেলনে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর বক্তব্যের প্রতিলিপি

ইয়েস সম্মেলনে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর বক্তব্যের প্রতিলিপি

উনি আমাকে ৭ মিনিট বেঁধে দিয়েছেন। আমি একটু ট্রেনের মতো লম্বা আমার বিষয়-টিশয়। আমার সবকিছুই একটু দেরীতে হয়। আমি কয়েকদিন আগে একটা অনুষ্ঠানে বলছিলাম, যে আমার সবকিছুই জীবনে এসেছে দেরী করে। যেমন, শৈশব এসেছে দেরী করে, কৈশোর এসেছে দেরী করে, প্রৌঢ়ত্ব এসেছে দেরী করে। সুতরাং বার্ধক্য যদি আসতেই হয়, (মাহফুজ আনাম: আমাদের আশা থাকবে যে আপনার মৃত্যু অনেক অনেক দেরী করে আসুক)। না মৃত্যু দেরি করে আসবে না, তোমারও না, আমারও না। আমার বক্তব্য হচ্ছে, সবই যেহেতু দেরী করে এসেছে, সুতরাং বার্ধক্যকে যদি আসতেই হয় তাহলে আমার মৃত্যুর পরই আসতে হবে।

৭ মিনিটে আমি আরম্ভ করতে পারি না, কী করে শেষ করবো বুঝি না। প্রথম কথা হলো তোমরা যারা তরুণ, তারা নিশ্চয়ই তরুণ, আমিও তরুণ।

আমি আসছিলাম যখন রাত্রে আামার ঘুম হয় নাই ঘুমের মধ্যেই আমার মনে হলো একটা প্রশ্ন- দুর্নীতি জিনিসটা কী? আমি এসে টিআইবির চেয়ারপার্সনকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা - এই যে চোরেরা যে চুরি করে, ডাকাতরা যে ডাকাতি করে, মাহফুজ আনামও পাশে ছিল, এটা কি দুর্নীতি? আমার মনে হয় এটা দুর্নীতি নয়। কারণ দুর্নীতি শব্দটার সঙ্গে একটা শব্দ যুক্ত আছে তার নাম হচ্ছে নীতি। চোরের কোন নীতি নেই, ডাকাতের কোন নীতি নেই। সুতরাং দুর্নীতি সেই মানুষটি করেন যার নীতি আছে। যিনি মন্ত্রী শপথ গ্রহন করেন, যে আমি, শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ সকলের প্রতি সমান বিচার করবো। তিনি শপথ করে যখন অন্যায় করেন তখন সেটা দুর্নীতি।

কোন সরকারি কর্মকর্তা আমি সেদিন বেড়িবাঁধের ওখান দিয়ে আসছিলাম আশুলিয়া থেকে মিরপুরের দিকে। দেখলাম একটা পুলিশের চৌকি বসানো। বেশ কিছু পুলিশ সেখানে আছে। এবং প্রত্যেকটা গাড়িকে থামাচ্ছে। আমাদের মতো ছোট ছোট গাড়িগুলোকে ছেড়ে দিচ্ছে, কিন্তু বড় গাড়ি হলেই, আমরা দেখছি, একজন যেয়ে ড্রাইভারের দিকে হাত বাড়াচ্ছে ড্রাইভার যেন কী দিচ্ছে, তিনি সেটা আবার এসে গুনতে গুনতে কার কাছে দিচ্ছেন। তার চাকরিই হচ্ছে, অর্থাৎ তাকে ঐখানে বসানোই হয়েছে যেন ঐ রাস্তাটা নিরাপদ হয়। কিন্তু তারা যে কাজটা করছেন সে কাজটা হচ্ছে প্রত্যেকটা গাড়ির কাছ থেকে তারা জোর করে টাকা কেড়ে নিচ্ছেন। আমি মনে করি এটা দুর্নীতি। আজকে সুলতানা কামালের একটা লেখা পড়লাম ডেইলি স্টারে- উনি পুলিশের কথা বলেছেন। পুলিশ আজকাল কী সমস্ত কা- করছে আপনারা সবই দেখছেন সবই শুনছেন। উনি লিখেছেন, পুলিশ আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য তারা নিয়োজিত হয়েছেন, তারা আমাদের জনগণের টাকা দিয়ে চলছে। জনগণ যদি আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তাহলে তার শাস্তি হয়। সুতরাং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী যদি আইন শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তাহলে শাস্তি কি তারচেয়ে কম হওয়া উচিৎ না বেশি হওয়া উচিৎ? আমি মনে করি ৫ গুণ হওয়া উচিৎ। আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করার জন্য আমার যদি ১ বছরের জেল হয়, একজন পুলিশের ৫ বছর জেল হবে। আমার যদি ১০ বছর জেল হয় একজন পুলিশের মৃত্যুদন্ড হবে। কারণ সে প্রতিজ্ঞা করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে আমি করি নাই।

এখন আমরা যদি দেখি, একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয় কেন? অনেক কারণ আছে যেসব কারনে একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সবচেয়ে ইম্পর্টেন্ট হচ্ছে তার মধ্যে দুটো। একটা হচ্ছে জনগণের জীবনের নিরাপত্তা, আরেকটা হচ্ছে জনগণের সম্পদের নিরাপত্তা। এই দুটো কারণে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, প্রধানত। এবং এই নিরাপত্তার জন্য জনগণ রাষ্ট্র গঠন করে, রাষ্ট্রকে নিজেদের পকেট থেকে টাকা দেয়। যেন- আমার সম্পদ তুমি রক্ষা কর, আমার জীবন তুমি রক্ষা কর। রাষ্ট্র, উন্নত দেশগুলোতে সেটা রক্ষা করে, অনেকাংশেই করে। আমাদের মতো দেশে রাষ্ট্র রক্ষা করবে কী - রাষ্ট্র উল্টো আমাদের লুন্ঠন করতে শুরু করেছে। সুতরাং দুর্নীতিকে কিন্তু ছোট করে দেখা উচিৎ না। দুর্নীতি হচ্ছে এক ধরনের লুন্ঠন, দুর্নীতি হচ্ছে সন্ত্রাস। একজন সন্ত্রাসীর সঙ্গে একজন দুর্নীতিপরায়নের পার্থক্য হচ্ছে যে একজন সন্ত্রাসী অস্ত্রের মুখে টাকা কেড়ে নেয় আর একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা কলমের অস্ত্রের মুখে, কলম ধরে আমার টাকা কেড়ে নেয়। পুলিশ দুটো দিয়েই নেয়। মামলা দেবো, আর মামলা দেওয়া মানেতো কেমন।

সেদিন আমি আমার দুটো ছেলেকে পাঠিয়েছি, একটা মেয়ের উপর একটু অসুবিধা হচ্ছে, তাদেরকে ঠেকাতে। পুলিশ এসে বলছে নারী নির্যাতন আইনে দিয়ে দেব। আরে বাবা!

তো এখন পুলিশ অস্ত্র দিয়েও করছে কলম দিয়েও করছে। সারাদেশে সবখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি। আপনারা জানেন যে, কোন কাজ করতে গেলে অফিসার সাহেবের রহস্যময় হাসি। তিনি মৃদু হাসেন এবং বসে থাকেন। তিনি বসে যতোই থাকেন ততোই তার মিটার আস্তে আস্তে ওপরের দিকে ওঠে। সিগ্নেচারটা দিয়ে দিলেইতো শেষ। আর কিছুই পাবেন না তিনি। সুতরাং যতক্ষণ সিগ্নেচার তিনি না দিচ্ছেন ততোক্ষণ তার মিটার উঠছে এবং আমাদের উপরে লুন্ঠন এবং নৃশংস অত্যাচার হচ্ছে এবং বছরে আমাদের কাছ থেকে ৯,৫০০ কোটি টাকা আমাদের কাছ থেকে লুন্ঠন করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তো রাষ্ট্র যদি দায়িত্বটা পালন করতো, আমাদের জন্য খুব ভালো হতো। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র এখনও সুসংগঠিত নয়। ব্রিটিশ আমলে আমরা দেখেছি, আর সবই ছিল, কিন্তু একটা সরকারি কর্মকর্তা মানে দুর্নীতি পরায়ন - এর উদাহরণ কিন্তু খুবই কম ছিল। এক পুলিশ ছাড়া। পুলিশ খুব ঐতিহ্যবাহী। ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট সবাইকে কন্ট্রোল করতে পেরেছে কিন্তু পুলিশকে কন্ট্রোল করতে পারেনি। সুতরাং দারোগাদের বলেছে, যাও বাবা একটা ভুড়ি বানাও। (ড. ইফতেখারুজ্জামান: তারও কারণ ছিল, তারা চেয়েছিল ওদের মাধ্যমে জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করতে)। হ্যাঁ, ঐ দারোগার মাধ্যমে তারা চেয়েছিল জনগণকে দমন করতে। আজও গভর্ণমেন্ট এই পুলিশের কাছে দুর্বল। যে সময় পুলিশের বিরুদ্ধে পত্রপত্রিকায় সবচেয়ে ভয়ংকর খবরগুলো উঠছে সেই সময় আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন যে, পুলিশ ভালো হয়ে গেছে।

কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি যে, ব্রিটিশ আমলে ন্যায়ের ভিত্তিতে ঐ রাষ্ট্র চলেছে। এটা লর্ড ম্যাকলি লিখেছেন লর্ড ক্লাইভের ওপরে - একটা বই তিনি লিখেছেন। এবং তার মধ্যে লিখেছেন, ক্লাইভ প্রথম বার - তিনবার এসেছিলেন ক্লাইভ ঘুষ নিলেন কিন্তু দ্বিতীয়বার, এক্কেবারে কঠোর হাতে সমস্ত অনৈতিকতা, দুর্নীতি এমনভাবে তিনি দমন করলেন যে, তার বিরুদ্ধে সামরিক বিদ্রোহ হয়েছে ব্রিটিশ আর্মিতে এবং ২০০ জন অফিসারকে বরখাস্ত করেন তিনি। এবং তিনি বলেছেন, ব্রিটিশরা যদি সেই সময় এই কঠোর পদক্ষেপ না নিতো, যদি এদেশের জনগণের কাছে যদি প্রমাণ করতে না পারতো যে, তারা নৈতিকভাবে এই দেশের মানুষের নৈতিকতার চেয়ে উপরে, তাহলে ব্রিটিশ সরকার এতদিন টিকতো না।

যাই হোক, আমি শেষ করে ফেলি, হয়ত পরে দুএকটা কথা আরো হবে।

সুতরাং রাষ্ট্র আমাদের এটা করছে না। রাজা উৎপীড়ক হতে পারে, রাজা অত্যাচারী হতে পারে, রাজা চরিত্রহীন হতে পারে কিন্তু রাজা চোর এই কনসেপ্ট ব্রিটিশ আমলেও আমরা দেখি নাই। রাজা লুণ্ঠনকারীও হয় কিন্তু রাজা চুরি করে, এটা ছিল না। রাজা মানে সরকার, রাষ্ট্র।

আমাদের এই সময়ে এটা হয়েছে। সুতরাং এখন আমাদের দায়িত্ব বেড়ে গেল। আমি একটা ছোট গল্প বলে শেষ করি। আমাদের বাসার সামনে একটা বেড়ার ঘর ছিল। কে বা কেউ ওটা বানিয়েছিল। একদিন দেখলাম ঐ বেড়ার ঘরের নিচের অংশের বেড়াগুলো অনেকদিন যত্নেরর অভাবে খেয়ে গেছে। কিন্তু কে যেন ঐ যে খাওয়া জায়গাটা, ঐখানে পাতলা পলিথিন দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। আমার কাছে এক ভদ্রলোক এলেন আমার বাসায়, আমরা বারান্দায় দাঁড়িয়েছি। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা বলেন তো, এই যে বেড়ার ঘরটার নিচের জায়গাটা খেয়ে গেছে, পাতলা পলিথিন দিয়ে ঘিরে রেখেছে। এই পাতলা পলিথিন কি চোর ঠেকাবে? আমি বললাম না, চোর তো ঠেকাতে পারবে না। তখন উনি বললেন, তাহলে এই লোকটা এটা ঘিরেছে কেন? আমি যখন উত্তর দিতে পারলাম না। উনি উত্তরটা দিলেন। উনি বললেন, সে ঘিরেছে এই জন্য এইটুকু বুঝানোর জন্য যে, এই ঘরের রক্ষক আছে।

আমাদের দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায় সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। সরকার থেকেও এসবের সমর্থন আসছে। এখন আমরা যদি ঐ নিচের জায়গাটা না ঘিরি, আমরা যদি জনগণ, আমরা যদি প্রমাণ করতে না পারি যে রক্ষক আছে, তোমরা যা খুশি তাই করতে পারবে না। আমরা ব্রিটিশদের তাড়িয়েছিলাম, কেন? ব্রিটিশরা আমাদের শোষণ করেছিলো। আমরা পাকিস্তানীদের তাড়িয়েছিলাম, কেন? পাকিস্তান আমাদের শোষণ করেছিল। আজকে দুর্নীতিবাজরা আমাদের শোষণ করছে, আমরা কি তাদের তাড়াবো না?

এখানেই শেষ করি, ধন্যবাদ।