• header_en
  • header_bn

অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে দুদকের দক্ষতার ঘাটতি; ১৬ দফা সুপারিশ টিআইবির

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
 
অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে দুদকের দক্ষতার ঘাটতি; ১৬ দফা সুপারিশ টিআইবির
 
ঢাকা, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর ‘প্রতিরোধ, শিক্ষা ও আউটরিচ কার্যক্রম’ সন্তোষজনক হলেও ‘অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়েরর’ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, কাজের আওতা, আইনি স্বাধীনতার পাশপাশি কমিশনারদের নিয়োগ ও অপসারণ; এবং আর্থিক ও মানবসম্পদের ক্ষেত্রে বাজেটের পর্যাপ্ততা থাকাসহ দুদকের বেশকিছু শক্তিশালী দিক রয়েছে। তথাপি জাতীয় বাজেটের তুলনায় অপর্যাপ্ত বরাদ্দ, বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকা, অভিযোগকারীরা নিজেদের পরিচয় প্রকাশে অনাগ্রহী, যা দুদকের প্রতি তাদের আস্থাহীনতা বা নিরাপত্তাহীনতা বোধের নির্দেশক। এছাড়া দুর্নীতির অভিযোগের সাড়া প্রদানের ক্ষেত্রে দুদকের দুর্বলতা, অভিযোগের তুলনায় মামলা দায়েরের হার কম এবং নারী ও দরিদ্রসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠির বিশেষ চাহিদা মেটানোর কোনো ধরনের কাঠামোগত সুবিধার অনুপস্থিতি থাকায় দুদকের কার্যক্রম সম্পর্কে সাধারণ জনগণের ধারণা খুব আশাব্যঞ্জক নয়, যা সংস্থাটির প্রতি আস্থাহীনতাকেই নির্দেশ করে। ‘দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ উদ্যোগ: বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর একটি ফলো-আপ গবেষণা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আজ টিআইবির ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। পাশাপাশি দুদকের মূল চ্যালেঞ্জগুলোর বাস্তব সমাধান বা সংস্কারের জন্য ষোল দফা সুপারিশ প্রদান করেছে সংস্থাটি। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অধ্যাপক ড. পারভীন হাসান, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এবং উপদেষ্টাÑনির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাম্মী লায়লা ইসলাম।
গবেষণার মূল্যায়ন অনুযায়ী বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের সার্বিক স্কোর ৬০ শতাংশ যা ‘মধ্যম’ পর্যায়ের নির্দেশ করে, যা ‘উচ্চ’ পর্যায় থেকে ৭ পয়েন্ট কম গবেষণা অনুযায়ী দুদক ৫০টি নির্দেশকের মধ্যে মোট ২১টি নির্দেশকের ক্ষেত্রে ‘উচ্চ’, ১৮টি ক্ষেত্রে ‘মধ্যম’ এবং ১১ নির্দেশকের ক্ষেত্রে ‘নিম্ন’ স্কোর করেছে। দুদকের ‘প্রতিরোধ, শিক্ষা ও আউটরিচ কার্যক্রম’ বিবেচ্য ছয়টি ক্ষেত্রের মধ্যে সর্বোচ্চ স্কোর করেছে (৭৫%), ‘স্বাধীনতা ও মর্যাদা’ ৬৭ শতাংশ এবং ‘সহযোগিতা ও বাহ্যিক সম্পর্ক’ ৬৭ শতাংশ স্কোর পেয়েছে। অপরদিকে ‘অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়ের’ ৪৪ শতাংশ অর্থ্যাৎ সবচেয়ে কম স্কোর পেয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দুর্নীতি দমনমূলক কার্যক্রমে দুদক পিছিয়ে আছে।
মূল্যায়নের ফলাফল স্বাধীনতা ও মর্যাদা; অর্থ ও মানবসম্পদ; জবাবদিহিতা ও শুদ্ধাচার; অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়ের; প্রতিরোধ, শিক্ষা ও আউটরিচ কার্যক্রম এবং সহযোগিতা ও বাহ্যিক সম্পর্ক এই ছয়টি (৬) ক্ষেত্রে বিভক্ত করে সর্বমোট পঞ্চাশটি (৫০) নির্দেশকের আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রত্যেক নির্দেশকের সম্ভাব্য তিনটি স্কোরÑ উচ্চ (২), মধ্যম (১) ও নিম্ন (০) নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাপ্ত সার্বিক স্কোরকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছেÑ সার্বিক স্কোর ৬৭ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশের মধ্যে হলে ‘উচ্চ’, ৩৪ শতাংশ থেকে ৬৬ শতাংশের মধ্যে হলে ‘মধ্যম’ এবং ০ শতাংশ থেকে ৩৩ শতাংশের মধ্যে হলে ‘নিম্ন’ বলে ধরা হয়েছে।
সার্বিকভাবে দুদকের কার্যকরতার মাপকাঠিতে কোনো বিশেষ অগ্রগতি হয়নি উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “দুদকের মূল ম্যান্ডেড দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা, আইনের চোখে সকলেই সমান এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে, নিরপেক্ষভাবে সকল প্রকার প্রভাবমুক্ত হয়ে তার দায়িত্ব পালনের যে সৎ সাহস ও দৃঢ়তা, অন্যদিক থেকে রাজনৈতিক পরিবেশ অপরিহার্য, এই উভয় দিকেই ঘাটতি দৃশ্যমান। কর্মী নিয়োগ ও প্রচার-প্রচারণার মতো কিছু ক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় অগ্রগতি হয়েছে। তবে, দুদকের অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়েরের মতো মৌলিক ক্ষেত্রে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই।”
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার অংশ হিসেবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)Ñ এর উদ্যোগের অধীনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০১৬ সালে বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ওপর একটি মূল্যায়ন সম্পন্ন করে। যা, ২০১৬ সালের মার্চে একটি মতবিনিময় সভার মাধ্যমে দুদকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে উপস্থাপন ও আলোচনা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমান ফলো-আপ মূল্যায়নটি পরিচালিত হয়েছে। এই মূল্যায়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে: দুদকের কার্যক্রম ও উন্নতির ক্ষেত্র পর্যালোচনা; দুদকের কার্যকরতার পেছনে ক্রিয়াশীল সহায়ক ও বাধাদানকারী প্রভাবক সম্পর্কে পর্যালোচনা এবং দুদকের মূল চ্যালেঞ্জগুলোর বাস্তব সমাধান বা সংস্কারের জন্য সুপারিশ প্রদান করা।
দুদকের কার্যক্রম মূল্যায়নের এই গবেষণার রেফারেন্স পিরিয়ড ছিল বিগত তিন বছর (২০১৬-২০১৮) এবং ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এই গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গুণবাচক পদ্ধতি অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট আইন ও গবেষণা, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, ওয়েবসাইটের তথ্য পর্যালোচনা; দুদকের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা, আইনজ্ঞ, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমকর্মীদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ; ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের পক্ষ থেকে বিশেষজ্ঞ কর্তৃক প্রাথমিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গবেষণার ফলাফল নিয়ে দুদকের চেয়ার, কমিশনার ও কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ গবেষণায় দুদকের ভাবমূর্তি ও কর্মদক্ষতাকে প্রভাবিত করে এমন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণগুলোকে চিহ্নিত করার জন্য তথ্য সংগ্রহের মূল্যায়নকাঠামো বা টুল তৈরি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। 
গবেষণা অনুযায়ী স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্নে দুদককে পর্যাপ্ত স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে এবং আইনে কার্যক্রম সম্পর্কে বিশদভাবে বলা হয়েছে। তবে কার্যক্রম ও ক্ষমতার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। বিরোধীদলের রাজনীতিকদের হয়রানি, ক্ষমতাসীন দল/জোটের রাজনীতিকদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন; রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ আচরণ দেখাতে ব্যর্থ হওয়া; পক্ষপাতপূর্ণ ভূমিকা পালন করার অভিযোগ; বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে বেশিরভাগই তদন্ত চলছে বলে সাধারণের মধ্যে ধারণা রয়েছে। যদিও ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধেও তদন্ত চলছে। ২০১৫ সালে ‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২’ সংশোধনের মাধ্যমে অর্থ পাচার সংক্রান্ত মৌলিক কিছু বিষয় দুদকের এখতিয়ারের বাইরে রাখা হয়েছে। ‘সরকারি চাকরি আইন ২০১৮’Ñ তে সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক সম্পর্কিত বিধানটির ফলেও দুদকের ক্ষমতা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দুর্নীতিপ্রবণ প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রতিবেদন তৈরি ও সুপারিশ করলেও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার ক্ষমতা দুদকের নেই। এছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে সরকারের বিরূপ প্রতিক্রিয়া এড়ানোর জন্য দুদক নিজস্ব ধারণাপ্রসূত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করা থেকে বিরত থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অর্থ ও মানবসম্পদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ২০১৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত দুদকের বাজেটের গড় জাতীয় বাজেটের শূন্য দশমিক শূন্য ৩১ শতাংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। এর ফলে প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট না থাকায় কর্মীদের কার্যকরতা, দক্ষতা এবং পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। জেলা পর্যায়ে প্যানেল আইনজীবীদের মধ্যে পর্যাপ্ত মানের ঘাটতি রয়েছে। একইভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মীরাও পর্যাপ্ত দক্ষ নয়, এবং বেশিরভাগ সময়ই তারা স্থানীয় কমিটিগুলোর ওপর (দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি ও সততা সংঘ) নির্ভর করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী দুদকের জবাবদিহিতা ও শুদ্ধাচারের ক্ষেত্রে প্রধান উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে বাহ্যিক কোনো সার্বিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকা। যদিও নিয়মিতভাবে তদন্ত প্রতিবেদন মূল্যায়নের জন্য দুদকের নিজস্ব তদারকি ও মূল্যায়ন শাখা রয়েছে, কিন্তু এই কাঠামোতে জনগণের প্রতিনিধিত্বের কোনো ব্যবস্থা নেই। দুদকের বার্ষিক প্রতিবেদনের ওপর সংসদে কোনো আলোচনা হয়না। ২০১৯ সালে প্রণীত দুদক কর্মীর আচরণ ও শৃঙ্খলাজনিত একটি খসড়া তৈরি হয়েছে, যা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়নি। দুদকের ইন্টারনাল করাপশন প্রিভেনশন কমিটি দুদকের কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের তদন্ত করে থাকে, তবে এক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাতের ঝুঁকিসহ দুদকের কর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলারও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুদকের সাড়া প্রদানের হার কম হওয়ার একটি কারণ হচ্ছে দুদকের অভিযোগবাছাই ব্যবস্থা। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালে মোট ৪৭ হাজার ৫ শত ৪৯টি অভিযোগের মধ্যে ৩ হাজার ২ শত ৯টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গৃহীত হয় যা (৬.৭৫%) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে এটি ৬৬ শতাংশের বেশি হওয়ার কথা। তবে দুদকের মতে অধিকাংশ অভিযোগ দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের মধ্যে পড়ে না। অপরদিকে, গত কয়েক বছরে দুদকের দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ার হার গড়ে ৪০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৭ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের থেকে (৭৫% বেশি) কম। মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে দুদকের নিরপেক্ষতার বিষয়ে মানুষের ধারণা খুব ইতিবাচক নয়। দুদকের কর্মকর্তাদের মতে, দুদকের ওপর আস্থার অভাব রয়েছে। দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে দুদক ক্ষুদ্র দুর্নীতির ওপর বেশি মনোযোগী এবং ‘বড় দুর্নীতিবাজ’ ধরার ক্ষেত্রে দুদকের দৃশ্যমান সাফল্য নেই। দুদকের অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রমের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও পেশাদারত্বও উদ্বেগের বিষয়। সাধারণত দেখা যায়, দুদকের তদন্তগুলো অধিকাংশক্ষেত্রেই আইনে বর্ণিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয় না। অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেন ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। মামলা দায়ের ও শাস্তির হার বিবেচনায় দুর্নীতির অনুসন্ধান ও তদন্ত এখনো মানসম্মতভাবে দক্ষ ও পেশাদার নয়। এছাড়া বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণের (২০১৫ সালে প্রায় ৫ শত ৯০ কোটি মার্কিন ডলার) প্রেক্ষিতে দুদকের উদ্ধারকৃত অর্থের পরিমাণ (জরিমানা ও আটক হিসাবে ২০১৮ সালে ১ শত ৫৩ দশমিক ২৯ কোটি টাকা) উল্লেখযোগ্য নয়।
গবেষণা অনুযায়ী প্রতিরোধ, শিক্ষা ও আউটরিচ কার্যক্রমের জন্য কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নেই। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে দুপ্রক এবং সততা সংঘগুলির মাধ্যমে গৃহীত কার্যক্রমগুলো এখনো মূলত উপলক্ষভিত্তিক (যেমন আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন দিবস ও দুর্নীতি দমন সপ্তাহ পালন করা) এবং আনুষ্ঠানিক। এছাড়া দুদকের পাঁচবছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনায় (২০১৭ থেকে ২০২১) প্রতিরোধমূলক ও শিক্ষামূলক কৌশল অনুসৃত হয়নি, এবং দুদকের প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম স্থানীয় দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি পর্যায়ের ওপর নির্ভরশীল। দুদকের নিজস্ব গবেষণা শাখা গঠনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। ২০১৮ সালে দুদক প্রথমবারের মতো তিনটি গবেষণা আউটসোর্সিংÑ এর মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগ নিলেও এখনো এ সকল গবেষণা প্রকাশিত হয়নি। 
সহযোগিতা এবং বাহ্যিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, প্রান্তিক জনগণকে (বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী) সেবা প্রদানের জন্য দুদকের কোনো লক্ষ্য, কৌশল ও মানদণ্ড নেই। এছাড়া, দুদক জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যভেদে কোনো প্রকার তথ্যও সংগ্রহ করে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব থেকে “শূন্য সহনশীলতা”র ওপর জোর দেওয়া হলেও সরকারের কোনো কোনো উদ্যোগের মাধ্যমে দুদকের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে বলে আশঙ্কা রয়েছে। যেমন ‘সরকারি চাকরি আইন ২০১৮’Ñ এ সরকারি কর্মচারীদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে দুদক রাজনৈতিকভাবে প্রভাবান্বিত হয় বলে ধারণা রয়েছে। অপরদিকে, দুদক ও অন্যান্য দেশের দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমিত সহযোগিতা রয়েছে। 
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের শূন্য সহনশীলতা নীতিকে সাধুবাদ জানিয়ে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এটির সুফল দেশবাসী পেতে চায়, কিন্তু এর বাস্তবায়নের এক্তিয়ার যাদের তার মধ্যে অন্যতম দুদক, সেই প্রতিষ্ঠানটিকেই অকার্যকর করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ এর মধ্যে একটি ধারা সংযুক্ত করে এক ধরনের বার্তা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে দুদকের আইনগত ভিত্তিকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মানি লন্ডারিং-এর ক্ষেত্রে দুদকের আওতা বহির্ভূত করা হয়েছে। এছাড়া, ব্যক্তিমালিকানধীন খাত এখনও দুদকের এক্তিয়ার বহির্ভূত। এ বিষয়সমূহ সরকারের সদিচ্ছার ঘাটতির পরিচায়ক। অন্যদিকে দুদকের মধ্যে এমন মানসিকতা দেখা যায়, যেন এটি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, যা প্রশাসনের ওপর নির্ভরশীল। যদিও সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু এটি যে স্বাধীনভাবে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবে, সে ধরনের মানসিকতা ও প্রয়াস দুদকের মধ্যেও নেই, সরকারের পক্ষ থেকেও নেই। এ সব কারণে উচ্চ পর্যায়ের ব্যাপকভাবে আলোচিত দুর্নীতির নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়না।” 
২০১৬ সালে করা দুদকের প্রথম মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন সার্বিকভাবে ৬১ দশমিক ২২ শতাংশ স্কোর পেয়েছিল যা মধ্যম পর্যায়ের ছিল। পূর্ববর্তী স্কোর বিবেচনায় এবার তেমন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নেই। দুদক কর্মী নির্বাচন, অভিযোগ দায়েরের অভিগম্যতা, শাস্তির হার, দুর্নীতির ঝুঁকি সম্পর্কিত গবেষণা, প্রচার-প্রচারণা, অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা এই নির্দেশকগুলোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি করেছে। অপরদিকে, দুদকের ক্ষমতার রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার, তদন্ত ও মামলা করায় দক্ষতা, দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে গৃহীত ব্যবস্থা, অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজে দক্ষতা ও পেশাদারত্ব, প্রতিরোধ, শিক্ষা ও আউটরিচ কার্যক্রমের বাজেট, সরকারের সহায়তায় আস্থা এই নির্দেশকগুলোর ক্ষেত্রে স্কোর কমেছে। এছাড়া দুদক বাজেটের অনুপাত এবং বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নির্দেশকে পূর্বের তুলনায় কম স্কোর পেয়েছে। দুদকের প্রধান দু’টি ম্যান্ডেটের মধ্যে প্রতিরোধকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে দুর্নীতি দমন দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুদকের কর্মীদের একাংশের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন, দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও বিদ্যমান।
গবেষণায় প্রাপ্ত পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে দুদকের মূল চ্যালেঞ্জগুলোর বাস্তব সমাধানের লক্ষ্যে টিআইবি ষোল দফা সুপারিশ প্রদান করেছে। দুদকের কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট আইন (দুদক আইন ২০০৪, অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২, সরকারি চাকরি আইন ২০১৮) সংশোধনসহ দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করা, অর্থপাচার ও ব্যক্তিমালিকানাসহ বেসরকারি খাতের দুর্নীতিকে দুদকের কাজের আওতাভুক্ত করা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য দুদকের সুপারিশকে বাধ্যতামূলক করা; অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী কর্মী নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দক্ষ আইনজীবী নিয়োগ; অনুসন্ধান ও তদন্ত ও প্রতিরোধ কার্যক্রমে কর্মী সংখ্যা বাড়াতে হবে; যারা তদন্ত, মামলা পরিচালনা ও প্রতিরোধের কাজে জড়িত তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে; দুর্নীতির মামলার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া অনুসরণ; দুদকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সমন্বিত ও বিশেষায়িত আচরণ বিধি প্রণয়ন; অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানের সংখ্যা বাড়ানোসহ কী মাপকাঠিতে অভিযোগ গ্রহণ করা হলো না তার ব্যাখ্যা প্রকাশ করতে হবে; দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে সঠিক অনুসন্ধান পরিচালনা ও মামলা দায়েরের পূর্বে আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করা এবং গণশুনানিতে উত্থাপিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে দুর্নীতিবাজ কর্মীদের চিহ্নিত করে অনুসন্ধান সাপেক্ষে মামলা দায়েরের ব্যবস্থা গ্রহণ; পেশাদরত্ব ও উৎকর্ষের প্রমিত মান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষ করা; দুর্নীতির মামলায় দোষীদের সাজার হার কীভাবে বাড়ানো যায় সেজন্য দুদককে তদন্ত ও মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি চিহ্নিত করা; সম্পদ পুনরুদ্ধার, জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করার জন্য উদ্যোগী হয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ; বার্ষিক প্রতিরোধ ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা অনুসরণ; পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ, দক্ষ জনবল বৃদ্ধির মাধ্যমে গবেষণা বিভাগকে শক্তিশালী করাসহ দুদকের কার্যক্রমের কার্যকরতা বিষয়ে জনগণের ধারণা যাচাইয়ের জন্য জরিপ এবং গবেষণার কাজ করতে হবে; জনগণের আস্থা বৃদ্ধির জন্য কার্যক্রম সম্পর্কে আরও প্রচারণার ব্যবস্থা, দুদকের কমিশনার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আয়, সম্পদ ও দায়ের বিবরণ প্রকাশ ও নিয়মিতভাবে হালনাগাদ করার পাশাপাশি ‘শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্তদের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে; অন্যান্য দেশের দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠানের সাথে সহযোগিতা ও যোগাযোগ বৃদ্ধি করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিশেষ প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে তাদের সহজ অভিগম্যতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
 
গণমাধ্যম যোগাযোগ:
 
মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম
সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন)
মোবাইল: ০১৭১৩-১০৭৮৬৮
ই-মেইল:  This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.