• header_en
  • header_bn

শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সুশাসন আনয়নে টিআইবি’র ৯ দফা সুপারিশ: আইনী সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তথ্যের উন্মুক্ততা ও প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের তাগিদ

 
সংবাদ বিজ্ঞপ্তি
 
শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সুশাসন আনয়নে টিআইবি’র ৯ দফা সুপারিশ:
আইনী সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তথ্যের উন্মুক্ততা ও প্রবেশাধিকার নিশ্চিতের তাগিদ
 
ঢাকা, ৯ মার্চ ২০১৭: শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ার পাঁচটি ধাপে ১৬ ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) শ্রম অভিবাসন খাতের সুশাসন নিশ্চিতে বিদ্যমান আইনের সংস্কার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈধ শ্রম অভিবাসনের বিভিন্ন বিষয়সম্বলিত তথ্যের প্রচারসহ নয় দফা সুপারিশ পেশ করেছে। আজ সংস্থার ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে “শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সুশাসন: সমস্যা ও উত্তরণের উপায়” শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ সংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরেন টিআইবি’র গবেষণা ও পলিসি বিভাগের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাহজাদা এম আকরাম ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার মনজুর-ই-খোদা। উক্ত গবেষণায় আরো সম্পৃক্ত ছিলেন জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার গোলাম মহিউদ্দিন। সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এম হাফিজউদ্দিন খান, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপ-নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, এবং গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান। 

মুখ্য তথ্যদাতাদের সাক্ষাৎকার, নিবিড় সাক্ষাৎকার এবং দলগত আলোচনা ছাড়াও শ্রম অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট নীতিমালা, আইন ও বিধি, প্রকাশিত-অপ্রকাশিত গবেষণা, প্রবন্ধ, সরকারি- বেসরকারি তথ্য ও দলিল, এবং সংবাদপত্র ও অন্যান্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা পূর্বক ২০১৬ সালের মে থেকে জানুয়ারী ২০১৭ পর্যন্ত সময়কালে এ গবেষণার তথ্য সংগৃহীত, বিশ্লেষিত এবং প্রতিবেদন প্রণীত হয়।
গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের শ্রম অভিবাসন খাতে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন ইতিবাচক উদ্যোগের মধ্যে সেবার বিকেন্দ্রীকরণে ঢাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম ও সিলেট থেকে সরাসরি বহির্গমন ছাড়পত্র ও স্মার্ট কার্ড প্রদান, অনলাইন ভিসা চেকিং-এর ব্যবস্থা,  অভিবাসনের ব্যয় নির্বাহের জন্য প্্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক থেকে ঋণ প্রদান অন্যতম। এছাড়া চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, সিলেট, রংপুর, যশোর ও বরিশাল থেকে বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের ফিঙ্গার প্রিন্ট কার্যক্রমের প্রকল্প, দীর্ঘদিন বাংলাদেশ হতে শ্রম অভিবাসন বন্ধ ছিল এমন দেশসমূহ যেমন সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ায় নতুন করে শ্রম অভিবাসন শুরু, অনলাইন ভিসা চেকিং-এর ব্যবস্থা, অভিযোগ দাখিলের জন্য - হটলাইন ও বিশেষায়িত ওয়েবসাইট চালু, প্রবাসী নারীকর্মী অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেল সংক্রান্ত কার্যক্রমের প্রচলন, বিএমইটি’র ওয়েবসাইটে ও ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে অনলাইন ভিসা যাচাইয়ের সুবিধা কে ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসন আইন ২০১৩ এর কিছু আইনি ও প্রায়োগিক সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয় যে এই আইনে শ্রম অভিবাসন খাতে সক্রিয় ‘দালাল’দের কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি; আইনের অনেক ধারা নির্দেশনামূলক, বাধ্যতামূলক নয় (যেমন অভিযোগ উত্থাপন, কর্মী বাছাই, ক্ষতিপূরণ আদায়); এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে অভিবাসনকে আইনের আওতায় আনা হয়নি। অন্যদিকে মোবাইল কোর্টে বিচারের ক্ষেত্রে শাস্তি প্রদানে এখতিয়ার সংক্রান্ত অস্পষ্টতা, রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত ও ক্ষতিগ্রস্তÍ অভিবাসীর ক্ষতিপূরণের বাধ্যবাধকতা না রাখা, ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগ ও ডেটাবেইজ থেকে কর্মী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া বাস্তবসম্মত নয় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
সুশাসন বিষয়ক ঘাটতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল প্রয়োজনীয়  প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা; বাজেট ও জনবল (বিএমইটি, টিটিসি, গন্তব্য দেশে শ্রম উইং) স্বল্পতা; প্রক্রিয়ায় বিকেন্দ্রীকরণের ঘাটতি - ভিসা প্রক্রিয়াকরণ, রিক্রুটিং এজেন্টদের কার্যক্রম; বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি; একাধিকবার বায়োমেট্রিক আইডেন্টিটি, তথা আঙ্গুলের ছাপ ও ছবি দেওয়া (জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিএমইটি ডেটাবেজ); নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ঘাটতি, গন্তব্য দেশে ভিসা কেনা-বেচা, গন্তব্য দেশে কর্মসংস্থানের বৈধতা যাচাই এবং বাংলাদেশে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ক্ষেত্রে জটিল ও দীর্ঘ অভিবাসন প্রক্রিয়া। এছাড়া বিএমইটি হতে বহির্গমন ছাড়পত্র প্রাপ্তিতে প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে এজেন্সি-নির্ভরতা; দলীয় ভিসা ও অপ্রচলিত  দেশের ভিসার ক্ষেত্রে বহির্গমন ছাড়পত্রের জন্য মন্ত্রণালয় ও বিএমইটি উভয়ের কাছে আবেদন, অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতির ওপর নিভরশীলতা, দালাল-নির্ভর  সেবাব্যবস্থা, সকল দেশের জন্য সরকারিভাবে ভিসার মূল্য নির্ধারিত না থাকার ফলে ভিসা/ অভিবাসনের প্রকৃত ব্যয় সংক্রান্ত দালিলিক প্রমাণের ঘাটতি; ভিসার অতিরিক্ত চাহিদা; ভিসা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভিসা ব্যবসায়ীদের অসাধু প্রতিযোগিতা এবং মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতা অন্যতম। এছাড়াও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ভিসার মূল্য বেশি, অভিবাসী কর্মীর শিক্ষা, দক্ষতা ও সচেতনতার ঘাটতি; সামাজিক যোগাযোগের কারণে দালালদের ওপর আস্থা ও নির্ভরতা; কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ; তৃণমূল পর্যায়ে উপস্থিতি; তথ্য সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা; বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচার ও প্রকাশে ঘাটতিকে আলোচ্য গবেষণায় চিহ্নিত করা হয়।
গবেষণায় শ্রম অভিবাসন প্রক্রিয়ার ভিসা সংগ্রহ, ভিসা সত্যায়ন, কর্মীর কাছে ভিসা বিক্রি, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সহ সকল পর্যায়ে নানাবিধ সমস্যা, দুর্নীতি ও অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়েছে। যার মধ্যে: গন্তব্য দেশে নিয়োগদাতাদের পক্ষ থেকে / তাদের অজ্ঞাতসারে অবৈধভাবে ভিসা বিক্রি; অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত কর্মীর চাহিদাপত্র তৈরি ও বিক্রি; গন্তব্য দেশ থেকে ভিসা কেনার জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পাচার; গন্তব্য দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে চাহিদাপত্র অনুযায়ী নিয়োগদাতা সম্পর্কে তথ্য যাচাই না করে ও অবৈধভাবে অর্থের বিনিময়ে চাহিদাপত্র সত্যায়নের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া প্রতিবেদনে অভিবাসী কর্মীর কাছে দালালদের ভিসা বিক্রি; ভিসার জন্য অতিরিক্ত মূল্য আদায়; নারী অভিবাসী কর্মীদের কাছ থেকে রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের গড়ে ১০-১৫ হাজার টাকা আদায়; স্বাস্থ্য পরীক্ষায়  কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুস্থ ব্যক্তিকে আনফিট ঘোষণা করা, পরবর্তীতে টাকার বিনিময়ে ফিট বলে সনদ দেওয়া, পুলিশি ছাড়পত্র সংগ্রহের ক্ষেত্রে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান অতিরিক্ত দালাল নির্ভরতা, সক্ষমতার ঘাটতি, চাহিদার তুলনায় অধিক গমনেচ্ছু এবং প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে শ্রম অভিবাসনে ইচ্ছুক ও প্রবাসী শ্রমিকরা আর্থিকসহ বিভিন্নভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। তিনি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই শ্রমশক্তি রপ্তানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে দালাল ও এজেন্টদের মাধ্যমে বিদেশে গমনেচ্ছুদের প্রতারণার শিকার ও নিঃস্ব হওয়ার বিষয়ের ওপর নজর দেওয়াসহ একটি দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়ন, দালাল নির্ভরতাকে নিয়ন্ত্রণ, প্রতারণা ও অনিয়মের সাথে জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহবান জানান।
গবেষণা প্রতিবেদনে উপস্থাপিত সুপারিশসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল - ‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসন আইন ২০১৩’-এর সংস্কার  যেমন কর্মী বাছাই, ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ, ক্ষতিপূরণ প্রদান ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোকে বাধ্যতামূলক করা, এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত একক ভিসার জন্য বহির্গমন ছাড়পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএমইটি কর্তৃক ‘ওয়ান-স্টপ’ সেবা প্রচলন; এবং বাংলাদেশ থেকে যেসব দেশে বেশি কর্মী যায় সেসব দেশে কর্মসংস্থান তদারকির ক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন শ্রম উইং-এর সক্ষমতা (বাজেট, জনবল) ও দক্ষতা বৃদ্ধি। এছাড়া দালালদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য তাদেরকে রিক্রুটিং এজেন্টদের সাব-এজেন্ট বা নিবন্ধিত প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান প্রণয়ন; সরকারি নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের ন্যূনতম পাঁচগুণ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরন; দলীয় ভিসা প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি  নেওয়ার ব্যবস্থা বাতিল; অভিবাসী কর্মীর ছবি ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে তথ্য বিনিময়ে কার্যকর সমন্বয়; ও সকল গন্তব্য দেশের ভিসা অনলাইন চেকিংয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিতে সরকারের কূটনৈতিক পদক্ষেপ জোরদারের সুপারিশ করা হয়। এছাড়া সম্ভাব্য অভিবাসী কর্মীদের সচেতনতা বাড়ানোর জন্য বৈধ শ্রম অভিবাসন সংক্রান্ত তথ্য যেমন বিদেশে কাজের ধরন, সরকার-নির্ধারিত অভিবাসনের ব্যয় ইত্যাদি সহজলভ্য করা, তৃণমূল পর্যায়ে শ্রম অভিবাসন সংক্রান্ত প্রচার-প্রচারণা বৃদ্ধি, ও মন্ত্রণালয়, বিএমইটি, বোয়েসেল ও বায়রার ওয়েবসাইটে অভিবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সহজলভ্য করার সুপারিশ প্রদান করা হয়।
গণমাধ্যম যোগাযোগ:
রিজওয়ান-উল-আলম 
পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন)
ফোন: ০১৭১৩ ০৬৫০১২ 
ই-মেইল:  This email address is being protected from spambots. You need JavaScript enabled to view it.