• header_en
  • header_bn

 

Corruption increases poverty and injustice. Let's fight it together...now

 

আইনি স্বাধীনতা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগসহ ২১ টি নির্দেশকে দুদক-এর স্কোর উচ্চ পর্যায়ের; তবে ৪৯টির মধ্যে ১৯টিতে মধ্যম ও ৯টিতে নিম্ন পর্যায়ে। কার্যকরতা বৃদ্ধিতে ১১ দফা সুপারিশ টিআইবি’র

ঢাকা, ৭ আগস্ট ২০১৬: প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আইনি স্বাধীনতা ও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগসহ ২১টি নির্দেশকে দুদক-এর স্কোর উচ্চ পর্যায়ের হলেও ৪৯টির মধ্যে ১৯টিতে মধ্যম ও ৯টিতে নিম্ন পর্যায়ের। নির্দেশকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ স্কোর পেয়েছে আইনী স্বাধীনতা ও অবস্থান এবং সর্বনিম্ন স্কোর পেয়েছে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে দুদকের কার্যকরতা সম্পর্কে জনগণের ধারণা’র নির্দেশকটি।
জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলের অন্যতম স্তম্ভ দুদকের কার্যক্রম নিয়ে আজ দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ উদ্যোগ: বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের ওপর পর্যালোচনা- শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুদকের কার্যক্রম ও উন্নতির ক্ষেত্র পর্যালোচনা করা; দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের সহায়ক ও বাধাদানকারী প্রভাবক চিহ্নিত করা এবং দুদকের মূল চ্যালেঞ্জগুলোর বাস্তব সমাধান বা সংস্কারের জন্য সুপারিশ প্রদান করার লক্ষ্যেই এ গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। এক্ষেত্রে দুদকের ভাবমূর্তি ও প্রকৃত কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে এমন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণগুলোকে চিহ্নিত করতে মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রণয়ন করা হয়েছে। গবেষণায় ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনবছর সময়কালে দুদকের কার্যক্রম ও কর্মপরিধিসহ সার্বিক দিক নিয়ে তথ্য সংগৃহীত হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের সময়কাল ছিল ২০১৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আইনি স্বাধীনতা ও অবস্থান; অর্থ ও মানবসম্পদ; অনুসন্ধান ও তদন্ত কার্যক্রম; প্রতিরোধ, শিক্ষামূলক ও আউটরিচ কার্যক্রম; অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সহযোগিতা; জবাবদিহিতা ও তদারকি; দুদকের কার্যক্রম সম্পর্কে জনমত/জনগণের ধারণা- এই পৃথক ৭টি ক্ষেত্রের অধীনে ৫০টি নির্দেশকের ভিত্তিতে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। প্রতিটি নির্দেশকের জন্য প্রদত্ত মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি নির্দেশকে তিনটি সম্ভাব্য স্কোর - উচ্চ (), মধ্যম () এবং নিম্ন () দেওয়া হয়েছে। নির্দেশকের মাত্রা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা পাওয়ার জন্য এই স্কোরকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে - সার্বিক স্কোর ৬৭%-১০০% এর মধ্যে হলে ‘উচ্চ’, সার্বিক স্কোর ৩৪%-৬৬% এর মধ্যে হলে ‘মধ্যম’ এবং সার্বিক স্কোর ০%-৩৩% এর মধ্যে হলে ‘নিম্ন’। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রের মোট স্কোর পাওয়ার জন্য ঐ ক্ষেত্রের সবগুলো নির্দেশকের স্কোর প্রথমে যোগ করা হয়েছে। এরপর ঐ ক্ষেত্রে যতগুলো নির্দেশক রয়েছে তার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ স্কোরের সাপেক্ষে এর শতকরা হার বের করা হয়েছে। এই গবেষণার পর্যালোচনা অনুযায়ী বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশনের সার্বিক স্কোর ৬১.২২%, যা ‘মধ্যম’ পর্যায়ের স্কোর। এছাড়া গবেষণার ৭টি ক্ষেত্রের মধ্যে পর্যালোচনা অনুযায়ী ‘দুদকের আইনি স্বাধীনতা ও অবস্থান’ শীর্ষক ক্ষেত্র সর্বোচ্চ স্কোর (৭৮.৫৭%) লাভ করেছে। আর ‘দুদকের কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণের ধারণা’ এই ক্ষেত্রটি সবচেয়ে কম স্কোর (২৮.৫৭%) পেয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, আইনি স্বাধীনতা ও মর্যাদা (আইনি ক্ষমতা, কাজের আওতা); বাজেটের নিশ্চয়তা (প্রতিবছর ধারাবাহিক বৃদ্ধি); কর্মীদের স্থিতিশীলতা (চাকরি ত্যাগের নিম্ন হার); অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের সদিচ্ছা (অভিযোগের প্রেক্ষিতে সাড়া দেওয়া, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে তদন্তের সদিচ্ছা ও সক্ষমতা, মামলার উচ্চ সংখ্যা); দুর্নীতি প্রতিরোধের উদ্যোগ (প্রাতিষ্ঠানিক পর্যালোচনা, প্রতিরোধ কার্যক্রমে অংশীজনদের যুক্ত করা); অন্যান্য অংশীজনের সাথে যৌথ উদ্যোগ (নাগরিক সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী); আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে অংশগ্রহণ ইত্যাদি বিষয়ে দুদকের ইতিবাচক সক্ষমতা ও সাফল্য রয়েছে। তবে উন্নয়ন, তদন্ত ও মামলায় আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে বাজেটের অপ্রতুলতা; প্রতিরোধ কার্যক্রমে উন্নয়ন সহযোগীদের ওপর নির্ভরশীলতা; অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে অভিগম্যতা সহজ না হওয়া; তদন্ত ও প্রতিরোধ কার্যক্রমে অপ্রতুল/সীমিত দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব; দুর্নীতির মামলায় শাস্তির নিম্ন হার; জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থার অনুপস্থিতি; অন্যান্য শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয়ের ঘাটতিসহ সার্বিক কার্যকরতা নিয়ে জনগণের নেতিবাচক ধারণা ও অনাস্থার মত দুর্বল দিকও রয়েছে সংস্থাটির। তাই জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করার পাশাপাশি ইতিবাচক দিকগুলো ধরে রেখে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠাই এখন দুদকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপার্সন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপ-নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের ও গবেষক দলের প্রধান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সালাহউদ্দিন এম. আমিনুজ্জামানসহ অন্য গবেষকবৃন্দ। এসময় ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “গবেষণায় প্রতিফলিত ফলাফল অনুযায়ী দুদকের কার্যক্রম আশাব্যঞ্জক হলেও দুদকের বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে আরো কাজ করতে হবে। এমন কোন আইন প্রণয়ন করা যাবে না যাতে দুদকের বিদ্যমান স্বাধীনতা খর্ব হয়। পাশাপাশি দুদকের স্বাধীনতা সীমিত এমন ক্ষেত্রে আইন প্রণয়ন করে অধিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি আরো বলেন, “পৃথিবীর কোন দেশেই দুর্নীতি দমনে বিধিবদ্ধ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এককভাবে দুর্নীতি দমনে সফল হয় নি। তাই বাংলাদেশেও দুর্নীতি দমনে অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে হবে। দুদক কতটুকু কার্যকর হতে পারছে তা নির্ভর করবে দেশের বিচারিক ব্যবস্থা কতটুকু স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটুকু দক্ষ, নিরপেক্ষ ও কার্যকর এসব বিষয়ের উপর।”
অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, “সমাজে যদি দুর্নীতি প্রতিরোধ না হয়, যথাযথ আইনী প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির বিচার না হয় তবে মানুষের মধ্যে একধরণের মরিয়া ভাব চলে আসে। সমাজে অস্থিরতা তৈরী হয়। এতে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে চায়। মানবাধিকার লঙ্ঘনের সম্ভাবনা তৈরী হয়। তাই অনেক সফলতার পরও মানুষের মাঝে দুদকের আস্থা তৈরী করতে না পারাটা দুঃখজনক। মানুষের মাঝে এই আস্থা তৈরী করতে হবে যে, দুদক আছে, তাই দুর্নীতি হবে না।”
গবেষণা প্রতিবেদনে দুদকের নানা দুর্বলতা কাটিয়ে দুর্নীতি দমনে এর কার্যকরতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১১ দফা সুপারিশ উত্থাপন করেছে টিআইবি। এগুলো হলো: দুদকের বাজেট বৃদ্ধি, সাংগঠনিক কাঠামো ও জনবল বৃদ্ধির বিষয়ে পুনর্বিবেচনা; চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো; অভিযোগ দাখিল ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন ও তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো; দুর্নীতির মামলায় শাস্তির হার বাড়াতে ব্যবস্থা গ্রহণ (যেমন- তদন্ত ও মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি চিহ্নিত করা, মামলা দায়েরের পূর্বে প্রয়োজনবোধে আইনজীবীদের সাথে পরামর্শ করা, প্যানেলভুক্ত আইনজীবীদের সাথে নিয়মিতভাবে যোগাযোগ রক্ষা ও তদারকি করা); সম্পদ পুনরুদ্ধারের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ; দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন, উন্নত ওয়েবসাইট চালু করা, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়ানো; জনগনের প্রতিনিধিত্বকারী স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থার উদ্যোগ গ্রহণ এবং বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি করা।

Media Contact