• header_en
  • header_bn

TIB proposes 20 recommendations for improving good governance in CAG (Bangla)

মহা হিসাব-নিরীক্ষকের কার্যালয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নিরীক্ষা আইন প্রণয়নসহ ২০ দফা সুপারিশ টিআইবি’র
ঢাকা, ২৯ জানুয়ারি ২০১৫: নিরীক্ষা আইন না থাকা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি আইনসমূহ হাল নাগাদ না করা, মন্ত্রণালয়ের উপর নির্ভরশীলতা, প্রয়োজনীয় জনবল, সুযোগ সুবিধা ও জবাবদিহিতার অভাব, পরিবীক্ষণে সমস্যা, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের জবাব না দেওয়া ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না নেওয়া এবং পাবলিক একাউন্টস কমিটি (পিএসি) কর্তৃক সকল প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা না করাসহ মহা হিসাব-নিরীক্ষকের কার্যালয়ে বিরাজমান সুশাসনের ঘাটতিজনিত বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে ২০ দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। আজ সকালে সংস্থার ধানমন্ডিস্থ কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন দিপু রায়, প্রোগ্রাম ম্যানেজার-রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগ। টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরোও উপস্থিত ছিলেন- টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, উপ-নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের এবং রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান।
প্রতিবেদনে সিএজি কার্যালয়ের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করে বলা হয় ২০১২ সাল থেকে নিরীক্ষা পদ্ধতিতে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ার সংযোজন ছাড়াও মিডিয়া এবং কমিউনিকেশন সেল গঠন এবং তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ ব্যবহারের পদক্ষেপ গ্রহণ, নিরীক্ষা প্রতিবেদন ও সিএজি কার্যালয়ের কার্যক্রম সমপর্কে ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশ এবং প্রথম বারের মতো প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিরীক্ষা প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০০৮ সালে নিরীক্ষা আইনের খসড়া প্রণয়ন, নবম সংসদের মেয়াদে ৬৪৮টি ব্যাকলগ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের মধ্যে ৪৯০টির ওপরে নবম পিএসি কর্তৃক আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়াসহ বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহা হিসাব-নিরীক্ষকের কার্যালয়কে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিকভাবে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়। বাজেট, নিয়োগ, শিক্ষা সংক্রান্ত ছুটি, পদোন্নতি, নিয়মাবলী, আইনগত বিষয় ও সরকারি ক্রয়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীলতা থাকায় সাংবিধানিক সংস্থাটি স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় সক্ষম নয়। পূর্বের তুলনায় বাজেট, অডিট ইউনিট এবং সরকারের জনবলের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সিএজির প্রয়োজনীয় ও দক্ষ জনবল বৃদ্ধি না পাওয়া, ১৯৮৮ সালের অর্গানোগ্রামের জনবল দ্বারাই বর্তমান কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে দ্বিতীয় শ্রেণীর অনুমোদিত পদের বিপরীতে শূন্য পদ রয়েছে ৫০০টি। মাত্র ২,৫৬৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দ্বারা সরকারের প্রায় ৩০ হাজার সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরিতে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হয় ও অনেক প্রতিবেদনে ভুল থাকে। এছাড়া জবাবদিহিতার সমস্যা ও তথ্য প্রকাশ প্রক্রিয়াও সচল নয়।
প্রতিবেদনে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মহা হিসাব-নিরীক্ষকের কার্যালয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও প্রশিক্ষণে বিশেষ সুযোগ প্রাপ্তিতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, নিরীক্ষক, অধস্তন নিরীক্ষক ও গাড়িচালক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বৈদেশিক সাহায্যপ্রাপ্ত প্রকল্প অডিটের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু অনিয়মের চিত্র প্রতিবেদনে উঠে আসে। সিএজি কার্যালয়ের নিরীক্ষা দলের বিরুদ্ধে অডিট ইউনিটের নিকট থেকে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে যার পরিমাণ কমপক্ষে ১০ হাজার থেকে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। ঘুষের পরিমাণ নির্ভর করে অডিট ইউনিটের বাজেটের পরিমাণের ওপর। এছাড়া তিন বছর পর বদলি করার নিয়ম থাকলেও ঘুষ ও রাজনৈতিক প্রভাবে একই কার্যালয়ে দীর্ঘদিন কর্মরত থাকা, অতিরিক্ত অর্থ আয়ের সুযোগ সম্পন্ন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠা যেমন -বন্ডেড ওয়ার হাউজ, ডিফেন্স অডিটের পূর্ত সংক্রান্ত, এমপিওভুক্ত হওয়ার জন্য বিভিন্ন কলেজ ও স্কুল নিরীক্ষা করার জন্য ঘুষ আদায়ের অভিযোগ ইত্যাদি।
প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, মহা হিসাব-নিরীক্ষকের কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। যেমন সিএজি কর্তৃক বার্ষিক পরিকল্পনা না করা- মহাপরিচালক পর্যায়ে জবাবদিহিতা না থাকা, উপ-পরিচালক পর্যায়ে মাঠ পর্যায়ে নিরীক্ষা আপত্তি যাচাই-বাছাই না করা, কখনও কখনও অন্যায়ভাবে আপত্তি নিষ্পত্তি করা, মাঠ পর্যায়ে নিরীক্ষার কাজ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কর্তৃক পরিবীক্ষণ না করা; মাঠ পর্যায়ের নিরীক্ষাকালীন দুর্নীতি ধরা পড়লেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া; কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর ও তারিখ এবং গুরুত্বপূর্ণ দলিলাদি ঠিক নেই বলে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, “বাংলাদেশের সর্বত্র ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণের সমস্যা বিরাজমান। আমাদের সংবিধান, শাসন কোন না কোনভাবে এক কেন্দ্রিকতার মধ্যে থাকছে। নিরীক্ষণের জন্য যে প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে তার সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রয়োগ নেই। নিয়োগের ক্ষেত্রে তদবিরের সংস্কৃতি মহামারীর মতো হয়ে গেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে জবাবদিহি না করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তা থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন।”
. ইফতেখারুজ্জামান তাঁর বক্তব্যে বলেন, “মহা হিসাব-নিরীক্ষকের আওতায় আর্থিক নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা থাকলেও প্রায়োগিক কাজে সেটি ব্যাহত হচ্ছে। এক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির চিত্র দেখা যায়। ৬ বছর ধরে নিরীক্ষা আইন খসড়া হয়ে আছে কিন্তু সেটি এখন পর্যন্ত অনুমোদিত হচ্ছে না। যা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ পদক্ষেপ কামনা করছি।”
মহা হিসাব-নিরীক্ষকের কার্যালয়ের সুশাসনের চ্যালেঞ্জসমূহ চিহ্নিত করে এবং তা থেকে উত্তরণের জন্য টিআইবি সার্বিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী ২০ দফা সুপারিশ উত্থাপন করে। স্বল্পমেয়াদী সুপারিশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- অনিয়ম দুর্নীতি রোধকল্পে সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মাধ্যমে আলোচনার ভিত্তিতে প্রস্তাবিত নিরীক্ষা আইন প্রণয়ন, অর্গানোগ্রাম ও নিয়োগের বিধিমালার অনুমোদন দেয়া; সিএজিকে বাজেট, নিয়োগসহ সকল বিষয়ে সাংবিধানিক স্বাধীন ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার নিশ্চিতকরণ; সিএজিসহ সকল নিয়োগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা; সিএজিকে উচ্চ আদালতের বিচারপতির সম মর্যাদা দেয়াসহ সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা; নিরীক্ষার প্রতিবেদন সম্পন্ন করার ও জমা দেয়ার সুনির্দিষ্ট সময় সীমা নির্ধারণ করা; সিএজি কার্যালয়ের অভিযোগ সেল সম্পর্কে সরকারি কার্যালয়গুলোকে জানানোর জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালানো এবং অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া।
মধ্য মেয়াদী সুপারিশের মধ্যে অন্যতম হল- বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ও বড় আকারের দুর্নীতির তথ্যগুলো সিএজি পিএসিকে দিবে এবং পিএসি অভিযোগ অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য সুপারিশ করবে; ক্যাডার কর্মকর্তার সংখ্যা বৃদ্ধি করে কমপক্ষে ৩০% করা এবং মাঠ পর্যায়ে নিরীক্ষা করার জন্য নিরীক্ষা দল গঠন করা; জরুরি কার্যক্রমের (ক্রাস প্রোগ্রাম) মাধ্যমে দীর্ঘ দিনের পুরোনো নিরীক্ষা আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা এবং স্থানীয় ও রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরকে দুটি আলাদা অধিদপ্তরে ভাগ করা ইত্যাদি।
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদী সুপারিশের মধ্যে রয়েছে- সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যয় ও হিসাবের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্য মন্ত্রণালয়গুলোতে দক্ষ জনবলের সমন্বয়ে অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শাখা খোলা; নিয়মানুবর্তী নিরীক্ষা থেকে পারফর্মেন্স নিরীক্ষার দিকে যাওয়ার কৌশল তৈরি করা এবং এজন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সক্ষমতা বৃদ্ধি।

Media Contact